Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ২০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৯ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৯
পর্যবেক্ষণ
পরীক্ষার্থী আছে শিক্ষার্থী নেই!
রোবায়েত ফেরদৌস
পরীক্ষার্থী আছে শিক্ষার্থী নেই!

দেশে মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়। গেল গেল সব রসাতলে গেল বলে চিৎকার করে উঠে সবাই। সেটা থেমে গেল আরেকটি ইস্যু আসে; সেটিও চাপা পড়ে অন্য ইস্যুর জাঁতাকলে। এভাবেই চলছে। চলতে থাকবে বোধ করি। মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর অনেকে অনেক মত দিয়েছেন। লোকমান্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষার্থীরা ফেল করবে কেন?

ঠিকই বলেছেন, এত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা ফেল করছে কেন! শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অবারিত সুযোগ, উপবৃত্তির টাকা-আনা-পাই, সেরের ওপর সোয়া সের হিসেবে আছে প্রশ্ন ফাঁস— তারপরও কেন ফেল? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আরও ভালো ফল চাই! সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আমরা আসলে শুধু পরীক্ষা চাই, পরীক্ষায় শতভাগ পাসের হার চাই, গাদা গাদা জিপিএ পাঁচ চাই; পুরো শিক্ষাব্যবস্থা যেন ‘পাস’ আর ‘পাঁচে’ গিয়ে পচেছে। তাই আমরা পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি— পরীক্ষার এরকম বিস্তৃত নাম পাচ্ছি; আছে নানান কিসিমের মডেলটেস্ট আর অসংখ্য অ্যাডমিশন-টেস্ট বা ভর্তি পরীক্ষা— ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে। পরীক্ষার পরিধি বাড়ছে আর আমরা লাখ লাখ ‘পরীক্ষার্থী’ পাচ্ছি; কিন্তু আফসোস হদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বালাবে, শিক্ষার স্পৃহা বুকে নিয়ে ভয়শূন্য চিত্ত গড়বে এমন ‘শিক্ষার্থী’ পাচ্ছি না। ‘শিক্ষা’, ‘জ্ঞান-তৃষ্ণা,’ আর ‘শিক্ষার্থী’ শব্দগুলো রিডিউসড্ হয়ে যাচ্ছে তথাকথিত ‘পরীক্ষার্থী’ শব্দের মধ্যে। এ জন্য দেশে কেবল ‘পরীক্ষার্থী’ আছে কোনো ‘শিক্ষার্থী’ নেই!

এ জন্যই, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে দেশের শিক্ষা পরিস্থিতি ভালো নেই; শিক্ষামন্ত্রী দীর্ঘকাল ধরে চেষ্টা করছেন মান উন্নয়নের, সংগ্রাম করছেন এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্য, কিন্তু বদলাতে পারেননি। যে সংগ্রাম চলছে সেটা খানিকটা মৌখিকও বটে। নয়তো কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও মন্ত্রী বাহাদুর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারলেন না কেন? মন্ত্রীর ক্ষমতার থেকে কি কোচিং সেন্টারের ক্ষমতা বেশি? এই ডামাডোলের মধ্যেই দিন কয়েক আগে পরীক্ষা থেকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ পদ্ধতি উঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। একই সঙ্গে তারা নোট-গাইড ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা বন্ধ করা, শিক্ষাক্রম সংশোধন করে সহজভাবে বই তৈরি, পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার, প্রশ্নব্যাংক তৈরি করে সেখান থেকে পরীক্ষা নেওয়াসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১২ সালের জুন মাস নাগাদ ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কোথায় সেই নীতিমালা? এতে বলা হয়েছিল, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। এমনকি শিক্ষকেরা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারেও পড়াতে পারবেন না। তবে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। সরকার-নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের ভিতরই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস করানো যাবে (প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০১২)। এই নীতিমালা না মানলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জড়িত শিক্ষকের বেতনের সরকারি অংশ বা এমপিও বাতিল বা স্থগিত করা হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে। কই, চার বছর পেরিয়ে গেল, এর প্রয়োগ কি আমরা দেখেছি? আদৌ কি এর প্রয়োগ দেখব কাঁদিলে কোঁকালে? এরপর আসা যাক গাইড বইয়ের কথায়। প্রথম যখন এমসিকিউ পদ্ধতি চালু করা হয় তখন একটি ঢাউস সাইজের গাইড বুকও বাজারে আসে, যাতে কয়েকশ প্রশ্ন থাকত। এখান থেকে শিক্ষার্থীরা মোটামুটি সব প্রশ্নই ‘কমন’ পেয়ে যেত। এভাবে গাইড বই ব্যবসার নতুন আরেকটি দিগন্ত তখন উন্মোচিত হলো! ব্যাপক সমালোচনার মুখে ওটা পাল্টে করা হলো সৃজনশীল পদ্ধতি, সঙ্গে এমসিকিউ-ও থাকল। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারে না এমন শিক্ষকের সংখ্যা কয়েক হাজার। একটা ছোট্ট উদাহরণ, ২০১৫ সালে, শরীয়তপুর জেলা শহরের দুটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় ১৮৬ জন অকৃতকার্য হয়েছিল। এদের ১৭৮ জন গণিতে অকৃতকার্য হয়। কারণ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকেরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে গণিত পড়াতে পারেননি।

প্রশ্নপত্র ফাঁস? একে সরকারের ‘জীবন-মরণ সমস্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু অদ্যাবধি তিনি এই সমস্যা ঠেকাতে পারেননি। তার ওপর গোদের উপর বিষফোঁড়া হলো, শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি না বোঝা! এই সমস্যার সমাধান কে করবে? আছে শিক্ষকের সংকট এবং যথাযথ শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব। শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে সর্বাগ্রে দরকার দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক। প্রশ্ন হলো মাধ্যমিক এবং উচ্চম্যাধমিক পর্যায়ে পড়ানোর জন্য কজন মেধাবী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন? সুযোগ-সুবিধার অভাবে মেধাবীরা এ পেশায় কম যাচ্ছেন। মনে রাখা দরকার, একটি রিকশাকে নিশান গাড়ির গতি দেওয়া যায় না। আর শিক্ষার যে মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা, এটা আলোচনা থেকে সব সময় বাদ পড়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন না করে আমরা মাধ্যমিক শিক্ষার কথা ভাবছি কীভাবে? একটু খোঁজ-খবর যারা রাখেন, তারা ঠিকই জানেন, এখানে কারা পড়াচ্ছেন, তাদের যোগ্যতা কী? শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের কী সাফল্য নেই? বিস্ময়কর সাফল্য আছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই সরকারেরই সাফল্য আছে। হিসাবে দেখা যাচ্ছে ’৯১ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত ৮ হাজার ২১টি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে ১৯৪৭ পূর্ববতী সময়ে স্কুলের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৩০টি। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছরে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১৯১টি এবং স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৪ হাজার ৪৪২টি। শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। যেখানে ’৯০ সালে এর পরিমাণ ছিল শতকরা ৩৩ দশমিক ৬ ভাগ সেখানে ২০১৪ সালে নারীর অংশগ্রহণ ৫০ দশমিক ৭৪ ভাগে পৌঁছেছে। তবে সব সময় অংশগ্রহণই উন্নয়ন নয়। দরকার কোয়ালিটি অংশগ্রহণ, মানসম্মত শিক্ষা ও গুণগত পরিবর্তন। বাংলাদেশের বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ প্রতিবেশী দেশসমূহের চেয়ে অনেক কম এবং ইউনেস্কোর ন্যূনতম বরাদ্দ থেকে বেশ নিচে। জাতিসংঘের সদস্য-দেশগুলোর গৃহীত এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় শিক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের ৪-৬ শতাংশ বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এবারের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া তার অর্ধেক, ২.৪ শতাংশ। মধ্যম আয় এবং পরে উচ্চ আয়ের দেশে যাওয়ার যে স্বপ্ন-লক্ষ্য আমরা স্থির করেছি সে পথে পৌঁছতে হলে অতি অবশ্যই প্রতিশ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;  robaet.ferdous@gmail.com




up-arrow