Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ জুন, ২০১৬ ২৩:০৬
অবৈধ বিলাসী গাড়ির ছড়াছড়ি
আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা । মডেল পরিবর্তন । শুল্কমুক্ত ও পর্যটন সুবিধার অপব্যবহার
রুহুল আমিন রাসেল
অবৈধ বিলাসী গাড়ির ছড়াছড়ি

সারা দেশে নামিদামি ব্র্যান্ডের অবৈধ বিলাসী গাড়ির ছড়াছড়ি। কেউ কেউ ধরা খাওয়ার ভয়ে গাড়ি রাস্তায় রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা, কাগজপত্রে প্রকৃত মডেল পরিবর্তন, শুল্কমুক্ত ও পর্যটন সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে আনা হয়েছে এসব অবৈধ গাড়ি। ন্যূনতম ২৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২২ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এমন দুই শতাধিক গাড়ি ধরতে বাসা-বাড়ি, অফিস ও রাস্তায় অভিযানে সক্রিয় আছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।  জানা গেছে, শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতি নয়, শিক্ষক এবং শোবিজ তারকারাও ব্যবহার করছেন অবৈধভাবে আনা দামি বিলাসী গাড়ি। দু-একটি রুলস রয়েলস নয়, বিএমডব্লিউ, পোর্শা, মার্সিডিজ, প্রাডো গাড়িতে এখন সয়লাব রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলো। মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এসব অবৈধ গাড়ির মালিকরা এখন ধরা খাওয়ার ভয়ে রাস্তায় রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েক মাসে এমন নামিদামি বেশ কিছু গাড়ি বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারও করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ গাড়ি ধরার অভিযানে গতকাল পর্যন্ত ২২টি বিলাসী গাড়ি আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। জানা গেছে, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে তিন শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ২০১০ থেকে ২০১৩ সালে ‘কার্নেট ডি প্যাসেঞ্জার’ সুবিধায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে প্রায় দেড়শ গাড়ি ফেরত যায়। বাকি দেড় শতাধিক গাড়ি মালিকানা বদল করে জাল দলিল ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা আরও কয়েকশ দামি অবৈধ গাড়ি বাংলাদেশে আছে বলে মনে করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

তবে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে আটক হওয়ার মতো দেশে দুই শতাধিক অবৈধ গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়িতে ২৫ লাখ থেকে ২২ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ২২টি গাড়ি ধরা হয়েছে। বাকিগুলো ধরার প্রক্রিয়া চলছে। তার দাবি, দেশে আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে গাড়ি আসছে। আবার কেউ কেউ পরিবর্তন করে কম দামি গাড়ির মডেল উল্লেখ করছেন কাগজপত্রে। গাড়ি আমদানিতে পর্যটন ও শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার করা হচ্ছে। ইপিজেডের বিনিয়োগকারীরাও এই অসাধু পথে হাঁটছেন।

গাড়ি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কার্নেট সুবিধার নামে অসংখ্য গাড়ি সারা দেশে আছে। এসব গাড়ি কীভাবে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) রেজিস্ট্রেশন পেল, তাও খতিয়ে দেখা উচিত। কেননা লন্ডন থেকে গাড়ি এনে দেশে ছয় মাস এক বছর ব্যবহারের কথা বলে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস এভাবে শুল্কমুক্ত গাড়ি ছেড়ে দিলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানান তারা। এমন প্রেক্ষাপটে অবৈধ গাড়ি ধরতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন। জানা গেছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে গাড়ি আনার যে সুবিধা রয়েছে, এরই অপব্যবহার করে দেশে অনেক দামি গাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু নিয়ম অনুসারে এসব গাড়ি পর্যটকদের জন্য ‘কার্নেট ডি প্যাসেজ’ সুবিধায় বাংলাদেশে এনে আবার বাইরে ফেরত নিয়ে যাওয়ার কথা। তা না করে দেশের ভিতর মালিকানা হাতবদল করে এসব গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন অনেক ধনকুবের মালিক। এ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করে ধরা পড়লে অনেক সময়ে সরকারের প্রাপ্য শুল্ক নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময়ে তা বাজেয়াপ্ত করা হয়। সেই সঙ্গে পণ্যমূল্যের ১০ গুণ পর্যন্ত জরিমানা করার আইন রয়েছে। এ ছাড়া অপরাধীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে এবং ফৌজদারি আইনেও বিচারের বিধান রয়েছে। এর শাস্তি ১২ বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা দুটোই হতে পারে। এনবিআর ও শুল্ক গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, আগে তাদের ধারণা ছিল কেবল বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরাই কোটি কোটি টাকা দামের গাড়ি ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের সে ধারণা ভেঙে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-এমপি, বুয়েটের একজন শিক্ষক ও শোবিজ জগতের এক তারকার কাছ থেকে অবৈধভাবে ব্যবহার করা বিলাসী গাড়ি উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। এখানেই শেষ নয়। বিএমডব্লিউ, পোর্শা, মার্সিডিজ বেঞ্জের মতো কয়েকশ গাড়িতে এখন সয়লাব রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকা।

শুল্ক গোয়েন্দা জানিয়েছে, সর্বশেষ গতকাল মংলা বন্দরে দুটি ও রাজধানীর কমলাপুর আইসিডিতে একটি গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। এর আগে ১৩ জুন রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের চারটি মারসিডিজ নিউ ব্র্যান্ডের গাড়ি আটক করা হয়। ১২ জুন বারিধারা স্বদেশ অটো লিমিটেড থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ১৫ কোটি টাকা দামের চারটি গাড়ি আটক করা হয়। ৯ জুন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়। ৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমস জেটি থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা ৬ কোটি টাকা দামের একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি আটক করা হয়। ৩১ মে রাজধানীর উত্তরা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের হার্ড জিপ ল্যান্ড রোভার গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। ২৫ মে তেজগাঁও থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রায় ৫ কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ গাড়ি আটক করা হয়। ৩ মে বনানী থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল রেসিং গাড়ি আটক করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্যের সাড়ে ৩ কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়। ২৪ এপ্রিল গুলশানের এবিকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দামের একটি পোর্শা মডেলের গাড়ি আটক করা হয়। ১৯ এপ্রিল ৪ কোটি টাকা দামের একটি লেক্সাস গাড়ি সিলেট থেকে আটক করা হয়। ১২ এপ্রিল বনানী থেকে বিএমডব্লিউ সিডান মডেলের ৩ কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি আটক করা হয়। ৯ এপ্রিল সিলেট এয়ারপোর্ট রোড থেকে ১ কোটি ৭ লাখ টাকা দামের মার্সিডিজ বেঞ্জের একটি গাড়ি আটক করা হয়। ৬ এপ্রিল সাবেক সুন্দরী মিস বাংলাদেশ পরিচয় দানকারী দেশের সেলিব্রেটি মডেল জাকিয়া মুনের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা দামের একটি অবৈধ গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। ৪ এপ্রিল তিন কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ এক্স-ফাইভ মডেলের একটি গাড়ি রাজধানীর গুলশান থেকে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। এই গাড়িটি ব্যবহার করতেন বুয়েটের শিক্ষক কাজী ফাহরিবা মোস্তফা। ১০ মার্চ ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চারটি গাড়ি অবৈধভাবে আমদানি করায় দুবাই এভিয়েশন করপোরেশনের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা।

up-arrow