Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ২৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ জুন, ২০১৬ ২২:৩১
ওয়াসিমের গুলিতেই মিতুর মৃত্যু
আদালতে জবানবন্দির পর কারাগারে, স্বীকারোক্তি দেওয়া দুজনই এসপি বাবুলের সোর্স
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম
ওয়াসিমের গুলিতেই মিতুর মৃত্যু

ভাড়াটে খুনি ওয়াসিমের গুলিতেই পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর মৃত্যু হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত গ্রেফতারকৃত আরেক আসামি আনোয়ার হোসেন ব্যাকআপ হিসেবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এদের দুজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার ইকবাল বাহার। বিকাল ৪টা থেকে ওয়াসিম এবং রাত সোয়া ৮টা থেকে আনোয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে দুজনই বলেন, টাকার বিনিময়ে তারা খুন করেন।

গতকাল দুপুরে সিএমপি কার্যালয়ে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, মিতু হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলেন ওয়াসিম ও আনোয়ার। দুজনই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা। এরমধ্যে ওয়াসিম   নিজে মিতুকে গুলি করেন। আর আনোয়ার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য। ইকবাল বাহার জানান, ‘ঘটনার মোটিভ (উদ্দেশ্য) এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তবে আটকরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র, এরা ভাড়াটে পেশাদার খুনি। এটা একটা টার্গেট কিলিং। হত্যাকাণ্ডে ৭-৮ জন অংশ নেয়। দুজন গ্রেফতার হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ দুজনকে কখন, কোথায়, কীভাবে আটক করা হয় ‘তদন্তের স্বার্থে’ তা জানানো হয়নি। এদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই জড়িতদের আটকের চেষ্টা চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেফতার সবাই এসপি বাবুলের সোর্স হিসেবে কাজ করেন। আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন এমন দুজনের বাইরেও আরও কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে রয়েছেন সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তিনজন। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সূত্র বলছে, সমন্বয়কারী ছিলেন আবু মুসা। তার সহযোগী ছিলেন নবী, ওয়াসিম এবং আনোয়ার। ছেলে নিয়ে হেঁটে জিইসি মোড়ে যাওয়ার সময়ই মোটরসাইকেলে করে আসা নবী প্রথমে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে মিতুকে। সর্বশেষ ওয়াসিম গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের জন্য মুসা দুই লাখ টাকা পেয়েছেন। পরিকল্পনার পেছনে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তার এক আত্মীয়ের অংশগ্রহণও রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের পরই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হতে থাকে।

আইন মেনেই জিজ্ঞাসাবাদ : ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, এসপি বাবুল নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। আমরা তাকে ডেকেছিলাম। তাকে আনতে পুলিশের গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার বাদী যেহেতু বাবুল আক্তার, তাই আইন মেনেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধোলাইপাড় উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অসহায় গরিব দুস্থদের মাঝে ঈদ বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় ওয়ারী বিভাগের ডিসি সৈয়দ নূরুল ইসলাম, এডিসি তারেক আহমেদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব বক্তব্য এসেছে সে বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, মিডিয়াতে যা কিছু আসে এর সব সত্য নয়, আবার সব মিথ্যাও নয়। মিতু হত্যাকাণ্ডে মামলা হয়েছে সিএমপিতে। সেখানে বেশ কজন গ্রেফতার রয়েছেন ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে তাকে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া বাবুল আক্তার যেহেতু এই মামলার বাদী, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতেই পারে।

সিএমপি কশিনারের ব্রিফিং : রবিবার সিএমপি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, তদন্তে জানতে পেরেছি এ হত্যাকাণ্ডে ৭-৮ জন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি যারা জড়িত, তাদের নাম ঠিকানা আমরা পাব। তবে এরা সবাই পেশাদার অপরাধী। মিতু হত্যাকাণ্ডটি টার্গেট কিলিং দাবি করে কমিশনার বলেন, ‘ঘটনাটি টার্গেট কিলিং এটা নিশ্চিত। জড়িতরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। কিন্তু কারা, কীভাবে, কেন এ হত্যাকাণ্ড করেছে তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। ’ সিএমপি কমিশনার বলেন, দুই আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার খুনের দায় স্বীকার করেছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কারা—এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, আমরা কেবল তাদের দুজনকে ধরতে পেরেছি। বাকি যারা জড়িত তাদের পেলে এবং তদন্ত শেষ হলে পুরোটা বলতে পারব। বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে ইকবাল বাহার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ কথাটি বলতে আমি প্রস্তুত নই, বাদীর সঙ্গে আলোচনা, মামলা নিয়ে দীর্ঘসময়, দীর্ঘক্ষণ, বিভিন্নভাবে সময় নিয়ে আলোচনা হতে পারে, হবে। বাদীকে নজরদারিতে রাখা হবে কেন? যদি এরকম কিছু থাকে, যদি তদন্তে এমন কিছু পাওয়া যায়, তাহলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। সেখানে নজরদারি করে রাখার কী আছে?

বাবুল কোনোভাবেই জড়িত নয় : মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুলের সম্পৃক্ততা রয়েছে— এমনটি মানতে নারাজ এসপি বাবুল আক্তারের শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক মোশারফ হোসেন। গতকাল তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ১০ মিনিটের কথা বলে ডিবি বাবুলকে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সময় পেরিয়ে যেতে থাকলে আতঙ্গে ভুগছিলাম। এক সময় দেখি তার মোবাইল ফোন বন্ধ। তবে ডিবি অফিস থেকে বের হয়েই সে আমাকে ফোন করেছিল। বলেছিল বাবা আমি রিলিজ হয়েছি। তবে বাবুল এ ঘটনায় জড়িত এটা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারব না।

মধ্য রাতে ডেকে আনাই মেসেজ! : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, বাবুল আক্তার একে তো পুলিশের এসপি, এর বাইরে তিনি চাঞ্চল্যকর মামলার বাদী। এমন মাপের একজন কর্মকর্তাকে মধ্য রাতে বাসা থেকে ডেকে আনার মধ্যে বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করে। নইলে দিনের বেলাতেও তাকে ডাকা যেত। প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন নগরীর জিইসির মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। পরে এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেন। ঘটনাটি চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় ফেলে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব, সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিআই)। তবে মামলার মূল তদন্তে আছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow