Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৭
প্রস্তুত ফাঁসির মঞ্চ
কারা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল, ক্ষমা চাইবেন না মীর কাসেম আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক ও গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রস্তুত ফাঁসির মঞ্চ

যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় কার্যকর যে কোনো সময়ে। আজ শনিবার রাতেই তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য দিয়ে বলেছে, মীর কাশেম রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না বলে জানিয়েছেন। তার ফাঁসির রায় কার্যকর করতে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই। তাই কাশিমপুরের ফাঁসির মঞ্চ এখন প্রস্তুত। নির্দেশের অপেক্ষায় জল্লাদ দল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয়। পুলিশের সাঁজোয়া যান গত রাতেই অবস্থান নেয় কারাগারের সামনে। আশপাশের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। যানবাহন চলাচলও বন্ধ থাকে। এর আগে কারাগারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এ কারাগারে কোনো যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না বলে গতকাল দুপুরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলী। এর পর থেকেই সারা দেশের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— কখন হচ্ছে এই আলবদর নেতার ফাঁসি। সব প্রক্রিয়া তো শেষ, পরিবার-পরিজন তার সঙ্গে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। কখন ফাঁসিতে ঝোলানো হবে— এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক বৃহস্পতিবার বলেন, ‘সরকারের আদেশ পেলে আমরা রায় কার্যকর করব। এজন্য আমাদের যাবতীয় প্রস্তুতি আছে।’

৩০ আগস্ট মীর কাসেমের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রিভিউ আবেদন খারিজের তিন দিনের মাথায় মীর কাসেম জানালেন, তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন না। মীর কাসেম আলীর মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া বলেন, ‘নিখোঁজ ছেলেকে ছাড়া তিনি (মীর কাসেম আলী) রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন না, এটা আগেই বলেছিলেন। এখন আমরা জেনেছি যে উনি প্রাণভিক্ষার আবেদন না করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’ গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের সময় যাতে কোনো মহল নাশকতা সৃষ্টি না করতে পারে সেজন্য জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েছে। কারাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি টহল ও তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে।

প্রাণভিক্ষা না চাইলে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়— এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সব বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলে কারাবিধি অনুসারে রাষ্ট্রপতির কাছে আসামির বিরুদ্ধে আনীত সব অপরাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার শেষ সুযোগ থাকে। কারা কর্মকর্তারা দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কিনা জানতে চান। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি না সূচক উত্তর দিলে তা ম্যাজিস্ট্রেটকে সাক্ষী রেখে শোনানো হয়। পরবর্তীতে প্রাণভিক্ষার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে ফাঁসির আদেশ কার্যকরের আদেশ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির উত্তর হাতে পাওয়ার পর থেকে যে কোনো সময়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে তারা জানান। কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন জানান, গতকাল দুপুরের পর আবারও আসামি মীর কাসেম আলীর সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা (মার্সি পিটিশন) চাইবেন না। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকার যেভাবে নির্দেশ দেবে সেভাবেই তা প্রতিপালন করা হবে। তার ফাঁসি কার্যকরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

প্রস্তুত কাশিমপুর : কারাসূত্র জানায়, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ আছে দুটি। একটি কাশিমপুর পার্ট-২, অন্যটি হাই সিকিউরিটিতে। যে কোনো একটিতে দেওয়া হবে তার ফাঁসি। আর এজন্য ফাঁসির দুটি মঞ্চই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। মোম মাখানো দড়িতে বালুর বস্তা দিয়ে প্রাথমিক মহড়া শেষ। প্রস্তুত রয়েছেন জল্লাদ শাহজাহান, রাজু, পল্টুসহ আরও কয়েকজন। এই জল্লাদ দল ইতিপূর্বে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত আসামি মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করেছিল। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত পেলেই দণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে। সূত্র আরও জানায়, দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ একটি ব্যতিক্রমী ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। সেখানে বন্দীদের থাকার জন্য রয়েছে ছয় তলা বিশিষ্ট ৬টি ভবন। প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ২১টি করে ওয়ার্ড। এই কারাগারে ফাঁসির আসামিদের জন্য আছে ৪০টি কনডেম সেল, যার একটিতে রয়েছেন মীর কাসেম আলী। এমনিতেই কারাগারটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমন্বয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত। এর পরও যেহেতু এখানে প্রথমবারের মতো কোনো যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে, তাই কারাগারে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এমনিতেই এই কারাগার এলাকা সম্পূর্ণভাবে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার আওতাধীন, তার পরও নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে বাড়তি কিছু সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। জেলার নাসির আহমদ জানান, মীর কাসেম আলীকে ৪০ নম্বর কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। তিনি সুস্থ আছেন। কারাগারের চিকিৎসকরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। তাকে স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হয়েছে।

মীর কাসেম আলীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেফতার করা হয়। ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুটি অভিযোগে মীর কাসেমের ফাঁসি ও আটটি অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম। চলতি বছরের ৮ মার্চ আপিলের রায়ে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে হত্যার দায়ে মীর কাসেমের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে সর্বোচ্চ আদালত। অন্য ছয়টি অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে তার কারাদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ১৯ জুন আবেদন করেন মীর কাসেম। তার আবেদনের ওপর ২৪ আগস্ট শুনানি শুরু হয়। মীর কাসেমের রিভিউ আবেদনের ওপর গত ২৮ আগস্ট শুনানি শেষ হয়। এরপর ৩০ আগস্ট মীর কাসেমের করা আবেদন খারিজ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মীর কাসেমের আইনি লড়াইয়ে রিভিউ আবেদনই ছিল শেষ ধাপ। এই আবেদন খারিজ হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার পথ শুধু খোলা ছিল। তবে শুরুতে মীর কাসেম জানিয়েছিলেন, ‘নিখোঁজ’ ছেলের সিদ্ধান্ত ছাড়া তিনি এ বিষয়ে কোনো মতামত দেবেন না। মীর কাসেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুন দাবি করেছিলেন, সাদা পোশাকধারী লোকজন তাদের ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেমকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। সেই ছেলে তার বাবার আইনজীবীও। পারিবারিক যে কোনো পরামর্শের জন্য তাকে প্রয়োজন। ছেলেকে ছাড়া তাই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেবেন না তার স্বামী। পরিবারও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না।

up-arrow