Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১৫ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৪ জুন, ২০১৬ ২২:৫২
মুজিবকে বঙ্গবন্ধুও বলত না জাসদ
-----------মহিউদ্দিন আহমদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
মুজিবকে বঙ্গবন্ধুও বলত না জাসদ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এখন আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে নেই বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের দ্বিধাবিভক্তির পর গঠিত জাসদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ পর্যন্ত বলত না। এক পর্যায়ে তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের স্লোগান ছিল, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। অবশ্য পরবর্তীতে তাদের ওই রাজনীতি করার সুযোগ বাংলাদেশে ছিল না। জাসদের রাজনীতিও এখন পাল্টেছে। এখন তারা জয় বাংলাও বলে, বঙ্গবন্ধুও বলে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন একসময় জাসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আর জাসদের দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। এটা আওয়ামী লীগের অনেক নেতার কাছে এখনো ‘সজীব’। তারা ওই প্রেক্ষাপট ভুলতে পারছেন না। দলের প্রতি ভালোবাসা আর প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা থেকেই এটা তারা ভুলবেন না। মাঝে মাঝে আবার জেগে ওঠেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যে মনে হয়, সেই পুরনো ক্ষতটাই মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে। বিশিষ্ট এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, জাসদের রাজনীতিই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাত করা। এটা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল। তারা গণবাহিনী গঠন করেছে। এটাকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বলা ঠিক হবে না। তবে তারা যাই করুক না কেন, ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। ফসল চলে গেছে অন্যের হাতে। তবে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দলটিই ছন্নছাড়া হয়ে যায়। তাদের পুনর্গঠিত হতে অনেক সময় লেগেছে। সরকারে ফিরে আসতে লেগেছে ২১ বছর। তিনি বলেন, একইভাবে জাসদও কিন্তু লাভবান হয়নি। তারাও এরপর অনেক ভাঙনের শিকার হয়েছে। জাসদ ভেঙে বাসদ হয়েছে। তারপর জাসদ ছেড়ে আ স ম আবদুর রব জেএসডি করেছেন, শাজাহান সিরাজরা চলে গেছেন। এখন জাসদ এবং আওয়ামী লীগ তাদের অতীতের রাজনীতি আঁকড়ে ধরে নেই। আওয়ামী লীগ এখন আর বাকশাল কায়েমের কথা বলে না। জাসদও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে না। তারা উভয়েই অতীতের রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে। সমাজতন্ত্রের কথা তারা কেউ বলে না। রাজনৈতিকভাবে তারা এখন অনেকটাই কাছাকাছি। আওয়ামী লীগের বাইরে জাসদের রাজনীতি আলাদাভাবে ভাবা যায় না। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সৈয়দ আশরাফের এ বক্তব্য যদি আওয়ামী লীগের বক্তব্য হয়, তাহলে ১৪ দলে এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে। এতে জাসদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাসদ এখন ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেছে। তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা নেই। তার পরও তাদের টিকে থাকার একটি প্রশ্ন আছে। এজন্যই তাদের দরকার বড় একটি জোটের সঙ্গে থাকা। জোট থেকে বেরিয়ে গেলে জাসদকে হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সৈয়দ আশরাফ বা আওয়ামী লীগের কিছু নেতার বক্তব্যের প্রশ্ন তুলে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জাসদের ১০ বছরের যে কার্যকলাপ আমি দেখছি, তা হচ্ছে জাসদ সর্বক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী আওয়ামী লীগের অবস্থানকে জাসদ জোরালো সমর্থন দিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতাদের চেয়েও তারা বেশি বিএনপি নেতাদের উঠতে-বসতে গালাগাল করেছে। সেই অবস্থায় তো জাসদের বিশ্বস্ততায় ঘাটতি পড়েছে কিংবা তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনটা তো বলা যাচ্ছে না। তাহলে সৈয়দ আশরাফ যে প্রসঙ্গটি তুলেছেন, তা বোধগম্য নয়। মনে হচ্ছে তারা অতীতের ভূমিকাটা এখনো ভুলতে পারেননি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে দাবি করে লেখক মহিউদ্দিন বলেন, আবদুল মালেক উকিল ১৫ আগস্টের পর লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ফেরাউনের পতন হয়েছে। সেই আবদুল মালেক উকিলকে আওয়ামী লীগ সভাপতিও করেছিল। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দলের অনেক নেতা অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা শেখ হাসিনার কাছ থেকে দলমুক্ত করতে চেয়েছিলেন। সেই অবস্থান থেকেও তো আওয়ামী লীগ সরে এসেছে। তিনি বলেন, জাসদের বিষয়ে সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যকে আমি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বলেই মনে করি। আর যদি এটা আওয়ামী লীগের বক্তব্য হয়, তাহলে ১৪ দলে প্রভাব পড়বে। ১৪ দলে আওয়ামী লীগের বাইরে আলোচিত দল হলো জাসদ আর ওয়ার্কার্স পার্টি। দুটি দলই কিন্তু ’৭২ ও ’৭৫-এ একই কথা বলত। ওয়ার্কার্স পার্টি গণবাহিনী না করলেও তারা আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাত করতে চেয়েছিল। তারা জিয়াউর রহমানকেও সমর্থন দিয়েছিল। এগুলো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। তারাও আজকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সৈয়দ আশরাফের আগে শেখ সেলিমও একই কথা বলেছেন। এটা সত্যের একটি দিক। মুদ্রার এক পিঠ। ওই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে জনমত গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল জাসদ। তবে জাসদেরও একটি রাজনীতি ছিল। সেই রাজনীতির কারণেই এ বিরোধিতা করেছিল। এখন কথা হচ্ছে, ওই সময় জাসদের প্রতি আওয়ামী লীগের যে আচরণ, তাও জাসদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ওই সময় জাসদের মূল্যায়ন ছিল, আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছে। গণতন্ত্র হরণ করেছে। তিনি বলেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য ছিল, জাসদ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করেছে। এ ষড়যন্ত্রের কারণেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হয়েছেন। এখানে মুদ্রার দুই পিঠই আছে। আমি সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য উড়িয়ে দিচ্ছি না। তার তো একটা আহতবোধ আছেই। ১৫ আগস্টের হত্যার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। একে তিনি কীভাবে ভুলে যাবেন? আমি যদি সৈয়দ আশরাফের জায়গায় থাকতাম, আমি কীভাবে দেখতাম? কাজেই এ বিষয়টিকেও হালকাভাবে নেওয়া যাচ্ছে না। বিশিষ্ট এই গবেষক বলেন, ৪০ বছরে আমাদের বুড়িগঙ্গার জল অনেক গড়িয়েছে। আপনি যখন জোটের রাজনীতি করবেন, সেখানে ‘গিভ অ্যান্ড টেকের’ ব্যাপার আছে। আপনি আজ কার সঙ্গে বিছানায় যাবেন, কাল কার সঙ্গে যাবেন, তা বলা মুশকিল। তবে কতগুলো পয়েন্টে ঐকমত্য হতে হয়। সেখানে জাসদ ও আওয়ামী লীগের অংশীদারিত্ব সেভাবেই গড়ে উঠেছে। তাদের এখন কমন শত্রু বিএনপি। সুতরাং সে ক্ষেত্রে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। তিনি বলেন, জাসদ জোটে থাকলে আওয়ামী লীগের জন্যও একটি সুবিধা আছে। তা হলো আওয়ামী লীগের শত্রুর সংখ্যা একটি কমল। এতে আওয়ামী লীগেরও বেনিফিট আছে। সুতরাং এসব বিষয় চিন্তা করে আমার কাছে মনে হয়েছে, জোটে থাকলে আওয়ামী লীগ ও জাসদেরও লাভ। সুতরাং সৈয়দ আশরাফ কেন এ কথাগুলো বললেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্ন তোলা হয়। এতে মনে হয় তারা জাসদের অতীতের ভূমিকা ভুলতে পারছেন না। মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি। তিনি যখন কথা বলেন, ধরে নেব তিনি দায়িত্ব নিয়েই কথা বলছেন। তার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত একে আমি সৈয়দ আশরাফের ব্যক্তিগত মতামতই ধরে নেব। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের সমাবেশে আশরাফ যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আমি ধরে নিলাম, তাদের এমন সময় জন্ম বা বেড়ে ওঠা যখন আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে বৈরী সম্পর্কটা ছিল না। সুতরাং ওই সমাবেশে গিয়ে তিনি কেন অতীতের এ বিষয়টি গিয়ে খুঁচিয়ে তুললেন এতে আমি অবাক হয়েছি। তাহলে কি ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত জাসদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে বৈরী সম্পর্কটা ছিল, যারা পরস্পর পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু ছিল, সেই সাংঘর্ষিক সম্পর্কটা এখনো তারা ভুলতে পারেননি? মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, যদি এটা দলের বক্তব্য হয়ে থাকে, তাহলে আমি ধরে নেব দলগতভাবে আওয়ামী লীগ এখনো জাসদের ওই সময়ের কার্যকলাপকে রিকনসাইল করতে পারেনি। এখন জাসদ যেহেতু ২০০২ সাল থেকে ১৪-দলীয় জোটের পার্টনার। সুতরাং এ পার্টনারশিপ ১৪-১৫ বছর হয়ে গেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনও তারা জোটে করেছে। তারপর যে সরকার ছিল তারও পার্টনার জাসদ। ২০১৩ সাল থেকে মন্ত্রিসভায়ও জাসদ আছে। এতদিন পর হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন উঠল, তাহলে কি জাসদের কার্যকলাপ কিংবা হাসানুল হক ইনুর কার্যকলাপে তারা ক্ষুব্ধ?




up-arrow