Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৫৫
সেই দুঃস্বপ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
সেই দুঃস্বপ্ন

গুলশানের জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসানের পর প্রিয় স্বজনকে না পেয়ে ভাইয়ের ভয়ার্ত কণ্ঠে আহাজারি— আমার ভাইটা কই? ও কি বাইচ্যা আছে? আপনারা কেউ বলতে পারেন সে কই? আর স্বামীর মৃত্যু খবর শুনে গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলামের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী এখন পাগলপারা। একজন জিম্মি বাইরে অবস্থান নেওয়া স্বজনকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে জানান— আমি ও ভাগনে ভালো আছি। ওরা (সন্ত্রাসী) টয়লেটের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। আটকে পড়া এক তরুণ বাবাকে ফোন করে ‘নিরাপদে’ থাকার কথা জানিয়েছেন। আরেকজন জিম্মি স্বজনকে ফোনে বলেন— আমরা এখন পর্যন্ত নিরাপদে আছি। অভিযান চলছে। গুলি হচ্ছে। পরে কী হবে জানি না। এভাবেই রাজধানীর কূটনৈতিকপাড়ায় জনপ্রিয় স্পেনীয় রেস্তোরাঁ হলি আর্টিসান বেকারিতে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলায় আটকে পড়া জিম্মি ও তাদের স্বজনদের দুঃস্বপ্নের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। গতকাল সকালে জিম্মি সংকট নিরসনে অপারেশন থান্ডারবোল্ট নামের কমান্ডো অভিযানে মুক্ত গুলশানের ক্যাফে থেকে উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের ‘দুঃস্বপ্ন’ কাটছে না। এই কমান্ডো অভিযানে মুক্ত হন অনেকে। তাদের একজন প্রকৌশলী হাসনাত করিম। তিনি তার ১৩ বছর বয়সী সন্তানের জন্মদিন উদযাপন করতে এই ক্যাফেতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আরও ছিলেন স্ত্রী শারমিন পারভীন এবং আট বছর বয়সী অন্য সন্তান। রাতভর আটক থাকার পর গতকাল সকাল ৮টার দিকে কমান্ডো অভিযানে হাসনাতের পরিবার উদ্ধার হয় বলে জানিয়েছেন তার মা। সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতনিদের জন্য স্বামী এম আর করিমকে সঙ্গে নিয়ে সারা রাত গুলশানে ছিলেন তিনি। ছেলেকে পাওয়ার পর হাসনাতের মা বলেন, জিম্মিকারীরা বাংলাদেশি মুসলমানদের সূরা পড়তে বলে। সূরা পড়ার পর তাদের রাতে খেতেও দেওয়া হয়। গতকাল সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টের ভিতর থেকে শাহরিয়ার আহমেদ শেরু (২৪) নামের একজন ফোনে বাইরে অপেক্ষমাণ তার চাচাকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিরাপদে আছি। অভিযান চলছে। গুলি হচ্ছে। পরে কী হবে জানি না। হায়াত থাকলে বেঁচে থাকব। বেঁচে থাকলে দেখা হবে। শেরু দুই বছর ধরে ওই রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন বলে জানান তার চাচা ইব্রাহিম আহমেদ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ৭টা ৪৪ মিনিটে শেরুর সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। এরপর তার ফোনে অনেকবার চেষ্টা করা হলেও আর কেউ ফোন ধরছে না।

গুলশান নর্দ্দা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কবিরের ভাই সাইফুলও জিম্মি। জিম্মি ঘটনাস্থল গুলশান-২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কের অদূরে কবির মাটিতে পড়ে গড়িয়ে কান্নাকাটি করে বলছিলেন, ‘আমার ভাই সাইফুলের কোনো খবর পাইতাছি না, রাইত ১২টার পর থাইক্যা তার মোবাইল বন্ধ। আপনারা কেউ বলতে পারেন সে কই? এর আগে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলছিল, ভাই, আমাগোরে রিভলভারের মুখে আটকাইয়া রাখছে, দোয়া কইরো। ’ কবির জানান, তার ভাই সাইফুল স্প্যানিস ‘ও কিচেন রেস্টুরেন্ট’-এ কিচেন বয়ের কাজ করত। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। সাইফুল ভয়ার্ত কণ্ঠে জানায়, অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত ১০-১৫ জন যুবক পুরো রেস্টুরেন্টের দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে রেখেছে। রেস্টুরেন্টের ভিতরে গুলিও চালিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভিতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বাধা দিলে আবারও কান্না জুড়ে দেন তিনি। বলতে থাকেন, ‘আমার ভাইটা কই? ও কি বাইচ্যা আছে?’

সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হওয়ার প্রায় ১১ ঘণ্টা পর সেখানে আটকে পড়া তরুণ তাহমিদ খান ফোন করে ‘নিরাপদে’ থাকার কথা তার বাবা আফতাব গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার খানের কাছে জানিয়ে ছিলেন। শুক্রবার জিম্মি সংকট শুরুর পর আটকে পড়া ছেলের অপেক্ষায় রাতভর গুলশান এলাকায় অপেক্ষায় থাকা শাহরিয়ার খানের কাছে গতকাল সকাল পৌনে ৮টার দিকে ছেলে তাহমিদ খানের একটি ফোন আসে। শাহরিয়ার খান বলেন, ‘সে ফোনে জানায়, বাবা আমরা ভালো আছি। এর পর কল কেটে যায়। ’ এর আগে রাতভর উদ্বেগে থাকা এই ব্যবসায়ী বারবার ফোন করেও ছেলেকে পাচ্ছিলেন না, পুলিশের কাছ থেকেও কোনো তথ্য পাচ্ছিলেন না। সকালে ছেলের কাছ থেকে ফোন পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে ঘটনাস্থলেই পড়ে যান শাহরিয়ার খান।

জিম্মি সংকট অবসানে ঘটনার প্রথম দিকে সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত হন। মাসখানেক আগে গোয়েন্দা পুলিশে বদলি হয়ে আসা রবিউলের সাত বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। স্বামীর নিহত হওয়ার খবর শুনে রবিউলের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী এখন পাগলপারা। কূটনৈতিকপাড়ায় বিদেশি ক্যাফেতে হামলা চালিয়ে অনেককে জিম্মি করার খবর শুনে রবিউল ও বনানী থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। দুজনই হামলায় নিহত হন। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের ভাই শামসুজ্জামান শামস অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘এটা ফেয়ার হলো না, ভাইয়া। ফেয়ার হলো না। ঈদের আগে আমি আমার মায়ের জন্য ভাইয়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছি। শামস জানালেন, তারা দুই ভাই। রবিউল বড়। বাবা উন্নয়নকর্মী ছিলেন। নয় বছর আগে তাদের বাবা মারা গেছেন। বাবার দেখানো স্বপ্ন পূরণ করতে রবিউল মানিকগঞ্জের কাটিগ্রামে ব্লুমস নামে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। ২৪ রোজায় তাদের নতুন কাপড় দিতে গিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ইফতার করে ঢাকায় ফেরেন। আজ (গতকাল) আবার যাওয়ার কথা ছিল। আজ (গতকাল) যাচ্ছেন, তবে জীবিত নয়; লাশ হয়ে। রবিউলের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা জানিয়ে শামস বলেন, ভাবী ঢাকায় ভাইয়ের সঙ্গেই ছিলেন। সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে আসায় শ্বশুরবাড়ি চলে যান। তাকে মৃত্যুসংবাদ দিতে না চাইলেও তিনি জেনে যান। অঝোরে কাঁদতে থাকা শামস জানেন না মা করিমুন্নেসা, ভাবী উম্মে সালমা আর ভাইপো মো. সামিরকে কী বলে সান্ত্বনা দেবেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : কমান্ডো অভিযানে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা জানান, অভিযানের শেষ পর্যায়ে রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় মেঝেতে লাশ আর লাশ। প্রতিটি লাশের শুধু গলা কাটা নয়, অনেকের বুকে-পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। মেঝে ভেসে যাচ্ছে রক্তে। ছোট ছোট বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে মহিলারা কাঁদতে ছিল। টেবিলের মধ্যে গ্লাস প্লেট ভাঙা ছিল। জঙ্গিদের চরম নৃশংসতা দেখে মনে হয়েছে তারা মানুষ হত্যা করতেই সেখানে ঢুকেছিল। যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর।

up-arrow