Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৪ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩১
আরও হামলার আশঙ্কা আছে : প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
আরও হামলার আশঙ্কা আছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আরও জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা ব্যক্ত করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এরা এখানেই থেমে থাকবে না। এদের নানা ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছি। হয়তো দেখা যাবে, একই সঙ্গে সাত-আটটি জেলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কিংবা বিভিন্ন মানুষের ওপর তারা আক্রমণ চালাতে পারে। তাই সবাইকে আরও সজাগ ও সতর্ক থেকে সম্মিলিতভাবে এদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

গতকাল বিকালে গণভবন থেকে দেশের চারটি বিভাগের ৩১টি জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণের সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, যেসব যুদ্ধাপরাধীর আমরা বিচার করছি তাদের পরিবার-পরিজনরা আছে। এরা কিন্তু থেমে নেই। তারাও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এমনকি তারা কেউ দেশে কেউ বিদেশে রয়েছে। তাদের অর্থ-সম্পদের কোনো অভাব নেই। যেমন তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, তেমনি জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেরও মদদ দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেরও আর্থিক সহায়তা, প্ররোচনা, পরিকল্পনা রয়েছে। হয়তো একই সঙ্গে সাত-আটটি জেলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তারা আক্রমণ চালাতে পারে। সেখানে জনপ্রতিনিধি থাকতে পারেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা থাকতে পারে, এমনকি পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি। বিভিন্ন জায়গা এবং মন্ত্রী-সাংবাদিক বা বিদেশি নাগরিকের ওপর আক্রমণ চালানোর একটা পরিকল্পনা তাদের থাকতে পারে। তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি দেশবাসীকে আরও সচেতন করতে চাই এবং এ ব্যাপারে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আশা করি এই জনসচেতনতা সৃষ্টি করে জনগণের শক্তি নিয়ে জঙ্গি-সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে সক্ষম হব। সম্মিলিতভাবেই দেশবিরোধী এই শত্রুদের মোকাবিলা করতে হবে।

সন্ত্রাস-নাশকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না। বাংলাদেশের মাটিতে কিছুতেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান হতে দেব না। ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন কাজ কখনই আমরা বরদাস্ত করব না। তাই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করতে হবে। জনগণের শক্তি নিয়ে আমরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করে দেশকে প্রগতি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাব। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলবই ইনশা আল্লাহ। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথমে সিলেট ও চট্টগ্রামের ১৫টি এবং পরে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬টি জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেন প্রধানমন্ত্রী। গত দুই দিনে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের ৬৪টি জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূলে বেশ কিছু নির্দেশনাও দেন। ভিডিও কনফারেন্সে এই চার বিভাগের বিভিন্ন জেলার ইসলামিক চিন্তাবিদ, ইমাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ ও বিজিবি কর্মকর্তা, এনজিও কর্মকর্তা, নারী নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা জঙ্গি-সন্ত্রাস নির্মূলে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রীকে। সিলেট হযরত শাহজালাল দরগা শরিফের ইমাম বলেন, ইসলামের নামে যারা মানুষ হত্যা করছে এরা ইসলামের দুশমন। এরা কখনই মুসলমান হতে পারে না। এদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ ও ধ্বংস করতে পারলে দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্যই মঙ্গল হবে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঞ্চালনায় ভিডিও কনফারেন্সের সময় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ড. তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, শোলাকিয়া ঈদগাহের পেশ ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দিন মাসঊদ প্রমুখ। সূচনা ও সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, ২০১৫ সালের তিনটি মাস যেভাবে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা মিলে সারা দেশে অগ্নিসন্ত্রাস ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যার মতো জঘন্য কার্যক্রম করতে পেরেছিল, তারা কিন্তু থেমে থাকবে না। তারা জঙ্গি সম্পৃক্ত হয়েই কাজ করবে। কাজেই এ ব্যাপারে আরও সচেতন থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর জন্য বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও নিজ নিজ এলাকায় সচেতন থাকতে হবে। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সেই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আমি বলব তথ্য সংগ্রহ করতে। নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করা এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশে সব সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা কিছুতেই বাংলাদেশকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের স্থান হতে দেব না। তিনি বলেন, যখন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে, উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে, ঠিক সে সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করা, উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা, দেশকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটা চেষ্টা হচ্ছে। যখন বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। ঠিক তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের বিশ্বের কাছে হেয় করা হচ্ছে। তাই আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন করতে হবে। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করতে হবে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী গুলশানের হামলার ঘটনার তথ্য তুলে ধরে বলেন, হামলাকারীরা দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছে। এরা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। কেন এমনটি ঘটছে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন-ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, অভিভাবক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে জঙ্গি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। দেশে এখন খাবারের জন্য কোনো হাহাকার নেই। দেশের মানুষের যখন কল্যাণ হচ্ছে, যখন মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের বাঙালি জাতিকে বিশ্বের সামনে হেয় করছে তারা। তারা পবিত্র ধর্ম ইসলামকেও হেয় করছে। তিনি বলেন, দেশের সব বিভাগের কর্মকর্তাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। তাদের সবাইকে বলেছি আমরা জঙ্গিবাদবিরোধী কমিটি নিয়ে সবাই একযোগে কাজ করব। কীভাবে জঙ্গি-সন্ত্রাসী কাজ করে তা খুঁজে বের করব। অভিভাবকদের বলব— নিজেদের সন্তানদের খোঁজখবর নেবেন, তারা কীভাবে চলে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে, কোথায় যায়— সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেবেন। জঙ্গিবাদবিরোধী কমিটির সঙ্গে মিলে খোঁজ নেবেন সব দিকে। এলাকায় নতুন কেউ এলে, কারও চলাফেরা সন্দেহজনক হলে সে কোথা থেকে এসেছে তা জানতে হবে। অবাঞ্ছিত কাউকে দেখলে তার পরিচয় বের করবেন। অভিভাবকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কেউ যদি দীর্ঘদিন থেকে নিখোঁজ থাকে তবে আমাদের কাছে পরিচয় দিন। নিখোঁজ ছেলেমেয়েরা কোথায় আছে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খোঁজ করবে। কেউ যদি ভুল পথে চলে গিয়ে থাকে তাদের সংশোধন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা আমরা করব।

প্রধানমন্ত্রী মঙ্গোলিয়া যাচ্ছেন আজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ১১তম এশিয়া-ইউরোপ বৈঠক (আসেম) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মঙ্গোলিয়ায় যাচ্ছেন। সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভিভিআইপি ফ্লাইটে তিনি উলানবাটরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। আগামী ১৫ ও ১৬ জুলাই উলানবাটরে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

আগামীকাল সকালে শীর্ষ সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বৃহত্তর যোগাযোগে আসেম অংশীদারিত্বের বিকাশ’ শীর্ষক ভাষণ দেবেন। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow