Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ২০ জুন, ২০১৬ ২৩:১৫
সংযম
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সংযম সিয়াম সাধনার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। রোজা পালনের দ্বারা প্রবৃত্তির ওপর আকলের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। এর দ্বারা মানুষের পাশবিক শক্তি অবদমিত হয় এবং রুহানী শক্তি বৃদ্ধি পায়। কেননা ক্ষুধা ও পিপাসার কারণে মানুষের জৈবিক ও পাশবিক ইচ্ছা হ্রাস পায়। এতে মনুষত্ব জাগ্রত হয়। যে কোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য অবলম্বন, সহনশীলতা প্রকাশ, পারস্পরিক সম্ভ্রমবোধ ও সৌজন্য প্রদর্শন, সর্বোপরি সব কার্যকলাপে মুক্তবুদ্ধি বিবেচনাপ্রসূত মাত্রা ও মূল্যবোধের অনুসরণ ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনের অনিবার্য অবলম্বন হওয়া আবশ্যক। চলনে-বলনে চিন্তা-চেতনায় আগ্রহ আকাঙ্ক্ষায় আবেগ উৎকণ্ঠায় আনন্দ সর্বনাশে সর্বত্র একটা মধ্যপন্থা অবলম্বনের ওপর আল কোরআনে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে, যে কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ভিন্নতর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। যেমন মাত্রা অতিক্রম করলেই সাহস হঠকারিতায়, আত্মোৎসর্গ আত্মহত্যায়, প্রতিযোগিতা হিংসায় পরিণত হতে পারে। অবস্থা বিশেষে সমালোচনা পরচর্চায়, প্রশংসা চাটুবাদে, তেজ ক্রোধে, দেশপ্রেম দেশদ্রোহিতায় এবং অতি ধর্মপ্রীতি ধর্মান্ধতার স্তরে নেমে আসতে পারে। পরিমিত বোধের ব্যাপারে আল কোরআনে বহুবার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। লোকমান হাকিম তার পুত্রকে উপদেশ দিচ্ছেন, ‘অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না। কারণ আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করিও সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করিও; স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (৩১ সুরা লুকমান আয়াত : ৮-১৯)। ক্যানভাসে রং ও তুলির সুষম সমন্বয়ে শিল্পের সার্থকতা ফুটে ওঠে। পরিপার্শ্বিক সব কিছুর পরিমিত অবস্থান ও শৃঙ্খলামণ্ডিত উপস্থাপনার মধ্যেই সৌন্দর্যের যথার্থ বিকাশ। নিয়মনিষ্ঠা ও সহনশীলতা যে কোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে মেজাজ-মর্জি, আস্থা ও অবস্থান এমনকি প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও দান করে এক অনুপম মর্যাদা। ওভারটেকিং প্রবণতায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘিত হলে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় তাতে দুর্ঘটনাই ঘটে থাকে। দেহে রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা অতিক্রান্ত হলে নানান আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সংগীতে সাতটি স্বরের মধ্যে পঞ্চমটিই মিষ্ট ও সুসম; সপ্তম সুর তো চড়া সুর। রাত ও দিনের মধ্যবর্তী প্রভাত ও গোধূলি বেলা সবচাইতে পেলব প্রশান্তির মুহূর্ত। নৌকার আরোহীদের ভারসাম্য বজায় রেখে নৌকায় চড়তে হয়। সবাই একদিকে অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকলে নৌকা ডুববে কিংবা এলোপাতাড়ি ও যত্রতত্র স্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভাসমান নৌকা তো দুলতেই থাকবে এবং একে চালানো কষ্টকর হয়ে যাবে। অর্থনীতিবিদরা স্পষ্টতই মত প্রকাশ করেছেন— অর্থ সরবরাহে অসম আচরণ এবং সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ এবং মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির অন্যান্য শৃঙ্খলাকে সংক্রামিত করে বিপর্যস্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অনভিপ্রেত প্রতিযোগিতা শৃঙ্খলা ও ভারসাম্যে হানে আঘাত— পরিবেশ-প্রতিবেশ হয় কলুষিত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি তথা সামষ্টিক জীবনে সর্ব ক্ষেত্রে ও পর্যায়ে সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শনের, যুক্তিনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ মধ্যপন্থা অবলম্বনের আবশ্যকতা রয়েছে। আল কোরআনের ২৫তম সুরা ফুরকানে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে— ‘যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এতদভয়ের মাঝে, মধ্যম পন্থায়’ (আয়াত ৬৭), কিংবা ১৭তম সুরা বনি ইসরাইলে- সালাতে স্বর উচ্চ করিও না এবং অতিশয় ক্ষীণও করিও না, এ দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন কর।’ (আয়াত ১১০)।বিশ্বাসে ও ব্যবহারে, জীবনযাপন ও মানবিকতায় মাত্রা অতিক্রমকারী বনি  ইসরাইল, লুত ও ছামুদ জাতির অশুভ পরিণতির কথা কোরআনে প্রায়শই উদাহরণস্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। সংযম ও সহনশীল হওয়ার উপদেশ বারবার দেওয়ার পর- কোরআনে একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্রা অতিক্রমকারীর অশুভ পরিণতি এবং বলা হয়েছে আল্লাহতাকে ভালোবাসেন না। (৫ম সুরা মায়িদা-৮৭ আয়াত। ২য় সুরা বাকারা-১৯০ আয়াত)। কোরআনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনায় ও কার্যকলাপে মাত্রা অতিক্রমকারীদের স্বাভাবিক সুচিন্তাবোধ ও বুদ্ধি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।’ বলা হয়েছে, ‘মানুষকে যখন দুঃখ দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে বসে অথবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডেকে থাকে; অতঃপর আমি যখন তার দুঃখ দৈন্য দূরীভূত করি, সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুঃখ দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার জন্য সে আমাকে ডাকেই নাই। যারা সীমালঙ্ঘন করে তাদের কর্ম তাদের কাছে এভাবে শোভন প্রতীয়মান হয়। (১০ম সুরা ইউনুস। আয়াত ১২)।  লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।




up-arrow