Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৮ জুন, ২০১৬ ২২:৪৮
গুপ্তহত্যার অনেক তথ্য আছে আমার কাছে : প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি
গুপ্তহত্যার অনেক তথ্য আছে আমার কাছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত গুপ্তহত্যা ও টার্গেট কিলিং সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, গুপ্তহত্যার বিষয়ে আমার কাছে অনেক তথ্য আছে। একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, আমি হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট। সরকার প্রধান হিসেবেই বিভিন্ন সংস্থার তথ্য আমার কাছে আসে। তদন্তের স্বার্থে সবকিছু বলতে পারি না। তবে গুপ্তহত্যাকারী ও সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এদের কেউ ছাড় পাবে না। বুলগেরিয়া, জাপান ও সর্বশেষ সৌদি আরব সফর শেষে দেশে ফিরে গতকাল দুপুরে গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

টার্গেট কিলিং সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদের হত্যা করার প্রক্রিয়া একই রকম। বাংলাদেশের ভামূর্তি নষ্ট এবং দেশের অগ্রগতি ব্যাহত করার জন্যই একের পর এক গুপ্তহত্যা ঘটানো হচ্ছে।

টানা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা এ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের নানা বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। সাম্প্রতিক আলোচিত বিভিন্ন গুপ্ত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করলেও বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তারা যখন মানুষ পুড়িয়ে মারছিল তখন দেশবাসী যেভাবে জেগে উঠেছিল; ঠিক সেভাবেই আবার জেগে উঠতে হবে। গুপ্ত হত্যাকারীদের বিষয়ে দেশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। তাদের খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। সবগুলো গুপ্ত হত্যার প্রক্রিয়া একই রকম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্নজন এ হত্যার দায় স্বীকার করে। মূল জায়গা কিন্তু একটা। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী স্লোগান নিয়ে যারা মানুষ হত্যাকে উসকে দেয়, বর্তমানের গুপ্তহত্যা তাদের কাজ। দেশের অগ্রযাত্রা রুখতেই এই নীলনকশা। এ যাবৎ যারাই জঙ্গি তত্পরতা চালিয়েছে তাদের সঙ্গে দুটি রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তারা প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ পুড়িয়ে মারে, তখন তারা জনগণের রুদ্ররোষের শিকার হয়েছিল। ফলে এখন তারা মানুষ হত্যার কৌশল পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশের উন্নতি যারা চায়নি তারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপবিষ্ট ছিলেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

প্রত্যেকটি হামলাকে জঙ্গি হামলা বলে চালিয়ে দেওয়ায় মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা ভাই কারা সৃষ্টি করেছে। ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা কারা করেছে? বিভিন্ন তদন্তে বের হয়ে এসেছে কারা প্রকৃত খুনি। শুধু দেশে নয়, আমার ছেলেকে হত্যা করার জন্য আমেরিকায় বসেও তারা ষড়যন্ত্র করছে। এ পরিকল্পনা কারা করছে। তা অবশ্যই সবার বোঝা দরকার। তিনি বলেন, যারা জঙ্গিদের পরিচয় আড়াল করতে চায় আসলে তারাই এমন কথা বলেন।

পবিত্র মক্কা-মদিনার নিরাপত্তায় সামরিক সহযোগিতা : সৌদি সামরিক জোট সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদেশে পবিত্র কাবা শরিফ, নবীজির (সা.) রওজাসহ অনেক পবিত্র স্থাপনা রয়েছে। এগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছি। সৌদি আরব এসব সুরক্ষায় আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরা তা করতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনের আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি আরবের বাদশাহ। আমি তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছি। বাদশাহকে আমি জানিয়েছি, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ সামরিক সহায়তা দেবে।

সৌদি সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সৌদি আরবে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। আমরা সেখানে আরও লোক পাঠাতে পারব। যারা সেখানে যাবেন তাদের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি বাদশাহসহ সেদেশের আট মন্ত্রীর সঙ্গে আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। তারা আমাদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমারা তাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি— আমরা তাদের শিল্প স্থাপনের জন্য জায়গা দেব।

ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা প্রসঙ্গ : সদ্য অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের লড়াই ও সহিংসতা সম্পর্কে মন্তব্য চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন হওয়ায় দেশে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ বেড়েছে। দেশে ইউপি নির্বাচন চলাকালে যে সহিংসতা হয়েছে তার বেশির ভাগই হয়েছে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়, ১৯৮৬, ১৯৮৮ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর চেয়ে অনেক বেশি সহিংসতা হয়েছে।

সাংবাদিক গ্রেফতার প্রসঙ্গ : গোপন হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন সিনিয়র সাংবাদিককে গ্রেফতার করায় সাংবাদিকদের সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপনারা কথা বলেন। আবার কেউ যখন হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকে, তাকে গ্রেফতার করলে আপনারা সমালোচনা শুরু করেন। তিনি বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়কে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত এক সাংবাদিককে গ্রেফতারের পর আপনারা সমালোচনা শুরু করলেন। তাহলে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না? কাউকে নিয়ে যখন কথা বলি, তখন তো তথ্য থাকে।

এসপির স্ত্রী হত্যায় প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি : জাতীয় সংসদে গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা বলেন, গুপ্ত হত্যা করে কেউ পার পাবে না। যারা এভাবে হত্যা করছে তারা ও তাদের প্রভুদের আমরা রেহাই দেব না। যারা পরিবারের ক্ষতি করছে তাদের হিসাব পাই পাই করে নেওয়া হবে। তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার ঘটনায় কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে তারা পরিবারের ওপর হাত দিতে শুরু করেছে। তারা কি ভুলে যায় তাদেরও পরিবার আছে। তাদের বাবা-মা আছে। তাদেরও ভাইবোন, স্ত্রী আছে। একদিকে যদি আঘাত আসে তাহলে অন্যদিকেও তো একই আঘাত আসতে পারে।

এটা কি তারা ভুলে যাচ্ছে? তিনি বলেন, যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী ও গুপ্তহত্যার সঙ্গে জড়িত, আমি তাদের পরিবার, বাবা, মা, ভাইবোন ও স্ত্রীকে বলব, এর থেকে যেন তাদেরকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি বলেন, আজকে যদি তারা এভাবে অন্য পরিবারগুলোর ওপর হাত দিতে শুরু করে তাহলে কারও হাতই থেমে থাকবে না। তখন কেউ জনগণকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। গুপ্তহত্যা করে তারা যদি মনে করে দেশ একেবারে উল্টে দেবে তা কখনই তারা পারবে না। হত্যাকারীরা ঠিকই ধরা পড়বে। তারা সর্বোচ্চ সাজা ভোগ করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গুপ্তহত্যাকারীরা মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার ফাদার, পেগোডার ধর্মযাজকদের হত্যা করছে। শিক্ষককে হত্যা করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশ অফিসার, যিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, তার স্ত্রীকে কী নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে প্রকাশ্য দিবালোকে তার ছোট্ট শিশুর সামনে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওদের সব হত্যার ধরন একই রকম। তারা ঠিক একই জায়গায় কোপ দেয়, একইভাবে গুলি করে ?মারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, অবশ্যই তারা গ্রেফতার হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।




up-arrow