Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৩ জুন, ২০১৬ ২৩:১১
পর্যবেক্ষণ
সাধু সেজো না সাধু হও
রোবায়েত ফেরদৌস
সাধু সেজো না সাধু হও

শ্রীশ্রীঠাকুর  অনুকূল  বলেছিলেন, ‘সাধু সেজো না, সাধু হও’। আজ আমরা কেউ কেউ সাধু সাজি, পীর সাজি, আবার অনেকে রাজনীতিবিদও সাজি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের একজন অধ্যাপক আছেন, তাকে দেখলে আমার মনে হয়, তিনি দার্শনিক সেজেছেন, পোশাকে-আশাকে, দাড়ি-গোঁফে। ঠাকুর অনুকূলের সেবাশ্রম, সৎসঙ্গ নামে যা খ্যাত, বাংলাদেশ-ভারত পেরিয়ে যার সুনাম ও শাখা পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে, সেখানকার সেবায়েতকে গেল ১০ জুন, ২০১৬ নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে ৩৫ বছর ধরে হেমায়েতপুরের ওই আশ্রমে সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করে গেছেন; মানুষকে যিনি ৩৫ বছর সেবা দিয়ে গেছেন তার ফল তিনি হাতেনাতে পেয়েছেন; ঘাতকরা ধারালো চাপাতির কোপে তার মাথা আর ঘাড় রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন করে ‘সেবাশ্রম’ থেকে ‘স্বর্গাশ্রমে’ পাঠিয়ে দিয়েছে। নিত্যরঞ্জন একেবারেই আটপৌরে জীবনযাপন করতেন, কারও সাতেপাঁচে ছিলেন না, জানা মতে তার কোনো শত্রু ছিল না। তাহলে কোন অপরাধে তাকে জীবন দিতে হলো? অপরাধ একটাই— তিনি ‘হিন্দু’। ঠাকুর অনুকূল সারা জীবন প্রেমের জয়গান গেয়েছেন; তিনি বলতেন, ‘হেমায়েতপুর জাগলে পুরো ভারত জাগবে’। হেমায়েতপুর জাগবে কিনা জানি না, কিন্তু নিত্যরঞ্জন আর জাগবেন না, এটা নিশ্চিত। ঠাকুরের আশ্রমে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন; স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ অনুকূল ঠাকুরকে নিয়ে পদ রচনা করেছেন। ঠাকুর অনুকূল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। হতাশায় নিমজ্জিত শীর্ষেন্দু আত্মহত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন, ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে তিনি জীবনের নতুন সত্য আবিষ্কার করেছিলেন। সেবায়েত নিত্যরঞ্জন নিহত হওয়ার পর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১১ জুন বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘আশ্রমের ভক্ত হিসেবে কষ্টটা বেশিই পেয়েছি’ শিরোনামে তার মনোবেদনার কথা লিখেছেন। গেল ১৭ মাসে এভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। ২০১৫ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩০ জনকে, আর ২০১৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই বিভিন্ন জেলায় ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন লেখক, প্রকাশক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ ও পুলিশের স্ত্রী, পুরোহিত, সাধু, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খ্রিস্টান ধর্মযাজক, শিয়া, বাউল, লালন-সাধক, পীরের অনুসারী, সমকামীদের অধিকারকর্মী, ব্লগার। এ তালিকা দীর্ঘতর। কে নেই এর ভিতরে? এসব ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায় স্বীকার করেছে আইএস বা ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদার কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলাম। সরকার অবশ্য সব সময়ই বলে আসছে দেশে জঙ্গি আছে কিন্তু আইএস নেই; এর তাত্পর্য আমাদের মতো নাদান নাগরিকরা এখন পর্যন্ত ঠওর করে উঠতে পারিনি। গেল ১২ জুন পুলিশের আইজি চট্টগ্রামে বলেছেন, জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম নামে দুটি জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল। আবার সরকারের ওপর মহল থেকে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত এবং ইসরায়েল-মোসাদের সম্পৃক্ত থাকার কথাও বলা হচ্ছে। ঠাকুর অনুকূল বলেছিলেন ‘তুষ ঝেড়ে চাল নিতে’। কোনটা যে চাল আর কোনটা যে তুষ সেটাই তো আমরা বুঝতে পারছি না। কার কথা বিশ্বাস করব? কোনটা সত্য? কোনটা অর্ধসত্য? আর কোনটা ডাহা মিথ্যা? জনগণ তা বুঝতে পারছে না। জনগণকে এ রকম ‘কনফিউজড’ রেখে রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা কি সম্ভব? কী করেই বা সরকারের কথিত ‘উন্নয়ন’ টেকসই হবে? হত্যা, হত্যার ভয় আর হত্যার হুমকি মাথায় নিয়ে কীভাবে মানুষ কাজ করবে? কোনো এক কবি বলেছিলেন, ‘জন্ম মানেই আজন্ম মৃত্যুদণ্ড বয়ে বেড়ানো’ — পাঠক ভাবুন, কবিরা কতটা সত্যদ্রষ্টা! বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় এর চেয়ে সত্য বাক্য আর কী হতে পারে? কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে? মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নামে জঙ্গি রাজনীতি ও হত্যাকাণ্ড সংঘটনের মতো ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে; নাস্তিক-মুরতাদ হত্যা জায়েজ এমন শিক্ষা তাদের দেওয়া হচ্ছে, উৎসাহিত করা হচ্ছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার — যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের পরিপন্থী: ধর্ম নিয়ে কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তিবিধানের সুযোগ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেই রয়েছে। এ ছাড়া প্রতীতি বলে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর সরকারের উদাসীনতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দীর্ঘসূত্রতা জঙ্গিদের আরও বেশি অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত করে তোলে; এ অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। আমরা চাই, আর যেন একজন মানুষও হত্যার শিকার না হন, চাই রাষ্ট্রে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হোক। ঠাকুর অনুকূল থেকে কথা ধার নিয়ে বলি : রাজনীতিবিদ না সেজে রাজনীতিবিদরা প্রকৃত রাজনীতিবিদ হয়ে উঠুন, কারণ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব, মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব শেষ বিচারে তাদের কাঁধেই; করুণ ও শেষ আশা নিয়ে মানুষ এখনো তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

রোবায়েত ফেরদৌস, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, robaet.ferdous@gmail.com




up-arrow