Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৭ জুন, ২০১৬ ২২:৫২
সন্দেহে সোনা-ইয়াবা গডফাদাররাও
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
সন্দেহে সোনা-ইয়াবা গডফাদাররাও

এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো হোতাদের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ ছাড়া মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি এ হত্যাকাণ্ডে কোনো জঙ্গি সংগঠন বা জামায়াত-শিবির কিংবা অন্য কোনো মাফিয়া চক্র জড়িত রয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সব মিলিয়ে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন তারা।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘এ মামলায় বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে তথ্যগত ও বস্তুগত কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারব।’

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্তের প্রথম দিকে জঙ্গি এবং পরে জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ত থাকা নিয়ে সন্দেহ করে এগোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনা চোরাচালানি এবং ইয়াবা গডফাদারদেরও সন্দেহের তালিকায় আনা হয়। কারণ এ বছরের শুরুর দিকে রিয়াজউদ্দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনার বার উদ্ধার ও নগদ অর্থ আটক করে বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে গোয়েন্দা পুলিশ। এ মামলা তদন্ত করতে গিয়ে সোনা চোরাচালানের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিষয়ে তথ্য পান তিনি। একপর্যায়ে তাদের গ্রেফতারের বিষয়ে কার্যক্রমও শুরু করেন। এ ছাড়া বিগত সময়ে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ ও ইয়াবা ব্যবসায়ীকে তিনি গ্রেফতার করেছেন, তাদের বিষয় মাথায় রেখেও তদন্ত করছে পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মিতু হত্যার কথা এখনো কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী স্বীকার করেনি। তাই সোনা চোরাচালানি, ইয়াবা গডফাদার ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কথা মাথায় রেখে মামলার তদন্ত করা হচ্ছে।’ সোমবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে হেফাজতে নিলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধার মোটরসাইকেলের মালিক দেলোয়ারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। প্রথম পিআইবি জিজ্ঞাসাবাদ করে পরে তাকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এ ব্যাপারে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘এ মামলায় বলার মতো অগ্রগতি নেই। তবে আসামিদের গ্রেফতার ও ক্লু উদ্ঘাটন করতে সব সংস্থাকে নিয়ে কাজ করছে পুলিশ।’

কালো মাইক্রোবাস ও এসএমএস প্রেরণকারীর সন্ধানে : দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হওয়ার আগের রাতে মোবাইলে একটি ‘এসএমএস’ পান বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। ওই এসএমএসে তাকে বলা হয় নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুলে যেতে। শুধু মিতু নয়, ‘ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম’ ভবনে বসবাস করা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের প্রত্যেক অভিভাবকের কাছে আসে সেই এসএমএস। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই দিন স্কুলের সময় পরিবর্তন করে কোনো এসএমএস দেয়নি তারা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, হত্যাকারীরাই ওই এসএমএস পাঠিয়েছে। তারা বিশ্বাস স্থাপনের জন্য ‘ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম’ ভবনে বসবাসরত ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের প্রত্যেক অভিভাবকের কাছে একই এসএমএস পাঠায়। এ ছাড়া খুনিদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের পেছনে কালো রঙের যে মাইক্রোবাস দেখা গেছে, তা প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত ছিল বলে নিশ্চিত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ধারণা, ওই মাইক্রোবাস খুনিদের ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করছিল। খুনিরা আক্রান্ত হলে মাইক্রোবাসে থাকা সহযোগীরা তাদের সহযোগিতা করত।

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এসএমএস কে দিয়েছিল এবং কালো রঙের মাইক্রোবাসে কারা ছিল তা খুঁজে বের করতে কাজ করছে র‌্যাব।’

সিএমপির সিসিটিভিতে নেই হত্যাকারীদের ফুটেজ : চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বসবাস করা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেড় বছর আগে নগরের ৫০ পয়েন্টে ১৩৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার বাবুল আক্তার। তার উদ্যোগে স্থাপন করা ওই সিসিটিভির ফুটেজ ব্যবহার করে সাফল্যও পায় পুলিশ। অথচ এখন তার স্ত্রীর হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না সেই সিসিটিভির। কারণ বিলবোর্ড উচ্ছেদের আগে খুলে নেওয়া হয়েছে অনেক ক্যামেরা। ফলে হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ভরসা করতে হচ্ছে অন্যের সরবরাহ করা ফুটেজের ওপর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া ওই ফুটেজগুলো মানসম্মত না হওয়ায় খুনিদের নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিলবোর্ড উচ্ছেদের সময় বেশির ভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নেওয়া হয়েছে। এখন নগরীতে সিএমপির স্থাপন করা মাত্র ১৩টি ক্যামেরা সচল রয়েছে। তাই বাবুল আক্তারের স্ত্রীর ভিডিও ফুটেজ সিএমপির সিসিটিভিতে ধরা পড়েনি।’

সন্ধান মিলেছে মোটরসাইকেল মালিকের : মিতু হত্যার সময় ব্যবহার করা চট্ট মেট্রো-ল-১২-৯৮০৭ নম্বরের মোটরসাইকেলটির মালিকের সন্ধান মিলেছে। বিআরটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, এই নম্বরের গাড়ির মালিক আবদুর রহিম নগরের টেরিবাজারের একজন কাপড় ব্যবসায়ী। তার বাবার নাম মৃত সৈয়দ আহমেদ। টেরিবাজারের সিটি টাওয়ারে তার বাসা। তিনি ২০১৪ সালে মোটরসাইকেলটি নিবন্ধন করেন। তবে আবদুর রহিম পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, ওই নম্বরের গাড়িটি বর্তমানে তার কাছে রয়েছে। কিন্তু পুলিশের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন নম্বর আইপি ৫০ এফএমজি-২-এ-১২৯৯৪৬৫ এবং চেসিস নম্বর হলো বিআরবিএই-১০১০০০০৪২। বিআরটিএ নিবন্ধন অনুসারে, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর অনুযায়ী গাড়িটির নম্বর হওয়ার কথা চট্ট মেট্রো-হ-১৩-১৫৯৭। আর এই নম্বরের গাড়ির মালিক নগরের জামাল খান এলাকার দেলোয়ার হোসেন। দেলোয়ারের দাবি, ২০১১ সালে এক দালালের মাধ্যমে ওই মোটরসাইকেলটি তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। এর পর থেকে এ মোটরসাইকেলের মালিক যে কে তা তার জানা নেই। প্রসঙ্গত, রবিবার সকালে নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। পুলিশের ধারণা, বাবুল আক্তারের জঙ্গিবিরোধী তত্পরতার কারণে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন তার স্ত্রী মিতু।




up-arrow