Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৫ জুলাই, ২০১৬ ২৩:২২
জঙ্গিদের শেষ পরিণতি বেওয়ারিশ
৮ লাশ নিয়েছে আঞ্জুমান ৫টি হিমঘরে
মির্জা মেহেদী তমাল

১৩ জানুয়ারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠন জেএমবির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডার কামাল ওরফে হীরণ ও ঢাকা উত্তরের সামরিক কমান্ডার আবদুুল্লাহ আল নোমান। তাদের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। ময়নাতদন্ত হয়। লাশ দুটি রাখা হয় মর্গে। দিন যায়, মাস যায় কিন্তু তাদের লাশ নিতে কেউ আসে না। নাম পরিচয় থাকা সত্ত্বেও দুই মাস পর বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দুটি দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় হামলার পর পাল্টা কমান্ডো হামলায় নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি। উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত এই তরুণেরা জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছিল। এসব তরুণের পরিবারে তাদের জন্য আর অবশিষ্ট নেই স্নেহ-ভালোবাসার কোনো অনুভূতি। এমনকি তাদের মৃত্যুও শোকের মাতম তোলেনি পরিবারে। লাশ পর্যন্ত নিতে আসেনি তারা। এই পাঁচ তরুণ জঙ্গির লাশ পড়ে আছে সিএমএইচের হিমঘরে। নাম পরিচয় থাকা তরুণদের এই মৃতদেহ পাঁচটি এখন বেওয়ারিশ হিসেবে হস্তান্তরের অপেক্ষায়।

জঙ্গিদের দাপটে গোটা দেশ থাকে আতঙ্কে। সেই দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের পরিণতি হয় বেওয়ারিশ। তাদের লাশ অবহেলায় পড়ে থাকে লাশকাটা ঘরে। পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। পরিবারের কেউ লাশ দেখতে আসে না। পরিচয় দেয় না। তাদের জানাজায় কোনো লোক আসে না। নাম-পরিচয় হারিয়ে মৃতদেহগুলোর নতুন নাম হয় ‘বেওয়ারিশ লাশ’। গত সাত মাসে নাম পরিচয় থাকা এমন ১৫ জঙ্গির মৃত্যুর পর তাদের লাশ হয় বেওয়ারিশ। মাসের পর মাস পড়ে থাকার পর ইতিমধ্যে ১০টি লাশের দাফন করা হয়েছে। দাফনের অপেক্ষায় রয়েছে পাঁচটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা জান্নাতপ্রাপ্তির লোভ দেখিয়ে তরুণ-যুব সমাজকে উগ্রপন্থার দিকে টানে, সেই তরুণরা বেওয়ারিশ লাশ হওয়ার পর তারা আর খোঁজও নেয় না। যারা জেএমবিতে যুক্ত হচ্ছে তাদের অনেকের মা-বাবা ঘৃণায় সন্তানের লাশ গ্রহণ করতে আসেন না। কারও কারও ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে এদের লাশ দাফন করতে হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, জেএমবির এমন অনেক সদস্য পাওয়া গেছে— পরিবার যাদের ত্যাজ্য করেছে। এ ছাড়া সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়েও জেএমবিতে যুক্ত হওয়া স্বজনের লাশ গ্রহণ করতে আসেন না পরিবারের কেউ। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর লাশও পরিবারের সদস্যরা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নিহত জেএমবি সদস্যদের ক্ষেত্রে এমন দেখা যায় না। ওই কর্মকর্তা বলেন, জেএমবিতে যারা সম্পৃক্ত হয় তাদের অনেকের সঙ্গেই পরিবারের সম্পর্ক থাকে না। কেউ আবার গোপনে জেএমবির সঙ্গে জড়ায়। প্রথমে স্বামী জেএমবির সদস্য হয়েছে; এক সময় তার স্ত্রীও স্বামীর পথ ধরে উগ্র মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, এমন উদাহরণও আছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, জঙ্গিরা ছেলেদের টার্গেট করে। মসজিদে জিহাদের কথা বলে উদ্বুদ্ধ করে। হিজরতের নামে ঘর থেকে বের করে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেয়। তারপর বেহেশতের কথা বলে ছেলেদের জঙ্গিবাদে নামায়। কিন্তু গুলশান হামলাকারীদের লাশ এখন পড়ে আছে, কেউ নিতেও আসছে না। কারণ জঙ্গিদের মানুষ ঘৃণা করে।

মৃত্যুর পর বেওয়ারিশ : সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১০ জঙ্গি নিহত হয়। তাদের জুটেছে এমন পরিণতি। পরিচয় প্রকাশের পরও লাশ অবহেলায় পড়ে ছিল মর্গে। তাদের লাশ নিতে আসেনি কেউ। শেষ পর্যন্ত লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। ঈদের দিন শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনায় নিহত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবিরের দাফন হয় কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়াতেই। তার নামাজে জানাজায় কেউ অংশ নেয়নি। বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ দাফন হয় সেখানে। মৃত্যুর দুই মাস পর দুই জঙ্গি কালাম ওরফে হিরণ ওরফে তুহিন ও নোমান ওরফে আবদুল্লাহর লাশ হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। এ দুটি লাশ পড়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। কামাল জামায়াতুল মুজাহিদীনের (জেএমবি) ঢাকা অঞ্চলের নতুন কমান্ডার ছিলেন। নিহত অপর জঙ্গি সদস্য নোমান ছিলেন ঢাকা অঞ্চলের অপারেশনাল কমান্ডার। তারা আশুলিয়া চেকপোস্টে পুলিশ সদস্য হত্যা এবং পুরান ঢাকায় হোসনি দালানে বোমা হামলায় জড়িত ছিলেন। ১৩ জানুয়ারি তারা নিহত হলেও দাফন করা হয় মার্চে।

মর্গের তত্ত্বাবধায়ক সেকেন্দার আলী বলেন, ‘জঙ্গির লাশ হলেই বিপাকে পড়তে হয়। কারণ তাদের লাশ কেউ নিতে না এলে ফ্রিজে রাখতে হয়। তাতে করে দীর্ঘদিন ফ্রিজ আটকে থাকে। অন্য লাশ রাখা সম্ভব হয় না। আবার স্থান সংকুলান না হওয়ায় জঙ্গির লাশ ফেলে রাখতে হয় মেঝের ওপর। তাতে করে লাশ পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এক সময় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

গত ২৮ ডিসেম্বর গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার যোগীতলার ভোগরা বাইপাস এলাকার দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন পরিত্যক্ত ভবনে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় হেলাল ও মামুন নামে দুই জঙ্গি। দুজনের বাড়িই চট্টগ্রামে। তবে পরিচয় প্রকাশের পরও মর্গ থেকে এই দুজনের লাশ গ্রহণ করেননি কেউ। নিহত হওয়ার দুই দিন পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তাদের লাশ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে দাফন করা হয়। এর আগে ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাগমারার মচমইল সৈয়দপুর চকপাড়া আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে বোমা হামলা করতে গিয়ে নিহত হয় হামলাকারী তারেক আজিজ। নিহত আজিজ জেএমবির সদস্য। ঘটনার দুই দিন পর তার লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে রাজশাহীর হেতেম খাঁ গোরস্তানে দাফন করা হয়। এর কিছুদিন পর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামাল উদ্দিন নামে এক সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তার লাশও দাফন হয় বেওয়ারিশ হিসেবে। ২৫ নভেম্বর রাজধানীর গাবতলীর দ্বীপনগর এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় ওই সময়ের সামরিক কমান্ডার শাহাদত ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা। গত জুনে রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত তারেক হোসেন মিলুর লাশ নিয়েছে তার ছেলে। একই ঘটনায় নিহত সুলতান মাহমুদ রানার লাশ নিতে কেউ আসেননি।

গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর থেকে গ্রেনেড-বিস্ফোরণ-অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেফতারের পর অভিযানের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জেএমবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ জাবেদকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সদরঘাটের বাংলাবাজারে ছিনতাইয়ের সময় নিজেদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত দুই জেএমবি সদস্যকেও বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করেছিল আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম।

পাঁচ জঙ্গির মৃতদেহ হিমঘরে : ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় কমান্ডো অভিযানের সময় নিহত পাঁচ জঙ্গির মৃতদেহ এখনো ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচে) মর্গে। পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত কেউ লাশ নিতে আসেনি। নিহত জঙ্গিরা হলো নিবরাস ইসলাম, মীর সামি মোবাশ্বের, রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে জুয়েল। গত ৫ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকদের একটি দল তাদের ময়নাতদন্ত করে। সিএমএইচে ময়নাতদন্তের পর সেখানেই মৃতদেহগুলো রাখা হয়। ১ জুলাই রাতে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে অতর্কিত হামলা ও জিম্মি করে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে এই জঙ্গিরা। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযানে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয় যৌথবাহিনী।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow