Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৮ জুন, ২০১৬ ২২:৪৯
রাজনীতি নয়, বিএনপি ব্যস্ত দলাদলিতে
মাহমুদ আজহার
রাজনীতি নয়, বিএনপি ব্যস্ত দলাদলিতে

কিছুদিন আগেও বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে ছিল চাঙ্গাভাব। কিন্তু কাউন্সিলের পরপরই সেই উৎসাহে ভাটা পড়তে শুরু করে। আড়াই মাস পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি দলটি। হতাশায় নেতা-কর্মীরা। তৃণমূলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও বন্ধ। অঙ্গসংগঠন কিংবা ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে আছে। জনগুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে দলের রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিও নেই। নেতারা ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ দলাদলিতে ও গ্রুপিং-তদবিরে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পেতে যে যার মতো করে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপিতে এখন কোনো রাজনীতি নেই। দলের ভিতরে গণতন্ত্র চর্চাও নেই। নেতারা ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। দল বা দেশের জনগণ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা নেই তাদের। কীভাবে পদ-পদবি পাওয়া যায়, সেই তদবিরেই সবাই দৌড়ঝাঁপ করছেন। এ নিয়ে লবিং-গ্রুপিং তো আছেই। নিজের পদ পাওয়ার পাশাপাশি গ্রুপ সমর্থকদেরও পদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন নেতারা।

সূত্র মতে, বিএনপির এখন প্রধান কাজ হচ্ছে স্বল্প সময়ের মধ্যে কমিটি দিয়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা। সঠিক পথে রাজনীতি করা। একই সঙ্গে নেতা-কর্মী সমর্থকদের সুসংগঠিত করতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিরাজমান আস্থাহীনতা ও সন্দেহ, সংশয় ও অবিশ্বাস দূর করতে হবে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনের বাইরে থাকা তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট দূর করতে হবে। নতুন নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর দেশ-বিদেশে চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এটা করতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কোনোভাবেই অগণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিএনপি এখন সব দিক থেকেই হতাশার মধ্যে আছে। সবাই আশা করেছিল, কাউন্সিলের পর বিএনপি নতুন কমিটি দেবে, দল শক্তিশালী হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বিএনপি পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি। তরুণ ও মাঝবয়সী নেতাদের দিয়ে আন্দোলনমুখী কমিটি দিতে পারেনি খালেদা জিয়া। নির্বাচন, আন্দোলন আর সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি দল চাঙ্গা হয়। যার কোনোটাই এখন বিএনপিতে নেই। শাসনতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি জনমতের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি এখন তাকিয়ে আছে বিদেশি শক্তির দিকে। তাদের উচিত হবে, জনগণের ওপর নির্ভর করেই সব কর্মকাণ্ড চালানো।’তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপিতে রাজনীতি নেই, এটা ঠিক না। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতা-কর্মীদের উচ্ছ্বাস নিয়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই কাউন্সিলে চেয়ারপারসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিটির। তিনি এ নিয়ে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিবসহ বেশকিছু নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এখনো স্থায়ী কমিটিতে কাজ করছি। মিটিংও হচ্ছে নিয়মিত। তবে তৃণমূলে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া রমজানের কারণে স্থগিত আছে। এগুলোর জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কমিটি নিয়ে বিএনপিতে দলাদলি নেই। কমিটিতে পদ পেতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’ দলীয় সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটি নিয়ে বিএনপিতে এখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ভিতরে ভিতরে ওই পদে যেতে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে দেড় ডজন নেতার মধ্যে। যদিও এ বিষয়টি এককভাবেই দেখভাল করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে নানাভাবে নেতাদের তদবির থেমে নেই। পদ প্রত্যাশী কয়েক নেতা ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেছেন, ওই পদ না পেলে দল থেকে পদত্যাগ করবেন। সেখানে অন্য কেউ আসলে তাকেও রাজনীতি করতে দেবেন না। বিষয়টি বিএনপি চেয়ারপারসনের কানেও তুলেছেন কেউ কেউ। এ জন্য স্থায়ী কমিটি ঘোষণা নিয়েও অস্বস্তিতে বিএনপি প্রধান। কমিটি দিতে বিলম্ব হওয়ার এটাও একটি কারণ। জানা যায়, দলে যুগ্ম মহাসচিব ঘোষণা করার পর ওই পদ প্রত্যাশী কয়েকজন নেতা রাগে ক্ষোভে দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। তারা ভালো কোনো পদ না পেলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেবেন বলেও ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছেন। ঘোষিত কমিটিতে এক নেত্রীর পদ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় গুলশান কার্যালয়ে মহিলা দলের দুই নেত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হন খোদ বিএনপির প্রধানও। ক্ষোভে অভিমানে তারা এখন গুলশান কার্যালয়েও কম যাতায়াত করেন। বিএনপির দফতর শাখায় কাজ করা নিয়েও নেতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিযোগিতা চলছে। এ নিয়ে এক নেতা আরেক নেতার বিরুদ্ধে নানা প্রোপাগান্ডাও চালাচ্ছেন। সহদফতর সম্পাদক পদে বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা তদবির চালাচ্ছেন। বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদ দুটি সাবেক ছাত্রনেতাদের জন্য লোভনীয়। এ নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা।

জানা যায়, কাউন্সিলের পর আংশিক কমিটি ঘোষণা হলেও তাতে স্বস্তি মেলেনি নেতা-কর্মীদের মধ্যে। বরং কয়েকটি পদ নিয়ে দলাদলিতে নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। ঘোষিত কমিটিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, অতি মূল্যায়ন কিংবা প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় চলছে চাপা ক্ষোভ। মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও চলছে নেতাদের মধ্যে। পদহীন নেতাদের গা ছাড়া ভাব। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। দল কিংবা দেশের স্বার্থ নিয়ে কারও কোনো চিন্তাভাবনা নেই। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘পদ নিয়ে দলে দলাদলি নেই, তবে পদ নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতা সব রাজনৈতিক দলে থাকে। বিএনপিতেও আছে। এটা স্বাভাবিক।’




up-arrow