Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১০ জুন, ২০১৬ ২২:৩০
অভিযানের মধ্যেই খুন আশ্রমের সেবক
প্রতিদিন ডেস্ক
অভিযানের মধ্যেই খুন আশ্রমের সেবক
নিহত নিত্যরঞ্জন পান্ডে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার আডুয়াকংশুর গ্রামের বাড়িতে গতকাল স্বজনের আহাজারি —বাংলাদেশ প্রতিদিন

টার্গেট কিলিংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের শুরুতেই পাবনায় অনুকূলচন্দ্র সেবাশ্রমের এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল ভোর সোয়া ৬টার দিকে সেবাশ্রমের ২০০ গজ দূরে এ হত্যাকাণ্ড। নিহত নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে (৬০) সেখানকার সৎসঙ্গ আশ্রম সেবাশ্রমে ৪০ বছর ধরে কাজ করছিলেন।

দেশব্যাপী কিলিং মিশনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুলিশ সদর দফতরে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকে জেলার পুলিশ সুপারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার এ বৈঠক থেকেই দেশব্যাপী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ওইদিন রাত থেকেই সাঁড়াশি অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯০০ জনকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু এ অভিযানের ভিতরই ভোরবেলা খুন হলেন এই হিন্দু সেবাশ্রম কর্মী। আমাদের পাবনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল সকাল সোয়া ৬টার দিকে সেবাশ্রমের ২০০ গজ দূরে হেমায়েতপুর পাবনা মানসিক হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে অন্যান্য দিনের মতো ওই সময় প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছিলেন। আশ্রমের নির্বাহী পরিষদের সদস্য বলাই কৃষ্ণ সাহা জানান, মানসিক হাসপাতালের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের ওপর হামলা হয়। তার ঘাড় ও মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে আশ্রমের লোকজন ঘটনাস্থলে যান। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পাবনা (সদর সার্কেলের) সহকারী পুলিশ সুপার শেখ সেলিম বলেন, নিত্যরঞ্জন হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে মনে হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেছন থেকে ঘাড়ে কোপ দেওয়া হয়। ঘাড়ে ও মাথায় এমনভাবে কোপানো হয়েছে, যা দেখে মনে হয় খুনিরা তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চেয়েছিল। তবে এখনো বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। জঙ্গিরা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তদন্তসাপেক্ষে সব জানা যাবে। তিনি জানান, এ ঘটনার পরপরই পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ৭ জুন ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী, ৫ জুন নাটোরে খ্রিস্টান ব্যবসায়ী সুনীল গমেজ ও একই দিনে চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার সঙ্গে এই হত্যার অনেক মিল রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) যুগল কিশোর ঘোষ জানান, নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের বাড়ি গোপালগঞ্জের আরুয়াপাড়ার কংশুর গ্রামে। তার বাবার নাম রসিক লাল পাণ্ডে। ৪০ বছর ধরে এ আশ্রমে আশ্রিত থেকে ধর্মসেবা করে আসছিলেন নিত্যরঞ্জন। পাঁচ-ছয় বছর ধরে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হতেন। শেষ পর্যন্ত হাঁটতে বেরিয়েই খুন হলেন। স্থানীয় উন্নয়ন কর্মী নরেশ মধু বলেন, ‘উনি দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় বসবাস করছিলেন। তিনি এ এলাকারই মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। সাদামাটা মানুষ, কোনো শত্রু ছিল বলে শুনিনি কখনো।’ বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার মতো নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে হত্যার পেছনেও জঙ্গিদের হাত থাকতে পারে বলে তার সন্দেহ। এ ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা গেছে, নিত্যরঞ্জনের কোনো শত্রু ছিল বলে কারও জানা নেই। তিনি খুব নম্র-ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কেন তিনি এ ধরনের ঘটনার শিকার হলেন, তা কারও বোধগম্য নয়। তিনি রাস্তা দিয়ে চলাচল করলেও কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন না। তিনি তার মেয়ের ছেলে হৃদয় বাগচীকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের নাতি হৃদয় বাগচী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নানা ভাই আমাকে ক্লাস ফোর থেকে এখানে নিয়ে আসেন, এবং তিনিই আমাকে এখানে তার সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন, আর পড়াশোনা করাতেন। এখন আমি কার কাছে থেকে পড়াশোনা করব?’ হৃদয় পাবনা শহরের রাধানগর মজুমদার একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। পাবনার পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ‘নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা কোনো জঙ্গি সংগঠন কিংবা নাশকতাকারী যারাই হোক না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে শিগগিরই। এরই মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লিটন কুমার দাস, সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শেখ সেলিম খান, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হাসানসহ অন্য দুই এসআইকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন। তারা এজন্য মাঠেও নেমেছেন।’ প্রসঙ্গত, এ হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‍্যাব কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। কিন্তু কারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন : অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের সেবাশ্রমের এক সেবায়েতকে কুপিয়ে হত্যার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার (রাজশাহী) অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনি গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং সৎসঙ্গ আশ্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আশ্রমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তবে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেননি। শুধু জানিয়েছেন, তিনি নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এ সময় নিহত নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের নাতি হৃদয় বাগচীকে তিনি সমবেদনা জানান।

র‍্যাব কর্মকর্তার পরিদর্শন : এর পরপরই র‍্যাব-১২ সিরাজগঞ্জের সিইও (অতিরিক্ত ডিআইজি) সাহাব উদ্দিন খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাক না কেন, যেখানেই থাক না কেন, খুঁজে বের করা হবে। যতটুকু সম্ভব আমরা এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্ত করব।’ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গিসম্পৃক্ততা আছে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারাই এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের খুঁজে বের করা হবে।’




এই পাতার আরো খবর
up-arrow