Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ জুন, ২০১৬ ২২:৫৩
রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডই জঙ্গিবাদের পরিবেশ তৈরি করছে
জুলকার নাইন
রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডই জঙ্গিবাদের পরিবেশ তৈরি করছে
আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরে এভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি বন্ধ না করতে পারলে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার ঠেকানো যাবে না। আর জঙ্গিবাদের মোকাবিলা শুধু শক্তি প্রয়োগে কখনোই সম্ভব নয়। এ জন্য সবার অংশগ্রহণে রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ বা পদক্ষেপ এখনো অনুপস্থিত। সংক্ষিপ্ত সফরে গত সপ্তাহে দেশে আসা বাংলাদেশি স্কলার আলী রীয়াজ গতকাল ঢাকায় তার পারিবারির বাসভবনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। ড. আলী রীয়াজ বলেন, সহজ ভাষায় আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলি তা আসলে সহিংস উগ্রপন্থা। এটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অতীতেও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, ভবিষ্যতেও জনগণের সমর্থন পাবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। ফলে সহিংস উগ্রপন্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন বা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হবে তা আমি মনে করি না। কারণ এর আগে বাম দলগুলোসহ একাধিক পক্ষ থেকে সহিংস উগ্রপন্থার নীতি গ্রহণ করা হলেও জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। তবে এর মানে এমন নয় যে স্বল্প মেয়াদের কোনো পরিবর্তনে বিপদ কম। কারণ এতে করে এক ধরনের আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সবার মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ইদানীং বেড়েছে। কারণ অতীতে ব্লগার ও নাস্তিক আখ্যা দিয়ে খুনগুলো করা হলেও এখন বিভিন্ন স্তরের মানুষকে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হচ্ছে। সুতরাং কে কখন কোথায় আক্রান্ত হবে সেই চিন্তা এক ধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি এ দেশে বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসা ভীতির আরেকটি কারণ। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগগুলো সংকুচিত হওয়ার কারণ শুধু সহিংস উগ্রবাদ নয়, এর পেছনে রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়া কিছু পদক্ষেপও দায়ী। দুই দিক থেকে চাপে পড়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ শঙ্কাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিষয়ের এ অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ তৈরি বা সহিংস উগ্রপন্থার খানিকটা বিস্তারে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে মূলধারার রাজনীতি। যদি মূলধারার রাজনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারা, বাকস্বাধীনতার অধিকার বাধাগ্রস্ত না করা, আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, রাজনীতি থেকে সত্যিকার রাজনীতি কেড়ে না নেওয়া হয়, সর্বোপরি রাষ্ট্রকে যদি ভয়ের উপাদানে পরিণত না করা হয়, তাহলে উগ্রপন্থার বিস্তারের তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে সহিংস উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটেছে। বিশ্বায়নের এ যুগে উগ্রপন্থার ছায়া বাংলাদেশেও যে পড়বে তা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। কারণ বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। এখন যদি আমরা উগ্রপন্থা বিস্তারে দেশের মধ্যেই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করি, তাহলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উগ্রবাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন হওয়া কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে সীমিত বিপদের মনে হতে পারে। কিন্তু মূলধারার রাজনীতি যেভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে তাতে দেশের বাইরে থাকা সহিংস উগ্রপন্থা যে কোনো সময় দেশের ভেতর বড় ধরনের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। দেশের মূলধারার রাজনীতিতেই সহিংস ও উগ্রপন্থি কথা বলার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমরা যখন মূলধারার রাজনীতিতে কোনো দলকে নির্মূল বা ধ্বংসের কথা বলি, তখন মনে হয় এটাই বৈধ প্রক্রিয়া। একজন আরেকজনের সমালোচনা করার অধিকার অবশ্যই রাখে। কিন্তু তাই বলে একজন আরেকজনের ধ্বংস সাধন করতে পারে না। কিন্তু আমরা বারবার সে চেষ্টাই করছি এবং সারাক্ষণ এ ধরনের কথাই বলছি। এ ধরনের বক্তব্যের কিছু প্রতিক্রিয়া তো প্রতিনিয়তই সমাজে পড়ছে। বারবার এ ধরনের কথা বলা সহিংস উগ্রপন্থার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ড. রীয়াজের মতে, উগ্রপন্থাকে মোকাবিলা করা কেবল সামরিকভাবে সম্ভব নয়। এটা একটা উপাদান হতে পারে, তবে সব নয়। দোষীদের অবশ্যই আইনি কাঠামোতে বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কৌশল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সবার আগে মূলধারার রাজনীতি থেকে অনুকূল পরিবেশ তৈরির পথ বন্ধ করে দিতে হবে। তখন দেখা যাবে, সমাজের ভেতরের শক্তিই পরিস্থিতি পাল্টে দেবে।  এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের। সেই সঙ্গে সিভিল সোসাইটির শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের বিস্তৃতি আরও বাড়াতে হবে।

তখন দেশের অভ্যন্তরের অনেক ছোট-বড় শক্তি উগ্রপন্থার বিপক্ষে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, মত প্রকাশের অধিকার বা বাকস্বাধীনতা শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার নয়। এটি মূলত জনগণের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার। জনগণ যখন অবাধে মত প্রকাশের সুযোগ পাবে, তখন সব রাজনৈতিক দলই তাদের কর্মকাণ্ড অবাধে চালাতে পারবে।

ড. আলী রীয়াজ বলেন, সরকার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সব পক্ষের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক যে উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল তা অনুপস্থিত। বরং সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া ‘অস্বীকৃতির কৌশল’ খুব একটা কার্যকর হয়নি। আক্রমণ ও হামলার সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, এগুলো ঘন ঘন হচ্ছে এবং আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে অস্বীকার করে উপায় নেই, মোকাবিলার কৌশলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, সাধারণত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর জাতীয় ও বৈশ্বিক দুই ধরনের এজেন্ডা থাকে। যখন জাতীয় ও বৈশ্বিক এজেন্ডা মিলে যায়, তখনই জাতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখা যায়। আর বাংলাদেশের উগ্রপন্থিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। সেই নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকেই লস্কর-ই-তাইয়্যিবা, হুজিসহ ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে থেকে কর্মকাণ্ড পরিচালনার তথ্য আছে। ফলে এটা নতুন কিছু নয়। এখন আইএ, একিউএস বা আল-কায়েদা যে নামেই ডাকা হোক, তা নিয়ে বিতর্ক করে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই। সবাই মিলে আলোচনা করে রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। শুধু শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান হবে না, যার অন্যতম প্রমাণ আফগানিস্তান।

তিনি বলেন, দেশীয় উগ্রবাদী গ্রুপের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করার আগ্রহী ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন খবরেই বলা হয়েছে, সিরিয়ায় গিয়ে যুদ্ধ করতে আগ্রহী ব্যক্তি দেশের ভেতরই আছেন। আর বিদেশে থাকা বেশ কিছু বাংলাদেশি তো ইরাক, সিরিয়ায় গিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করেছে। আরও একটি বড় গ্রুপ এ ধরনের যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহী এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরে বসে বাংলাদেশিদের জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরির সুস্পষ্ট অভিযোগও আছে। সর্বশেষ কানাডায় বসবাস করা এক প্রবাসীর বাংলাদেশে আল-কায়েদার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথাও খবরে এসেছে। এই প্রবণতাগুলো কোনোভাবেই কেবল শক্তি প্রয়োগ করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সবার অংশগ্রহণের রাজনৈতিক কৌশলের কোনো বিকল্প নেই।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন হত্যা ঘটনা তদন্তে পুলিশি কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন সম্পর্কে ড. রীয়াজ বলেন, এখন পর্যন্ত পুলিশের সাফল্য অত্যন্ত কম। তবে এর দায় পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার। ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি ঘটনার পরপরই অঙ্গুলিহেলন করা হয়, তাহলে পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ নিশ্চয়ই তৈরি হয়। নানা কারণেই পুলিশ তখন রাজনৈতিক নির্দেশনার বাইরে যেতে পারে না। তিনি বলেন, যেসব খুনখারাবি হচ্ছে তা মোটেও হুটহাট করে করা নয়। এগুলোর সবই সুপরিকল্পিত। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিশ্চয়ই অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর জোগানও নিয়মিতই আসছে। অথচ আমরা ইতিমধ্যে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে বড় সাফল্য অর্জন করে ফেলেছি বলে মনে করছি। অথচ সেই অর্থায়ন যে এখনো চালু আছে, বারবার খুনের ঘটনাগুলো তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

উগ্রবাদ ইস্যুতে বিশ্ব কূটনীতির নড়াচড়া সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. আলী রীয়াজ বলেন, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো দূরত্ব আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে সম্প্রতি এ সম্পর্ক বেশ দৃঢ় হয়েছে। এখন যে কোনো পর্যায়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা আছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে সফর ও ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য থেকে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র চায় উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ত্রিপক্ষীয়ভাবে কাজ করবে। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফর থেকে মনে হচ্ছে, এ ইস্যুর মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপক্ষীয়ভাবে কাজ করতে চায়। এই সহযোগিতার মধ্যে ভারত তৃতীয় কোনো পক্ষকে (যুক্তরাষ্ট্র) নিতে আগ্রহী নয়। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদী কার্যক্রম মোকাবিলায় নিশ্চয়ই সম্ভব সব সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ উৎসাহী হতেই পারে। তা না হলেও উগ্রবাদ মোকাবিলার স্বার্থে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা করে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সুযোগ ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ জনগণ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থ সবার আগে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow