Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ জুলাই, ২০১৬ ২৩:০১
চোখ নেপথ্য নায়কদের দিকে
কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী, জাপানের অধ্যাপক সাইফুল্লাহকে ঘিরে তদন্ত নর্থ সাউথের ছাত্র জুন্নুনের অ্যাকাউন্ট গোয়েন্দা কব্জায়, নিখোঁজদের খোঁজে তত্পরতা
সাখাওয়াত কাওসার
চোখ নেপথ্য নায়কদের দিকে

জঙ্গি কর্মকাণ্ডে নেপথ্য নায়কদের খুঁজছেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অতীতে জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত অভিযোগে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন এমন ব্যক্তিদেরও রাখা হয়েছে বিশেষ তালিকায়।

গোয়েন্দাদের ধারণা, জামিনে মুক্ত হয়ে কিংবা পলাতক থেকেই তাদের অনেকে রাষ্ট্রবিরোধী তত্পরতায় নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। তবে এরই মধ্যে বিদেশে অবস্থান করেও অনেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে তাদের তত্পরতা অব্যাহত রেখেছেন বলে তথ্য এসেছে গোয়েন্দাদের কাছে। দেশে কাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছেন এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে আদাজল খেয়ে মাঠে রয়েছেন গোয়েন্দারা।   এলিট ফোর্স র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নেপথ্য মদদদাতাদের নিশ্চিহ্ন না করতে পারলে জঙ্গিবাদের শেকড় উৎপাটন করা সম্ভব নয়। যে কোনো মূল্যে তাদের শেকড় উৎপাটন করতে র‌্যাবের প্রতিটি সদস্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জঙ্গিবাদ দমনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে।

সূত্র বলছে, পলাতক জঙ্গিদের বাইরেও দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা। তাদের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড, এমনকি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং ব্যাংক হিসাবের দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। শুধু তাদের দিকেই নয়, তাদের ঘনিষ্ঠজনদের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।

অন্য একটি সূত্র বলছে, রাজধানীর গ্রিন রোড থেকে জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে বছর তিনেক আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়েছিলেন তেহিজব করিম। সর্বশেষ ২৬২ জনের নিখোঁজের তালিকায় তেহিজব করিমের নাম রয়েছে। ২০১০ সালের শুরুতে তেহিজব  করিম, মাঈনুদ্দিন শরিফ ও তার ভাই রেজোয়ান শরিফ ইয়েমেনে আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ছয়-সাত মাস জেল খেটে পরে দেশে ফিরেছিলেন তারা। রিসার্চ সেন্টার ফর ইউনিটি ডেভেলপমেন্ট (আরসিইউডি) নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তেহিজব। প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় ছিল ধানমন্ডিতে। এটি দেশি-বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ করত এমন অভিযোগ ছিল গোয়েন্দাদের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে আরসিইউডির কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রশিদ চৌধুরী ছিলেন তেহিজবের শ্বশুর। তেহিজবের ভাই রাজীব করিম ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে বোমা হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে লন্ডনে গ্রেফতার হন। দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি এখন যুক্তরাজ্যের কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। গ্রেফতারের পর যুক্তরাজ্যের পুলিশকে রাজীব বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশে থাকার সময় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূত্র আরও জানায়, আরসিইউডির মূল উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন রেজাউল রাজ্জাক। রাজ্জাক যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তবে জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগ আসার পর তাকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে তিনি গোপনে মালয়েশিয়া চলে যান। সেখান থেকেই তিনি জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছেন এমন তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। রেজাউল রাজ্জাক নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়াতুল মুসলেমিনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে জামায়াতুল মুসলেমিনের যাত্রা শুরু। পরে সংগঠনটি একাধিক ভাগ হয়ে একাংশ রাজধানীকে কেন্দ্র ধরে সক্রিয় হয়। এর সদস্যদের বেশির ভাগই আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের ভাবধারায় বিশ্বাসী। অনেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তদন্ত সূত্র বলছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশের গোয়েন্দারা এখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীর দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিচ্ছেন। তাদের ধারণা, তামিম বাংলাদেশে জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের যোগসূত্র হিসেবে কাছ করছেন। কিছুদিন আগে ইসলামিক স্টেটের ইংরেজি ভাষার প্রকাশনা ‘দাবিক’-এ তামিমকে আইএসের বাংলাদেশ শাখার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তামিম ভারতে রক্তাক্ত হামলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এর পর থেকেই আলোচনায় তামিম। জানা গেছে, কানাডার উইন্ডসরে বসবাসরত তামিম আহমেদ চৌধুরী ২০১৩ সালে দেশটি ছেড়ে চলে যান। গোয়েন্দাদের ধারণা, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কিংবা পার্শ্ববর্তী ভারতে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বাংলাদেশে আইএসের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের লিয়াজোঁ রক্ষাকারী বিবেচনায় গোয়েন্দারা যে তিনজনকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন তাদের মধ্যে তামিম আহমেদ চৌধুরী রয়েছেন। বাকি দুজন হলেন জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসনের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবু তারেক মোহাম্মদ তাজউদ্দীন কাওসার। পুলিশ ১০ জন হাইপ্রোফাইল জঙ্গির যে তালিকা করেছে, তার মধ্যে এই তিনজনও রয়েছেন। ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলছে, সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে দুই থেকে তিন ডজন জঙ্গি বাংলাদেশে ফিরে গেছে। অন্যরা প্রশিক্ষণ নিয়েছে তুরস্কে। তৃতীয় একটি গ্রুপ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, জঙ্গি তত্পরতা ঠেকানোর লক্ষ্যে যা যা করার তা-ই করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে।  

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নিখোঁজ জঙ্গি জুন্নুন শিকদারের ব্যাংক হিসাবে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাকিস্তান ও ইয়েমেন-ফেরত জঙ্গিদের সঙ্গে এ টাকা বিনিময় হয়েছে এমন তথ্যও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) এই সদস্যের বিষয়ে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেফতার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাঈম দীপ, এহসান রেজা রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম ইরাদ, নাফিজ ইমতিয়াজ ও সাদমান ইয়াছির মাহমুদের কাছ থেকে তথ্য পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এবিটির তৎকালীন প্রধান কারাবন্দি মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর হাত ধরেই তিনি এ পথে আসেন। বেসরকারি ওই ব্যাংক হিসাবের (১০১১০১১৪০৩৯১) জন্য দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, তার জন্ম ১৯৮৭ সালের পয়লা জুন। জুন্নুনের পাসপোর্ট নম্বর-বি ই ০৯৪৯১৭২। তরুণদের দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে উগ্রপন্থি দলে টানাই তার প্রধান কাজ। পরিবারের পক্ষ থেকে র‌্যাব ও পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে জানানো হয়েছে জুন্নুন নিখোঁজ। তবে তিনি যে জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এ তথ্য দেওয়া হয়নি। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া তথ্যে জুন্নুন নিজেকে একজন ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিলেও কী ধরনের ব্যবসা ছিল তার সে বিষয়ে তথ্য দেননি। ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর হাজারীবাগের মনেশ্বর রোডের। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ২৬৯১৬৪৮০৮৫৫০৫। ২০১৩ সালের দিকে জুন্নুন শিকদার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে তিনি দাওয়াতি কার্যক্রম প্রচারের উদ্দেশ্যে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তি হন। তখন জেএমবির রেজওয়ান শরিফ এবিটির প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এরা একসঙ্গে কাজ করেন। আর জুন্নুনের দলের নাঈম এবিটির কম্পিউটার-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল দিক দেখতেন। মুফতি জসিম উদ্দিনের বক্তব্য ও ছবি আপলোডসহ দেশ-বিদেশে তথ্য আদান-প্রদানে জড়িত ছিলেন সাইফুল, জাহিদ ও আলী আজাদ। চক্রের জঙ্গিদের অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন জুন্নুন। গোয়েন্দারা তার ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি পুরো নেটওয়ার্ক কবজায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow