Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ২০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৯ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৪
বন্দুকযুদ্ধে এবার অভিজিৎ হত্যার আসামি নিহত
বিশেষ প্রতিনিধি
বন্দুকযুদ্ধে এবার অভিজিৎ হত্যার আসামি নিহত

রাজধানীর খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এবার মুক্তমনা ব্লগার আমেরিকা প্রবাসী অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার আসামি শরিফুল ওরফে সাকিবের মৃত্যু হয়েছে। সে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সামরিক ও আইটি শাখার প্রধানের দায়িত্বে ছিল। শনিবার রাত পৌনে ৩টার দিকে মেরাদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শরিফুলের মৃত্যু হয়। শরিফুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষিত ছয় জঙ্গির অন্যতম। লেখক অভিজিৎ রায়সহ সাতটি টার্গেট কিলিংয়ে সে জড়িত। শরিফুল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বিভিন্ন অভিযানের জন্য সদস্য নির্বাচন ও সংগ্রহে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছিল বলে দাবি পুলিশের। পুলিশ  জানায়, নিহত শরিফুল একাধিক নামে পরিচিত। যেমন—সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদি। অভিজিৎ হত্যার তদন্তে সিসিটিভির ফুটেজে শরিফুলের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ডিবির উপকমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গি সুমন হোসেন পাটোয়ারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পুলিশ। এর অংশ হিসেবে শনিবার দিবাগত রাতে ডিবির একটি দল মেরাদিয়া এলাকায় তল্লাশি অভিযানে যায়। সেখানে সন্দেহ হওয়ায় মোটরসাইকেলের তিন আরোহীকে ধাওয়া করা হয়। মোটরসাইকেল আরোহীরা ডিবিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ডিবিও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী পালিয়ে যায়। একজন গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ডিবি সূত্র জানায়, লেখক-ব্লগার হত্যার যতগুলো ঘটনা ঘটেছে এর প্রতিটি সম্পর্কে শরিফুল জানত। প্রকাশক টুটুল হত্যাচেষ্টার দিন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ের বাইরে সে অবস্থান করছিল। ব্লগার নীলাদ্রি নিলয়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রিয়াজ মোর্শেদ বাবু হত্যার মিশনেও সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিল সে। এ ছাড়া জাগৃতি প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা, পুরান ঢাকায় নাজিমুউদ্দিন সামাদ এবং কলাবাগানে জুলহাজ মান্নান ও তনয় হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে শরিফুলকে চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা। শরিফুল ওরফে সাকিব একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। তার বাড়ি বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে। একটি এনজিওতে সে চাকরি করত। লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনসহ ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজন ছয়জনকে ধরিয়ে দিতে তাদের নাম ও ছবি গণমাধ্যমে ১৯ মে প্রকাশ করে ডিএমপি। এই ছয়জন হলো সুমন, শরিফুল, সেলিম, সিফাত, রাজু ও সাজ্জাদ। তাদের ধরিয়ে দিলে দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পুরস্কার ঘোষিত ছয়জনের মধ্যে সুমনকে ১৫ জুন রাজধানী থেকে গ্রেফতার করা হয়। শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাকি পাঁচজনের মধ্যে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলো। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অপারেশন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল শরিফ, যে প্রতিটি হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকত। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, একজন আধ্যাত্মিক নেতা  সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকেন। সংগঠনের কর্মীরা তাকে বুজুর্গ বলেন। তিনি সংগঠনের পক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। তার পরে থাকেন সংগঠনটির একজন অপারেশনাল প্রধান। তিনি সব হত্যার পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন ও সার্বিক বিষয় মনিটর করেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে কর্মীদের রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিত শরিফ। বিভিন্ন হত্যার অভিযান সমন্বয়ও করত সে। হত্যা যেখানে করা হতো ওই এলাকায় অবস্থানও করত শরিফ। সেলিম নামে আনসারুল্লাহর উচ্চপর্যায়ের এক সদস্য রয়েছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, কাকে হত্যা করতে হবে, কেন হত্যা করতে হবে, কোন এলাকায় কীভাবে গিয়ে হত্যা করতে হবে, এর তথ্য সংগ্রহ করে নির্দেশনা দেয় সেলিম। এ ছাড়া যারা হত্যায় অংশ নেবে তাদের মোটিভেশনাল ট্রেনিং দেয়। নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন ওই লোককে হত্যা করা জরুরি তাও সেলিম ব্যাখ্যা করে। হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে শরিফ ও সেলিম তাদের একজন অপারেশনাল প্রধানের (বড় ভাই) সঙ্গে বৈঠক করত। এ জন্য তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের ভাড়া বাসায় বসত। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ‘ক্রসফায়ারে’ মোট ১৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক মাসেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কয়েক ডজন। এ ধরনের ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমালোচনা করে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।




up-arrow