Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ জুন, ২০১৬ ২৩:৩২
ছয়জনের ফাঁসি বহাল
দলগুলো উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল : হাইকোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছয়জনের ফাঁসি বহাল

এক যুগ আগে গাজীপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আট আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দিয়েছে আদালত। এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের জেল আপিলের শুনানি শেষে গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। ২০০৪ সালে জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি আহসান উল্লাহ মাস্টারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিম্ন আদালতে ফাঁসির আদেশ পাওয়া ২২ জনের মধ্যে হাইকোর্টে ছয় জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে, সাতজনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও সাতজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দুই আসামির মৃত্যু হওয়ায় তাদের মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির মধ্যে একজনের দণ্ড বহাল, চারজন খালাস পেয়েছেন। অন্য একজন আপিল না করায় তার দণ্ডও বহাল রয়েছে। বিচারিক আদালত থেকেই খালাস পান দুই আসামি কবির হোসেন ও আবু হায়দার ওরফে মিরপুরইয়া বাবু। হাইকোর্টে নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দিপু (পলাতক), মাহবুবুর রহমান, শহীদুল ইসলাম শিপু, হাফিজ ওরফে কানা হাফিজ এবং সোহাগ ওরফে সরুর মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। তবে মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু (পলাতক), আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু (পলাতক), রতন মিয়া ওরফে বড় রতন, ছোট জাহাঙ্গীর (পলাতক), আবু সালাম ওরফে সালাম ও মশিউর রহমান ওরফে মিশুকে (পলাতক) মৃত্যুদণ্ড থেকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর নুরুল আমিনের যাবজ্জীবন বহাল রাখা হয়েছে।

ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত আমির হোসেন, জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর, ফয়সাল (পলাতক), লোকমান হোসেন ওরফে বুলু, রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির (পলাতক), খোকন (পলাতক) ও দুলাল মিয়াকে হাইকোর্টে খালাস দেওয়া হয়েছে। বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু, আইয়ুব আলী, জাহাঙ্গীর ও মনিরকে হাইকোর্টে খালাস দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত অহিদুল ইসলাম টিপু পলাতক থাকায় তার সাজার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আদালত। বিচারিক আদালতে ফাঁসির দণ্ডাদেশ পাওয়ার পর মারা যাওয়ায় আল আমিন ও রতন ওরফে ছোট রতনের আপিলের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। রায় শুনতে হাইকোর্টে উপস্থিত হন নিহত আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল এমপি। আদালত চত্বরেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত হন। জাহিদ আহসান রাসেল হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের এ রায়ে আমরা আংশিক সন্তুষ্ট। পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এজন্য আপিল করব। আশা করি আপিলে খালাসপ্রাপ্তদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হবে।’ এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রোনা নাহরীন ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মনজু নাজনিন এবং আসামিপক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ কয়েকজন আইনজীবী শুনানি করেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ৭ মে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠের এক সমাবেশে তৎকালীন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও গাজীপুরের জনপ্রিয় নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় পরদিন ৮ মে নিহতের ভাই মতিউর রহমান টঙ্গী থানায় ১৭ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০৪ সালের ১০ জুলাই অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায়ে বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া দুজনকে খালাস দেওয়া হয়। পরে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল, জেল আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর গত ২১ জানুয়ারি শুনানি শুরু হয়।

‘আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রমাণ’ : আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন হত্যাকাণ্ড খুব কমই ঘটেছে। রাজনৈতিক দলগুলো উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের উপর নির্ভরশীল। গতকাল হাইকোর্ট এমন পর্যবেক্ষণ দেয়। আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের রায়ে কিছু পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। আদালত বলে, যে হত্যাকাণ্ড কেন্দ্র করে এই ডেথ রেফারেন্স আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে নিঃসন্দেহে এটি জঘন্যতম ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে খুব কমই সংঘটিত হয়েছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ স্কুলে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ থেকে সম্যক উপলব্ধি করা যায়।

আহসান উল্লাহ মাস্টারকে আদর্শবান রাজনীতিক উল্লেখ করে আদালত বলে, আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবনের শুরুতে ছিলেন একজন শিক্ষক, পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সবশেষ জাতীয় সংসদের একজন সদস্য হিসেবে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধাভাজন। তার হত্যাকাণ্ডে পরিবার ও জনগণ তার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার মতো একজন আদর্শবান সংসদ সদস্য হিসেবে বেঁচে থাকলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে তিনি আরও অনেক ভালো কাজ করতে পারতেন, যা থেকে জাতি উপকৃত হতো।

up-arrow