Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ জুলাই, ২০১৬ ২৩:০৫
ইয়াবা ভয়ঙ্কর
অভিযানে উদ্ধার হয়, বন্ধ হয় না কারখানা তদন্তে জঙ্গিদের ইয়াবা সম্পৃক্ততা
মির্জা মেহেদী তমাল
ইয়াবা ভয়ঙ্কর

মহামারী রূপ নিয়েছে ‘ক্রেজি ড্রাগ’ ইয়াবা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচে কানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব এই ঘাতক ইয়াবা ট্যাবলেটের।

ইয়াবায় সম্পৃক্ততা মিলছে জঙ্গিদেরও। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত। তবে এদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। ইয়াবার ভয়াবহ ধোঁয়া আগামী প্রজন্মকে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অবস্থায় আগামীতে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবকমহলও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, এমপি, রাজনৈতিক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে। যে কারণে কোনোভাবেই এর আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংস করে মাদক ব্যবসার এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইয়াবাসেবীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর এই ইয়াবা প্রতিদিনই আসছে অবৈধ পথে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে। দেশের একপ্রান্ত টেকনাফের স্থল ও সাগরপথের ১১ পয়েন্ট দিয়ে দিনে-রাতে ঢুকছে ইয়াবার চালান। আর এই ইয়াবা বিভিন্ন উপায়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আরেক মাথা তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। রাজধানীসহ সারা দেশের গ্রামগঞ্জে এখন ইয়াবার ব্যবসা জমজমাট। ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় লাখো পরিবারের সন্তানদের জীবন এখন বিপন্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইয়াবার প্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতীতের চেয়ে এখন বেশি তত্পর। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিগত সাত বছরে ৯৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও শুধু গত বছরই উদ্ধার হয়েছে দুই কোটি পিস এরও বেশি। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, কোস্টগার্ড দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করে এই ইয়াবার চালান। এর পরেও ঠেকানো যাচ্ছে না ভয়ঙ্কর এই মাদকের অনুপ্রবেশ।

সূত্র মতে, লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এই ইয়াবা ব্যবসা। মিয়ানমারের ৬০ টাকার এই ট্যাবলেট পাচার হয়ে এসে রাজধানী ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪০০ টাকা। আর এ কারণে পেশা পরিবর্তন করে মাদক ব্যবসায় ঝুঁকছে অনেকে। এ সুযোগে সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন টেকনাফে চাকরি করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন একজন কর্মকর্তা জানান, টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকার মাদক পাচারের পয়েন্টগুলোতে সর্বোচ্চ নজরদারি থাকলেও নানা কৌশলে ইয়াবার চালান আসছেই। মাছ ধরার ট্রলারে, জালে বেঁধে সাগরে ভাসতে ভাসতে ইয়াবার চালান আসছে দেশের ভিতর। হালে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের সর্বত্র মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়েছে নীরব এই ঘাতক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে এই মাদকের চাহিদা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দিনে চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ পিসে। এই বিপুল সংখ্যক ইয়াবা প্রতিদিনই বিভিন্ন কৌশলে দেশে ঢুকছে। সেবনকারীরা প্রতি পিস ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে ইয়াবা কিনছেন। সেই হিসাবে প্রতিদিন এই মাদকের পেছনে খরচ করছে তারা পৌনে দুইশ কোটি টাকা। জানা যায়, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে ২০১৪ সালে ১২ শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ীর একটি তালিকা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শীর্ষ ৪০ জনের একটি তালিকা ধরে অভিযান চালায়। কিন্তু বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ভেস্তে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা ৭৬৪ ইয়াবা ব্যবসায়ীর পৃথক আরেকটি গোপন তালিকার শুরুতেও ওইসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে। কিন্তু তারা সবসময় থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৪ সালের মার্চে টেকনাফে ইয়াবা গডফাদার নিধনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর ইয়াবা চোরাচালান অনেকটা কমে যায়। ইয়াবা গডফাদাররা দেশে-বিদেশে পালিয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কয়েকজন মারাও যান। কিন্তু গতবছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঢিলেঢালা হওয়ায় গডফাদাররা আবার এলাকায় ফিরে আসে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড় দিয়ে প্রায়ই কাভার্ড ভ্যানে, প্রাইভেট কারে, কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে, জুতার মধ্যে, শরীরের বিভিন্ন অংশে বেঁধে ইয়াবা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। নতুন পদ্ধতি হিসেবে কলার মধ্যে পলিথিন দিয়ে ঢুকিয়ে সেই কলা গিলে খেয়ে পেটের মধ্যে করেও পাচার হচ্ছে ইয়াবা। এই পদ্ধতি সাধারণত মহিলা ব্যবসায়ীরাই করে থাকেন।

অরক্ষিত ১১ পয়েন্ট : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এক কর্মকর্তা বলেন, সড়কপথে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাচারকারীরা নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। নৌপথে বিভিন্ন মাছ ধরার ট্রলারে করে মাঝি-মাল্লাদের সহায়তায় এসব ইয়াবা পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বেশি টাকার লোভে অনেক মাঝি-মাল্লা মাছ ধরা ছেড়ে ইয়াবার হাতবদলে সহায়তা করছে বলেও তিনি জানান। এই মাঝিরা এখন তাদের আসল পেশা ছেড়ে মাদক ব্যবসায় নেমেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের ১৫টি স্থানে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে। যেখান থেকে সাগর ও সড়কপথে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, সাবরাং, মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, জলিলেরদিয়া, লেদা, আলীখালী, হৃলাসহ অন্তত ১১টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এসব ইয়াবা তৈরি ও পাচারে আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী যেমন জড়িত রয়েছে তেমনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের গডফাদারও রয়েছে। যারা সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব কিংবা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবা পাচার করে আসছে। এর মাঝেও হাল ছাড়েনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow