Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ জুন, ২০১৬ ২৩:২৮
মফস্বলের খুনি ঢাকায় ঢাকার খুনি মফস্বলে
সাখাওয়াত কাওসার
মফস্বলের খুনি ঢাকায় ঢাকার খুনি মফস্বলে
মাদারীপুরে শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টায় আটক ফয়জুল্লাহ ফাহিন

২০১৫ সালের ৩০ মার্চ রাজধানীতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুর কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া জিকরুল্লাহ্র গ্রামের বাড়ি নরসিংদী রায়পুরের গজারিয়াকান্দিতে। তার বাবার নাম মইনুদ্দীন।

সে পড়াশোনা করেছে চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায়। ওই হামলায় অংশ নেওয়া আরিফুলের বাড়িও কুমিল্লার তিতাস থানার বারকাউলিয়ায়। তাদের সবাই বড় ভাইয়ের নির্দেশে ঢাকায় এসেছিল। বাবুকে হত্যার পর তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। গত বছরের ৫ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডায় প্রকৌশলী খিজির খান কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তরিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল দেলদুয়ার থানার মৌলভীপাড়ায়। ১৪ অক্টোবর গ্রেফতার হওয়ার পর সে স্বীকার করে, এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে কিলিং মিশনের জন্য ঢাকায় এসেছিল। টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামে সে ভবঘুরে যুবক হিসেবে পরিচিত। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবির দুর্ধর্ষ সদস্য তরিকুল ২০০৫ সালে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার আসামি। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল বগুড়ার শেরপুরে বোমা বিস্ফোরণে নিহত দুজনের মধ্যে আরেক জেএমবি সদস্য তরিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের দামুয়ায়। তার বাবার নাম আবুবক্কর সিদ্দিক। এত গেল মাত্র তিনটি ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার কলেজছাত্র ফয়জুল্লাহ ফাহিন মাদারীপুরের  সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে কুপিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করে। গোয়েন্দারা বলছেন, অপারেশনের কৌশল হিসেবে এক এলাকার জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের সদস্যদের অন্য এলাকার অপারেশনে পাঠাচ্ছে। মফস্বলের জঙ্গি ঢাকায় এবং ঢাকার জঙ্গিরা মফস্বলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নির্বিঘ্নে অপারেশন করে নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। অনেকটা কাট-আউট পদ্ধতিতে কাজ করছে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখকে ফাঁকি দিতে নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে জঙ্গিরা।

তারা আরও বলেছেন, জঙ্গিদের কৌশল মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি জঙ্গিদের নতুন কৌশল নিয়ে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দফতরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। নির্ধারণ হয়েছে জঙ্গি মোকাবিলার বিভিন্ন কর্মকৌশল। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি, চেকপোস্ট বৃদ্ধি ও ভিজিবল পুলিশিং বৃদ্ধির বাইরে প্রয়োজনে সন্দেহভাজন এলাকায় ব্লক  রেইড অপারেশনের সিদ্ধান্ত এসেছে বলে নিশ্চিত করেছে সূত্র।

সর্বশেষ গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর লালমাটিয়ায় প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে আহমেদুর রশিদ টুটুলসহ তিনজনকে নৃশংসভাবে কোপানোর ঘটনায় অংশ নিয়েছিল সুমন হোসেন পাটোয়ারী ওরফে সিহাব ওরফে সাইফুলসহ (২০) আরও পাঁচজন। হামলা চালানোর দুই মাস আগে তাদের ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। মহাখালীর একটি বাসায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম থেকে আসে সিহাব। অপারেশন শেষে সিহাব চট্টগ্রাম চলে যায়। সে যাত্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন টুটুল। বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর থানার পার্শ্ববর্তী রাস্তা থেকে সিহাবকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার সিহাব নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য। এবিটির অপর একটি গ্রুপ একই দিন আজিজ মার্কেটে জাগৃতির প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করে। শুদ্ধস্বরের হামলার সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল এবিটি নেতা শরিফের ওপর। যাকে ধরতে ডিএমপির পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া জাগৃতির হামলার নেতৃত্বে ছিল সেলিম নামে একজন। এ দুজনই এবিটির তৃতীয় পর্যায়ের নেতা। তাদের ওপরে শুধু এবিটির সামরিক কমান্ডার ও আধ্যাত্মিক নেতা রয়েছে। তারা দুজনই দুর্ধর্ষ প্রকৃতির।

ডিবি সূত্র বলছে, সাকিব চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করত। সেখান থেকে গত বছরের শুরুর দিকে সে এবিটিতে যোগ দেয়। প্রাথমিক ট্রেনিং তাকে চট্টগ্রামেই দেওয়া হয়। এরপর বড় অপারেশনের জন্য দক্ষ হলে তাকে ঢাকায় আনা হয়। ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে তাদের কোরআন-হাদিসের খণ্ডিত অংশের অপব্যাখ্যা দিয়ে মস্তিষ্ক ধোলাই করা হয়। এরপর কীভাবে হামলার করতে হবে এবং কীভাবে চাপাতি রাখতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

গত দুই বছরে একের পর এক ব্লগার থেকে শুরু করে লেখক, প্রকাশক, শিক্ষাবিদ, যাজক, পুরোহিত, সেবায়েত, বিদেশি নাগরিক হত্যার তদন্তে নেমে এমনই তথ্য পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় জঙ্গি হামলা ঠেকানোর বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত পুলিশ। চিন্তিত জঙ্গিদের কৌশল বদল নিয়েও। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, জঙ্গি হামলা ঠেকাতে ও জঙ্গি সদস্যদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধিসহ ভিজিবল পুলিশিংও বাড়ানো হয়েছে। জঙ্গিরা যেসব কৌশল প্রয়োগ করছে পুলিশও পাল্টা কৌশল প্রয়োগ করছে। আতঙ্কের কোনো কারণ নেই বলে দাবি করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে জঙ্গিদের বেশভূষা ছিল পাঞ্জাবি-পাজামা এবং টুপি। দাড়ি ছিল সাধারণ দৃশ্য। এসব কারণে সহজেই সন্দিগ্ধ হতো তারা। কিন্তু বর্তমানে জঙ্গি সদস্যরা তাদের  কৌশলের অংশ হিসেবে বেশভূষা পরিবর্তন করেছে। জঙ্গিরা এখন দাড়ি রাখে না। পাজামা-পাঞ্জাবির বদলে তারা আধুনিক  পোশাক পরে।

বর্তমান কৌশল : একাধিক গোয়েন্দা সূত্র বলছে, জঙ্গিরা এখন সর্বোচ্চ তিনজন একসঙ্গে চলাফেরা করে। সঙ্গে মোটরবাইক থাকলে তার কাগজপত্রে কোনো ধরনের ত্রুটি থাকে না। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কোনো চেকপোস্টে দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে না পারে। যাতায়াতের ক্ষেত্রে বা কোনো অপারেশনে যেতে তারা ভোরবেলাকে বেছে নিচ্ছে। বয়সে তরুণ এসব জঙ্গি সদস্যরা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে থাকে। খরচ বাঁচাতে কম ভাড়া দিতে হয় এমন এলাকাকেও বেছে  নেয় তারা। বাসাভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে নিচতলা বা টপ ফ্লোরকে বাছাই করে থাকে। বাসায় কোনো কাজের লোক থাকে না। আসবাবপত্রও রাখা হয় নামকাওয়াস্তে। যাতে যে কোনো সময় তারা বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে।

সূত্র আরও বলছে, বর্তমান সময়ের এসব জঙ্গি যেসব এলাকায় থাকে তারা বাসার কাছাকাছি কোনো দোকান থেকে কোনো কিছু  কেনাকাটা করে না। প্রতিবেশীদের কারও সঙ্গে মেশা বা কথা বলা থেকে বিরত থাকে। এরা সাধারণত অসময়ে বাসা থেকে  বের হয়। চলাচলের সময় কাউকে সালাম দেয় না বা সালামের উত্তরও দেয় না। মাথা নিচু করে ভদ্রবেশে চলাফেরা করে এরা। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, র‌্যাব সৃষ্টির পর থেকেই জঙ্গি দমনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি জঙ্গি হামলার ঘটনা কিছুটা বাড়লেও তা অতি শিগগিরই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে দাবি তার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে কয়েক দফায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় কিংবা অফ ডিউটিতেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় সব সময় অন গার্ড পজিশনে থাকতে বলেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তিনি আরও বলেন, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, একই গ্রুপের সদস্যরা একে অপরকে চিনে না। কেবল তাদের ছদ্মনামের বিষয়েই পরিচিত। এমনকি তাদের গ্রামের বাড়ি কিংবা অন্য বিষয়েও অবগত থাকে না। আগে জঙ্গিদের এক ধরনের চলাফেরা ছিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow