Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৫০
জঙ্গিতে ধামাচাপা ইস্যু
এসপি পত্নী মিতু হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যা, রিজার্ভ চুরি, আসলাম চৌধুরীর মোসাদ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল, বিএনপির কমিটি
সব কিছু ছাপিয়ে সবার আলোচনা এখন জঙ্গি হামলা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে
জুলকার নাইন ও জিন্নাতুন নূর
জঙ্গিতে ধামাচাপা ইস্যু

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় চাপা পড়ে গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আলোচনার বাইরে চলে গেছে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন তোলা এসব ইস্যু। সব কিছু ছাপিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আলোচনা সবই এখন জঙ্গি হামলা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে। আলোচনার বাইরে চলে গেছে ঢাবি প্রসপেক্টাসে ইতিহাস বিকৃতি, চট্টগ্রামে এসপি বাবুলের স্ত্রী মিতু হত্যাকাণ্ড, কুমিল্লার তনু হত্যাকাণ্ড, সুন্দরবন ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যা পাওয়া রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন চুক্তি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর ইসরায়েলি মোসাদ কানেকশন, নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তিকে কানে ধরার শাস্তি প্রদান এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নিম্নমান। আর আলোচনায় নেই বাজেটে নতুন করারোপে ব্যবসায়ীদের প্রায় সব পক্ষের তীব্র আপত্তি, গুরুত্ব পাচ্ছে না বায়োমেট্রিকের নানান অসঙ্গতি। রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় থাকা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ও বিএনপির নতুন কমিটির খবর এখন আর গণমাধ্যম ও চায়ের টেবিলে স্থান পাচ্ছে না। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, গুলশানের হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা হওয়ায় এ ইস্যু সব বিষয়কে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু আড়ালে চলে যাওয়া অন্য ইস্যুগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আইনের শাসনের জন্য সব ইস্যুর সুষ্ঠু সমাধান প্রয়োজন। কারণ ইস্যুগুলোর সমাধান না হলে বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধরা যে কোনোভাবেই আইন হাতে তুলে নেওয়ায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে বলে অভিমত মনোবিজ্ঞানীদের।

জানা যায়, গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি এবং ও’কিচেনে রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের ঠেকাতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর সশস্ত্র বাহিনী অভিযান চালিয়ে ওই ক্যাফের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরদিন নিহত জঙ্গিদের পরিচয় নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। পরে ঈদের দিন হামলা হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের অদূরে। সেখানেও নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্রদের হামলায় অংশ নিতে দেখা যায়। এরপর বিভিন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিকাণ্ডে অংশগ্রহণ হয় মূল আলোচনার বিষয়। তারপর থেকেই চলছে জঙ্গি হামলার বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত নিয়ে আলোচনা। তদন্তে উঠে আসা বিষয়গুলো নিয়েই চলছে তোলপাড়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্ক, ঢাকায় বিদেশিদের নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর জঙ্গি কর্মকাণ্ডের প্রভাবই হয়ে ওঠে মূল আলোচনার বিষয়। কমবেশি গুরুত্ব পায় জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে হামলা হতে পারে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ নিয়ে শুরু হয় শঙ্কা।

তবে জঙ্গি হামলার ঠিক আগের দিন ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রকাশিত প্রসপেক্টাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শুরু হয় প্রতিবাদের ঝড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহিংস প্রতিবাদের মুখে রেজিস্ট্রারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আলটিমেটাম দেওয়া হয় বর্তমান উপাচার্যের পদত্যাগের। কিন্তু এর মধ্যেই জঙ্গি হামলায় হারিয়ে যায় আলটিমেটাম ও ভিসির পদত্যাগের দাবি। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেই কমিটির পদক্ষেপের বিষয়গুলো এখন আর আলোচনায় নেই। অবশ্য জঙ্গি হামলার আলোচনার মধ্যেই গত সপ্তাহে স্বাক্ষর হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চূড়ান্ত চুক্তি। এতদিন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে বলে জনআন্দোলন থাকলেও এবার আর আলোচনায় আসেনি তেমনভাবে।

এর আগের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু গত ৫ জুন চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু বাসার কাছে গুলিতে হত্যার শিকার হওয়া। হত্যায় প্রাথমিকভাবে জঙ্গিদের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হলেও মোড় ঘুরে যায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। গুলশান হামলার এক সপ্তাহ আগে দেশে আলোচনর মূল ইস্যুই ছিল— এসপি বাবুল কী নিজেই তার স্ত্রীর হত্যায় জড়িত, নাকি পুলিশের অভ্যন্তের কেউ এসপি বাবুলকে জড়াতে চাইছেন সেই আলোচনা। কিন্তু সেই তদন্তও এখন হারিয়ে গেছে। সন্দেহজনদের তালিকায় এসপি বাবুলের সোর্স মুছার কথা বলা হলেও সেই মুছার আর খবর নেই। একইভাবে তদন্ত থমকে গেছে তনু হত্যাকাণ্ডের। কবর থেকে লাশ তুলে ফরেনসিক পরীক্ষার পর আর কোনো অগ্রগতি নেই সামাজিক যোগাযোগে আলোচনার মাধ্যমে গণমানুষের দৃষ্টিতে উঠে আসা কিশোরী তনু হত্যাকাণ্ডের। সারা বিশ্বের আলোড়ন তোলা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর সেই টাকা উদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং চুরির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার ইস্যুগুলো ছিল গণমাধ্যমের মূল আকর্ষণের বিষয়। কিন্তু জঙ্গি হামলায় ছাপিয়ে গেছে তাও। সুরাহা না হওয়ার পর হারিয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তির ইস্যু। চরম সমালোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া মোবাইল সিমের বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়ার পর নানান অসঙ্গতির বিষয়গুলো উঠে আসছিল ধীরে ধীরে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যহার করে অন্যের সিম রেজিস্ট্রেশন করার খবর আসছিল বিভিন্ন স্থান থেকে। কিন্তু জঙ্গি হামলার পর তাও চলে গেছে দৃষ্টির আড়ালে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনাগুলো অবশ্যই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইস্যুর কারণে আমরা গুরুত্বপূর্ণ অন্য সব ইস্যু যেমন— দারিদ্র্য, যৌন নির্যাতন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্নীতি ইত্যাদি খবরগুলোর প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলছি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের প্রসপেক্টাসে ভুল তথ্য, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন এমনটি উল্লেখ করা হয়। আর এই তথ্য দেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, দেশের চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যা মামলা যেমন— তনু ও সাগর-রুনিসহ অন্য হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারও আমরা চাই। একই সঙ্গে আমরা যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার চাই, আমাদের ছেলেমেয়েগুলো যাতে বিপথে না যায় সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, স্বাভাবিক অপরাধমূলক ঘটনাগুলোকে যদি গণমাধ্যমে গুরুত্ব দেওয়া না হয় তবে এ ধরনের ঘটনার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এমনকি এমনটি চলতে থাকলে দেশের আইনের ভারসাম্য আসবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যদি অন্যান্য কাজ ফেলে জঙ্গিদের ধরতে বা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তবে অন্যান্য অপরাধমূলক ঘটনাও বৃদ্ধি পাবে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, গণমাধ্যমে বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে জঙ্গি ইস্যুটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন— টকশোগুলোতে এখন একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। আর তা জঙ্গিবাদ নিয়ে। কিন্তু এর বাইরেও দেশে আরও সমস্যা আছে সেগুলো ভুলে গেলে চলবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষ সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া যে কোনো বড় ঘটনাকে অতীতের ঘটনাগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এমনকি তার চেতনা ও স্মৃতিতে অতীতের বড় ঘটনাগুলোর চেয়ে সাম্প্রতিক বড় ঘটনাগুলোর খুটিনাটি বেশি থাকে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আগের ঘটনাগুলো ভুলে যান। সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলায় মানুষ জঙ্গিবাদের ইস্যুটিকে বেশি গুরুত্ব দিলেও আগের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় তাদের মনের কোনো একটি স্তরে অবশ্যই স্মৃতি হিসেবে রয়ে যায়। এই অধ্যাপকের মতে, জঙ্গিবাদের ঘটনার পাশাপাশি আমাদের সামগ্রিকভাবে দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়েও সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও সারা দেশের সিরিজ বোমা হামলার মতো স্পর্শকাতর ঘটনাগুলো ভুলে গেলে চলবে না। যেহেতু গুলশান হামলার ঘটনাটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ঘটেছে এবং বিভিন্ন টিভির সংবাদে এই হামলার ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে সে কারণে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম এ বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা গুলশান হামলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সে কারণে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেনেড হামলা মামলাটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে মানি কিন্তু স্বাভাবিক যে মামলাগুলো চলমান আছে সেগুলো যদি নজরদারি করা না হয় তবে সমাজে এক ধরনের জলাবদ্ধতার মতো অবস্থা তৈরি হবে। আর এ জন্য বাংলাদেশকেও বিরাট মাশুল দিতে হবে। আমি মনে করি জঙ্গিবাদের মতো বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষ বাহিনী মনিটরিং করতে পারে। আবার বাহিনীর অন্য সদস্যরা সাধারণ মামলা বা অন্য আসামিদের নজরদারি করতে পারেন। আর এটি নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ থেমে যাবে। জঙ্গি ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতারাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এই ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কিন্তু তাদের একই সঙ্গে অন্য আসামিরা যাতে কোনোভাবে এই জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে বলে মন্তব্য অ্যাডভোকেট এলিনা খানের।   

এই পাতার আরো খবর
up-arrow