Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৫ জুন, ২০১৬ ২৩:২৯
প্রধানমন্ত্রী-সৌদি বাদশা বৈঠক
বিশ্বশান্তিতে একযোগে কাজ করবে ঢাকা-রিয়াদ
প্রতিদিন ডেস্ক
বিশ্বশান্তিতে একযোগে কাজ করবে ঢাকা-রিয়াদ
সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা —বাসস

বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব বিশ্বশান্তি, উন্নয়ন এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। গতকাল বিকালে জেদ্দার আন্দালুসে সৌদি বাদশাহর আল সালাম প্রাসাদে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ ঐকমত্য হয়। খবর বাসস

বৈঠকের পর পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বিস্তারিত অবহিত করেন। তারা জানান, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অন্তরঙ্গ পরিবেশে অনুষ্ঠিত আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী এবং সৌদি বাদশাহ বৈঠকে উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলোকে খতিয়ে দেখার বিষয়েও একমত হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। পররাষ্ট্রসচিব জানান, সৌদি বাদশাহ বাংলাদেশকে শীর্ষ ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।’ সৌদি বাদশাহ দুবার একই শব্দ উচ্চারণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফর দুই দেশের মধ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনাই শুধু নয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এর মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হলো বলেও পররাষ্ট্রসচিব অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই  দেশের সম্পর্ক যে পূর্ণতা লাভ করল, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। সৌদি বাদশাহ বিশ্বশান্তি, প্রগতি এবং উন্নয়নে বাংলাদেশের বিরাট ভূমিকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বশান্তির অন্বেষণ, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই নেতা বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধেও তাদের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন বলে পররাষ্ট্রসচিব জানান। সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থা মোকাবিলায় বাংলাদেশের ‘ইসলামী জোট’-এ শরিক হওয়ার বিষয়ে বাদশাহ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই কনসেপ্টের দুটি অংশ রয়েছে— একটি সামরিক-কেন্দ্রিক এবং অপরটি রাজনৈতিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোন অংশে যোগ দেবে, এটা বাংলাদেশের ওপরই নির্ভরশীল, এটা বাধ্যতামূলক নয়, এটা স্বেচ্ছাকেন্দ্রিক। আমরা বাংলাদেশের এই জোটে  যোগদানের বিষয়টাতেই খুশি। পররাষ্ট্রসচিব এবং প্রেস সচিব জানান, দুই নেতা বর্তমান বিশ্বে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে একযোগে কাজ করে যাওয়ার বিষয়েও অঙ্গীকার করেন। সৌদি বাদশাহ বলেন, তার দেশ বাংলাদেশের ইসলামী জোটে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এর মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব বরাবরই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের একটি বিশেষ জায়গা দখল করে রয়েছে। কারণ মক্কা এবং মদিনায় দুটি পবিত্র মসজিদের অবস্থান রয়েছে এবং সৌদি আরব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী উপলব্ধি করতে হবে। যাতে কেউ এর ভুল ব্যাখ্যা করে কোনোরকম ফায়দা লুটতে না পারে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি সারা দেশে ৫৬০টি ইসলামিক কেন্দ্র গড়ে তোলায় তার সরকারের উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরে বলেন, এর মাধ্যমে ইসলামের শান্তির বাণী সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল এবং সব ধর্মাবলম্বীর বসবাসের উপযোগী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য বলেও জানান। প্রধানমন্ত্রীর ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিষয়ে সৌদি বাদশাহ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা তার (শেখ হাসিনার) কনসেপ্টের বিষয়ে খুব খুশি এবং এ বিষয়ে সহযোগিতাও করতে চাই।’ তিনি বিষয়টি বাংলাদেশে গিয়ে দেখে আসার জন্য একজন সিনিয়র মন্ত্রীকেও বাংলাদেশে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ হতে পারে সৌদি ব্যবসায়ীদের সেকেন্ড হোম : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য পূরণে আমি সৌদি ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা নেতাদেরকে আমাদের দেশে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমৃদ্ধি এবং লভ্যাংশের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন আনতে পারব।’ গতকাল সৌদি আরবের রয়াল প্যালেসে জেদ্দা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেসিসিআই) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। জবাবে বাংলাদেশ সৌদি আরবের বিনিয়োগের সেকেন্ড হোম হতে পারে উল্লেখ করে সেদেশের ব্যবসায়ীরা শিগগির একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। পাঁচ দিনের সফরে সৌদি আরবে থাকা প্রধানমন্ত্রী এ ছাড়াও সফরে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন।

বাংলাদেশ চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন : সৌদি রয়্যাল কনফারেন্স প্যালেসে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রিয়াদে বাংলাদেশের চ্যান্সেরি ভবন ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বাসভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, এ ধরনের একটি দূতাবাস ভবন একটি স্বাধীন দেশের প্রতীক। সমগ্র বিশ্বেই ধাপে ধাপে নিজস্ব দূতাবাস ভবন গড়ে তোলা হবে।

 যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান এবং জাপানে নিজস্ব চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ৯৬-২০০১ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর অস্ট্রেলিয়াতেও এই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। অথচ পরবর্তী সরকার সেখানে ভবণ নির্মাণে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ সেখানে ভবন নির্মাণের জমির প্রায় অর্ধেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।

বাংলাদেশের সাফল্য মুসলিম বিশ্বকে জানাবে ওআইসি : এনজিও, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের চিত্র বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের কাছে তুলে ধরতে সহযোগিতা চেয়েছেন ওআইসি মহাসচিব আইয়াদ বিন আমিন মাদানী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এনজিও, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে আন্তর্জাতিক বিশ্বে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই সাফল্যকে বিশ্বের অন্য মুসলিম দেশের কাছে তুলে ধরার জন্য আমরা বাংলাদেশের বিশেষ করে প্রধানন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চাই।’ ওআইসি মহাসচিব শনিবার সন্ধ্যায় রয়্যাল কনফারেন্স প্যালেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী ওআইসি মহাসচিবের অনুরোধের জবাবে বলেন, ওআইসি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠালে বাংলাদেশ এ বিষয়ে সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে।

আইডিবি-কে সুদের হার কমাতে বললেন প্রধানমন্ত্রী : তেল আমদানিতে দেওয়া ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)-এর স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)-এর সুদের হার আরও হ্রাস করে তা ‘প্রতিযোগিতামূলক’ করার জন্য আইডিবির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইডিবির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদ তিকতিক শনিবার সন্ধ্যায় রয়েল কনফারেন্স প্যালেসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধানমন্ত্রী এ অনুরোধ জানান। আইডিবির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীকে জানান যে, আইডিবি মুসলিম দেশগুলোতে বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্যে একটি ইসলামী ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। জবাবে শেখ হাসিনা এই ধরনের একটি উদ্যোগে অংশ নিতে তার দেশের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত করে ড. আহমেদ তিকতিক বলেন, আইডিবি বাংলাদেশে এর সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি নতুন গেটওয়ে অফিস খুলতে যাচ্ছে। ডা. আহমেদ তিকতিক প্রধানমন্ত্রীকে জানান যে, আইডিবি আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা সেবা সহজতর করে তোলার লক্ষ্যে ১০টির মতো মোবাইল ক্লিনিক স্থাপন করবে।




up-arrow