Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ জুন, ২০১৬ ২২:৩১
সারা দেশে চলছে গ্রেফতার
আটক ৯০০, আতঙ্কে ঘরছাড়া বিএনপি নেতা-কর্মীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক

জঙ্গি দমনে রাজধানীসহ সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযানের প্রথম দিনেই নয় শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার পলাতক বিএনপি নেতা-কর্মীও রয়েছেন। মাদকসেবীসহ অন্য মামলার আসামিও আছেন। আটকদের বেশির ভাগ ব্যক্তিকে গতকাল রাত পর্যন্ত গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এরই মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা।

পুলিশ সদর দফতর বলছে, শুক্রবার ভোরে শুরু হওয়া এ অভিযান আগামী সাত দিন চলবে। চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ার পর বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দফতরে মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে এ ‘সাঁড়াশি অভিযান’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকায়ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সকাল থেকে ‘অনেককে’ আটকের কথা জানালেও সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বলেননি। সূত্র বলছে, অভিযানে জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকাগুলোর দিকে থাকবে বিশেষ নজর। স্থানীয় পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিরাও এ অভিযানের খবর জানিয়েছেন। জানা যায়, ঢাকায় অবস্থান নেওয়া বিএনপির মধ্যসারির এক নেতা বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বাসায় থাকছেন না। গ্রেফতার এড়াতে আগামী এক সপ্তাহ আড়ালেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানালেন, ‘দেশজুড়ে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে। আমার নামে অর্ধশত মামলা রয়েছে। যে কোনো সময় পুলিশ বাসায় হানা দিতে পারে। পেন্ডিং মামলায় গ্রেফতার করতে পারে। বাসায় থাকা নিরাপদ নয়। যদিও রমজানে এটা কষ্টকর।’ একই কথা জানালেন ছাত্রদল ও যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা। গ্রেফতার এড়াতে তারাও ইতিমধ্যে বাসা ছেড়েছেন। শুধু এ তিনজনই নন, সারা দেশে বিএনপির মধ্যসারির নেতা থেকে শুরু করে সব অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীর একই অবস্থা। গ্রেফতার আতঙ্কে অনেকেই বাসাবাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ থাকলেও অনেকটা সতর্কভাবে রাতযাপন করছেন। এরই মধ্যে আগের মামলায় কয়েকশ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জঙ্গি দমনে সাঁড়াশি অভিযানের নামে সরকার বিএনপির ওপর চড়াও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘এই সাঁড়াশি অভিযানের অজুহাত দিয়ে তারা আবারও বিরোধী দলের ওপর চড়াও হবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। অতীতে আমরা তাই দেখেছি। জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটছে না।’ বিএনপি নেতারা জানান, রমজানে ইফতার পার্টির মাধ্যমে নেতা-কর্মীরা সুসংগঠিত হচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিও যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। দুটি অঙ্গসংগঠনের কমিটি দেওয়ারও চিন্তাভাবনা চলছে। এ মুহূর্তে নেতা-কর্মীরা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারেন, তাই জঙ্গি গ্রেফতারের তকমা দিয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।

বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রমজানেও বিএনপি নেতা-কর্মীদের ঘরে থাকতে দেবে না সরকার। জেলার নেতা-কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মামলায় জর্জরিত অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছেন। আমরাও নিরাপদ নই। সরকার টার্গেট করে বিএনপি নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করছে।’ বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ঈদ উপলক্ষে সরকারি দলের নেতা ও পুলিশের চাঁদাবাজির সুযোগ হয়েছে। নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার খড়্গ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

পুলিশ সদর দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, অভিযানে পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থার তালিকা সমন্বয় করা হচ্ছে। নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন সে ব্যাপারেও দৃষ্টি রাখছে পুলিশ সদর দফতর। বরিশাল : বরিশাল জেলায় ২৯ জন গ্রেফতার হয়েছেন। জেলা পুলিশ সুপার এস এম আকতারুজ্জামান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। রাজশাহী : রাজশাহীতে ৩১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত নগরীতে চলে পুলিশের এ অভিযান। তবে অভিযানে রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা-কর্মী গ্রেফতার হননি বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম। পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশের নামে বিভিন্ন মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ : পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন মামলার ৩৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর থানায় ১১, শিবগঞ্জে ১৪, গোমস্তাপুরে ৮, নাচোলে ৪ ও ভোলাহাট থানায় ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সিলেট : সিলেটে ৪০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পুলিশ ৩০ ও মহানগর পুলিশ ১০ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা। খুলনা : বিশেষ অভিযানের প্রথম রাতে খুলনায় ১০২ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা মহানগরীর নয় থানায় গ্রেফতার হয়েছেন ৩১ জন। এর মধ্যে জামায়াত নেতা, সাজাপ্রাপ্ত, পরোয়ানা, নিয়মিত মামলার আসামি, মাদক বিক্রেতা ও চাঁদাবাজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। রংপুর : সাঁড়াশি অভিযানের প্রথম দিনেই রংপুরে এক শিবির কর্মীসহ ৯০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জেএমবির কোনো সদস্য ধরা পড়েনি। বগুড়া : বগুড়ায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে জিহাদি বইসহ নিষিদ্ধ জামাআ’তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবির সদস্য সাগর আহম্মেদ রনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি রাজশাহীর দাসমারী এলাকার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে পিবিআই। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বাগানবাড়ী থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পিবিআই বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আকতারুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বাগানবাড়ীর একটি ছাত্রাবাসে সাগরসহ চার-পাঁচ জন গোপন বৈঠক করছিলেন। এমন সংবাদে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। টের পেয়ে অন্যরা পালিয়ে গেলেও সাগরকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এ সময় ২১টি জিহাদি বই উদ্ধার করে পুলিশ। টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে প্রথম দিনে ৬৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। দিনাজপুর : জামায়াত-শিবিরের দুজন কর্মীসহ বিভিন্ন মামলায় ১০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম সূত্র। মাগুরা : পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাগুরার তিন উপজেলায় বৃহস্পতিবার রাতে ২৪ জন আটক হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সদরের শত্রুজিত্পুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি আফসার মোল্যা, শালিখা উপজেলা জামায়াতের সদস্য আবদুল খালেক। আটক অন্য ২২ জন বিভিন্ন মামলার আসামি বলে সহকারী পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায় জানান। ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে বিশেষ অভিযানে চার জামায়াত কর্মীসহ ২৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান জানান, জেলা সদরসহ ছয় উপজেলায় পুলিশের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল রাতে সদর থানার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, শৈলকুপায় ৩, হরিণাকুণ্ডুতে ৭, কালীগঞ্জে ২, কোটচাঁদপুরে ২ ও মহেশপুরে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন জামায়াত কর্মী এবং বাকিরা বিভিন্ন মামলার আসামি। কুষ্টিয়া : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন জানান, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত জেলার সাত থানা থেকে জামায়াত-শিবিরের ছয় নেতা-কর্মীসহ মোট ৬৭ জনকে তারা আটক করেছেন। সাতক্ষীরা : বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হওয়া জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযানে জেলায় ৭০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গাইবান্ধা : গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পূর্ব বেলকা গ্রামের হানিফ মুন্সির ছেলে জামায়াত কর্মী ওসমান আলীসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ২৬ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ অভিযানে তাদের গ্রেফতার করা হয়। বাগেরহাট : জেলার নয় থানায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৭২ জনকে আটক করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া : অভিযানের প্রথম দিনে জেলার সরাইল থানা বাদে আট থানা থেকে ৩১ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীসহ, সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডিআইও-১) মো. আবদুল কাইয়ূম। এ ছাড়া জেলার নবীনগর উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার নায়েবে আমির গোলাম ফারুক (৬০), আখাউড়ায় শিবির নেতা মাহমুদ ও তার আরেক ভাই রয়েছেন। নাটোর : বিশেষ অভিযানে নাটোরে ২৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়াও প্রায় ৪০টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ : বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে জেলা সদরে ৭, গজারিয়ায় ২ ও সিরাজদিখানে ১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নোয়াখালী : জামায়াত-শিবিরের ২ কর্মীসহ ৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার ইলিয়াছ শরীফ জানান, ৯ উপজেলায় এ অভিযানে জামায়াত-শিবিরের দুই কর্মী ও অন্যান্য মামলার সাজাপ্রাপ্ত ৫ জনসহ ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ : গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন থানায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন মামলায় ৬১ জনকে আটক করেছে। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মী ছাড়াও অন্যান্য মামলার আসামি রয়েছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow