Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ৪ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ জুলাই, ২০১৬ ০০:১৪
সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া
আসুন, দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ি
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, কে ক্ষমতায় থাকবে, কে ক্ষমতায় যাবে, সেটা বড় কথা নয়। এই দেশ ও জাতির বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ আজ বিপন্ন। তিনি বলেন, আমাদের কিছুই থাকবে না, কোনো অর্জনই টিকবে না, যদি আমরা সন্ত্রাস দমন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি। তাই কালবিলম্ব না করে আসুন আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি। বিএনপিপ্রধান বলেন, ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে সন্ত্রাস আজ বিশ্বের দেশে দেশে রক্ত ঝরাচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও আজ সন্ত্রাসের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত। এটা আমাদের জন্য নতুন এক ভয়াবহ জাতীয় সংকট। গতকাল বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের বাইরে তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। তবে বক্তব্য শেষে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান খালেদা জিয়া। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ (অব.), ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, তাইফুল ইসলাম টিপু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, শুধু গত শুক্রবার রাতের ঘটনাই নয়, সারা বাংলাদেশ আজ সন্ত্রাসের থাবায় ক্ষত-বিক্ষত। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, ধর্মগুরু ও খ্রিস্টান যাজক, ভিন্ন মতের লেখক প্রকাশক-ব্লগার, খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আমাদের সযত্নে লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। কোথাও কেউ নিরাপদ নয়। এই আতঙ্ক, এই হত্যালীলা থামাতে হবে। বন্ধ করতে হবে রক্তপাত। আমাদের একতাবদ্ধ হতেই হবে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনের এক মহাসংকটের সময় এখন। শুক্রবার রাতে রাজধানী ঢাকায় এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। কূটনৈতিক এলাকার কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, গ্রেনেড ও বোমা নিয়ে সন্ত্রাসী দল ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়। তারা গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের একটি স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে সেখানে অবস্থিত দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালাতে গেলে সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমায় দুজন পুলিশ অফিসার নিহত ও অনেকে আহত হন। রাতেই সন্ত্রাসীরা তাদের হাতে জিম্মি দেশি-বিদেশি ২০ জন নিরপরাধ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই পৈশাচিক সন্ত্রাসী হামলা এবং নারীসহ দেশি-বিদেশি নির্দোষ নাগরিকদের এভাবে হত্যার ঘটনার নিন্দা করার কোনো ভাষা নেই। আমরা গভীর বেদনাহত এবং ক্ষুব্ধ। কোনো অজুহাতেই শান্তিপ্রিয় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সুস্থতার লক্ষণ নয়। এই বিকারগ্রস্ততার প্রতি আমরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছি। খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশ ও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমরাও শঙ্কিত। কারণ এই ঘটনায় আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ত্রুটি এবং সন্ত্রাসীদের সামর্থ্য প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। আমরা এর আগে সন্ত্রাসীদের চোরাগোপ্তা হামলার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। কিন্তু এখন তা আর চোরাগোপ্তা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ আমাদের এই শান্তিপ্রিয় মানুষের দেশে ভয়াবহ সন্ত্রাসের দানব গোপনে বেড়ে উঠেছে। তারা এখন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে প্রকাশ্যেই ভয়ঙ্কর ছোবল হানছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, শুক্রবার রাতের রক্তক্ষয়ী ঘটনার অবসান ঘটেছে শনিবার সকালে আমাদের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে। এতে সন্ত্রাসীদের হত্যা, সন্দেহভাজন হিসেবে আটক এবং জিম্মি দশা থেকে ১৩ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমরা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছি। জাতীয় জীবনের এমন সংকটে তাদের সামর্থ্য ও অনিবার্য প্রয়োজন আরেকবার প্রমাণ করার জন্য সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এই অভিযানে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থা, অগ্নিনির্বাপক দল এবং গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের সংশ্লিষ্ট সদস্য এবং ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান তিনি। উদ্ধার অভিযানে পুলিশ বাহিনীর যে দুই কর্মকর্তা জীবন দিয়েছেন, তাদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করে শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে আহত ও চিকিৎসাধীনদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। বেগম জিয়া বলেন, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশি নাগরিক যে তিনজন সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে হত্যা করেছে, তাদেরও রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। এ ছাড়া ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন এবং ভারতীয় একজন নাগরিক সন্ত্রাসীদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে অসহায় মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এই বিদেশি নাগরিকরা পোশাক শিল্পের ক্রেতা হিসেবে এবং ব্যবসা, চাকরি ও পর্যটনের উদ্দেশে বাংলাদেশে আসেন। নিহত এসব বিদেশি নাগরিকের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেন তিনি। খালেদা জিয়া বলেন, শান্তির ধর্ম পবিত্র ইসলাম নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা এবং সন্ত্রাসের ঘোর বিরোধী। তাই সংযম সাধনার মহিমান্বিত মাস রমজানে এই রক্তপাত প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে স্তম্ভিত করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, শুক্রবার রাতের ঘটনায় শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়, সারা বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতা, আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবস্যা-বাণিজ্য, জীবন-যাপন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সবার মিলিত প্রয়াসে আমাদের এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। দেশের এই বিপদের দিনে সহানুভূতি ও সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে যেসব বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আশা করি আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে তারা সন্ত্রাস মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন। তবে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রথম কর্তব্য হচ্ছে— সে দেশের সরকার ও জনগণের। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সন্ত্রাস মোকাবিলা করা যাবে না। এই সংকটের শেকড় আরও অনেক গভীরে। সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। এই বিষয়টির দিকে আমি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্রহীন দেশে, স্বৈরাচারী শাসন, অসহিষ্ণু রাজনীতি, দমন-পীড়নের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অধিকারহীন সমাজ, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য-বঞ্চনা এবং সুশিক্ষার অভাব ক্রমাগত চলতে থাকলে সেখানে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই কারণগুলো দূর না করলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না। জনগণের অংশ গ্রহণ ছাড়া এ ধরনের জাতীয় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আর কেবল গণতান্ত্রিক পরিবেশই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতে পারে।

up-arrow