Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ২২ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ২১ জুন, ২০১৬ ২৩:১৩
কারাগারে পুষ্টিহীন হাজারো বন্দী
পর্যাপ্ত খাবার নেই, শেষ নেই দুর্ভোগের
তুহিন হাওলাদার
কারাগারে পুষ্টিহীন হাজারো বন্দী

‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ কারাগারের এ স্লোগানের প্রতিফলন মেলে না খোদ কারাগারেই। এখানে বন্দীদের আলোর পথ দেখানোর যে আয়োজন তাতে বাদ সাধে নানা অব্যবস্থাপনার অন্ধকার। পুষ্টিকর খাবারের অভাবে হাজতি আসামিরা নানা রোগে ভুগছেন। এমনকি তারা পাচ্ছেন না পরিমাণ মতো খাবারও। বন্দীদের পুষ্টিকর খাবার এবং তাদের জন্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করার জন্য সম্প্রতি সুপারিশ করে এক তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলী মাসুদ সেখ।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বিনা নোটিসে এবং গোপনে সরেজমিন বিভিন্ন তারিখে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। খাবার এবং পানির বিষয়ে হাজতি আসামিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন, মামলার ধার্য তারিখে আদালতে হাজিরের জন্য ভোর ৫টার সময় কারাগার থেকে হাজতি আসামিদের বের করা হয়। তখন শুকনা চিঁড়া যার ওজন আনুমানিক ৪০-৫০ গ্রাম এবং এক টুকরা আখের গুড় যার ওজন ১০-১২ গ্রাম হাজতি আসামিদের দেওয়া হয়। এই খাবার সকালের নাস্তা নাকি দুপুরের খবার এ বিষয়ে জেল সুপার সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। যদি আমরা ধরে নিই যে, এই খাবারটি সকালের নাস্তা সে ক্ষেত্রে খাবারের পরিমাণ অত্যন্ত অপর্যাপ্ত; এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

শুকনা চিঁড়ার সঙ্গে কোনো খাবার পানি সরবরাহ না করা হলে হাজতিরা তখন যন্ত্রণায়, পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনদের এই দুর্ভোগের কথা জানান। পরে খাবার ও পানির কষ্টের কথা জানতে পেরে বাড়ি অথবা দোকান  থেকে কিনে দেন। আদালতে হাজিরা দিতে আসা কয়েদিদের প্রকৃত অর্থে দুপুর বেলায় কোনো খাবারই সরবরাহ করা হয় না। অথচ আইনসিদ্ধভাবে দুপুরের খাবার এবং পানীয় সরবরাহের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের। এই তদন্তের অংশ হিসেবে কারাগার পরিদর্শনে গেলে জানা যায়, কারা কর্তৃপক্ষ সব কয়েদিদের হিসাব মাথায় রেখে দুপুরের খাবার রান্না করে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন দাঁড়ায় যেসব কয়েদি আদালতে হাজিরা দিতে আসেন তাদের খাবার কোথায় যায়?

এ ছাড়া পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আদালত থেকে কয়েদিদের নিয়ে বিকাল ৫টা থেকে ৫টা ৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে বা গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দেয়। অথচ কারাগারগুলোতে বিকাল ৫টা থেকে ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কয়েদিদের রাতের খাবার সরবরাহ করা হয়। সে ক্ষেত্রে আদালতে হাজিরা দিতে যেসব কয়েদি আসেন তাদের রাতের খাবার কারাগার থেকে দেওয়া হয় না। কারণ তারা কারাগারে পৌঁছানোর আগেই খাবার বিতরণ শেষ হয়। সে ক্ষেত্রে কয়েদিদের আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় খাবার সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ থেকে বোঝা যায়, একটি চক্রের কর্মকাণ্ডে কয়েদিদের খাবার সরবরাহের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের মারাত্মক গাফিলতি রয়েছে।

জানা যায়, আদালত থেকে কারাগারগুলোতে আসামি পৌঁছানোর পর কয়েদি যাতে নির্যাতন থেকে রেহাই পায় এবং ঘুমানোর উপযুক্ত পরিবেশ পায় সে জন্য বাইরে থেকে টাকা সরবরাহ করা হয়। তাই কারাবিধি ৪৪ সংশোধন করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে কয়েদিদের দেখভাল করার দায়িত্ব বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে দিয়ে একটি কমিশন গঠন করা উচিত। পাশাপাশি উপযুক্ত খাবার, পানীয়, ওষুধ ও অন্যান্য পরিসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা উচিত। এর কারণ কারাগারে থাকা কয়েদিরা প্রায়ই চুলকানি জাতীয় চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, শারীরিক দুর্বলতা, মনোবিকৃতি, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি জটিলতায় ভোগেন। এসব বিষয়ে উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা এবং খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করাসহ মোট ১০টি সুপারিশমালা করে তদন্ত প্রতিবেদন দেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।

এদিকে সম্প্রতি কারামুক্ত ও আদালতে হাজির করা ডজনখানেক আসামির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে পুরনো আটার আধাপোড়া একটি রুটি ও ছোট এক টুকরা গুড় জোটে বন্দীদের ভাগ্যে। দুপুরে নিম্নমানের গন্ধযুক্ত চালের ভাত, সামান্য আলুভর্তা ও বুড়ো লাউয়ের ঝোল এবং রাতে ভাতের সঙ্গে সামান্য ডাল ও ভাজি দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাঝে-মধ্যে দেওয়া হয় মাছ-মাংসের খুবই ছোট টুকরা। রান্নায় লবণ পর্যন্ত ঠিকমতো দেওয়া হয় না।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে তিনগুণের বেশি বন্দী রয়েছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কারাওয়ার্ড বা কক্ষের মেঝে যা বন্দীদের থাকা, বিশ্রাম ও ঘুমানোর জায়গা, তাই তাদের কাছে প্যাকেজ ভিত্তিতে সাময়িকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। শোয়া ও দুই দিকে নড়াচড়ার মতো জায়গার জন্য সাপ্তাহিক প্যাকেজ তিন হাজার ৬০০ টাকা। আবার শুধু চিৎ বা কাত হয়ে শোয়ার জায়গার জন্য মাসিক প্যাকেজ ছয় হাজার টাকা। টাকা না দিলে তাদের মারধর করা হয়। এ ছাড়া কথিত ইলিশ ফাইল ও কাঁচকি ফাইলে ঢুকানো হয় বন্দীদের। কেড়ে নেওয়া হয় তাদের খাবার। এ ছাড়া গোসলের জন্য প্রতি বালতি পানি বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়।




up-arrow