Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১২ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ জুন, ২০১৬ ২২:৫৫
দুনিয়াদারি
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

মাহে রমজানে সিয়াম সাধনায় পার্থিব জীবনযাপনের নিত্যতা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এক অমোঘ মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। ধন সম্পদের প্রাচুর্যে ভরা আরাম আয়েশ উল্লাস ঐশ্বর্য্যময় জীবনযাপনে চিরন্তন শান্তি  নেই।

ভোগে নয় ত্যাগেই মুক্তি। এই উপলদ্ধিরও বিকল্প নেই যে কৃচ্ছ তা সাধনের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী পরিতৃপ্তি ও কল্যাণের নিশ্চয়তা। কোরআনুল করিমে আল্লাহরাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন ‘তোমাদের নিকট যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী। যারা ধৈর্য ধারণ করে আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যা করে তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব। মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম সম্পাদন করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই অনন্দময় জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব’(১৬ সংখ্যক সূরা আন নাহল। আয়াত ৯৬- ৯৭)

‘তোমাদের নিকট যা আছে’ তাফসিরকারকগণের মতে, এর মধ্যে পার্থিব ধন সম্পদ অন্তর্ভুক্ত তো আছেই, এ ছাড়া দুনিয়াতে মানুষ আনন্দ-বিষাদ, সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, লাভ-লোকসান, বন্ধু-শত্রুতা ইত্যাদি যেসব অবস্থার সম্মুখীন হয়, সবই এর মধ্যে পড়ে। বাস্তবিক বিচারে এগুলো সবই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এসব অবস্থা ও ব্যাপারের প্রতিক্রিয়া, যার কারণে শেষবিচারের দিনে সওয়াব কিংবা শাস্তি সাব্যস্ত হবে তার হিসাবে সংরক্ষিত থাকবে। সুতরাং পার্থিব ধনসম্পদ এবং এসব ধ্বংসশীল ও অস্থায়ী অবস্থা ও কাজ কারবারে মগ্ন থাকা এবং জীবন ও জীবনের কর্মক্ষমতা এ ব্যাপারে নিয়োজিত করা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। যে সম্পদ ও বিষয়াবলি ক্ষণস্থায়ী এবং যার স্থায়িত্বের ও ভূমিকার উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই বা থাকবে না তা অর্জনে অবৈধ পন্থা অবলম্বনের দ্বারা পাপাচারে লিপ্ত হওয়া এবং ফলশ্রুতিতে ইহ ও পরকালে শাস্তি ভোগের সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে যুক্তি নেই। জাগতিক সুনাম কিংবা সন্তান সন্ততির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত কল্পে অনেকে অন্ধ ভাবে সম্পদ অর্জনে আত্মহারা হয়ে যায়। ক্ষণস্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বিধানে নিজের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা থাকায় এবং নিজের অবর্তমানে সন্তান সন্ততি কিভাবে এই সহায় সম্পত্তি ভোগ করবে সে ব্যাপারেও নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অন্ধভাবে সম্পদ অর্জনে নিজের আত্মাকে কলুষিত করবার বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বনের তাগিদ রয়েছে এ আয়াতে।   পরবর্তী আয়াতে আনন্দময় জীবন বা ‘হায়াতে তাইয়্যেবা’ বলতে দুনিয়ার পবিত্র ও আনন্দময় জীবন বোঝানো হয়েছে। এই পবিত্র ও আনন্দময় জীবনের অর্থ আবার এই নয় যে সে জীবনে মুমিন ব্যক্তি কখনো অনাহার উপবাস ও অসুখ বিসুখের বিপদ আপদের সম্মুখীন হবে না। ব্যাখ্যা এই যে মুমিন ব্যক্তি কোনো সময় আর্থিক অভাব অনটন কিংবা কষ্টের সম্মুখীন হলেও দুটি বিষয় তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেয় না (১) অল্পতুষ্টি এবং অনাড়াম্বর জীবন যাপনের অভ্যাস, যা দারিদ্র্যের মাঝেও কেটে যায় (২) এটি এই বিশ্বাসে যে অভাব অনটন ও অসুস্থতা, দুর্বিপাক ও দুর্ঘটনার বিষয়গুলো ক্ষণস্থায়ী এবং এর বিনিময়ে পরকালে সুমহান ও চিরস্থায়ী নিয়ামত পাওয়া যাবে। দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন কাফের ও পাপাচারীর অবস্থা এর বিপরীত। সে অভাব অনটন, অসুস্থতা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হলে তার জন্য সান্ত্বনার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সে নিরতিশয় উদ্বিগ্ন হয়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। প্রায়শঃ আত্মহত্যা করে। পক্ষান্তরে সে যদি সচ্ছল জীবনের অধিকারী হয় তবে লোভের আতিশয্য তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। সে কোটিপতি হয়ে গেলে অধপতি হওয়ার চিন্তায় জীবনকে বিড়ম্বনাময় করে তোলে। লেখক : সাবেক সচিব ও এন বি আরের সাবেক চেয়ারম্যান।

up-arrow