Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৮
নিউ জেএমবির প্রশিক্ষক মেজর মুরাদ নিহত
মিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় গোলাগুলি, ওসিসহ আহত চার পুলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউ জেএমবির প্রশিক্ষক চাকরিচ্যুত মেজর জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে মুরাদ নিহত হয়েছেন। গত রাতে রাজধানীর পল্লবীর রূপনগরের একটি জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন মুরাদ নিহত হন। জঙ্গিদের গুলিবর্ষণ ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন রূপনগর থানার ওসি, ইন্সপেক্টরসহ অন্তত চারজন পুলিশ সদস্য। এদের প্রত্যেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহত মুরাদ ছিলেন তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ও সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান। আহতরা হলেন রূপনগর থানার ওসি সৈয়দ সহিদ আলম, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শাহিন ফকির, এসআই মোমেনুর রহমান ও এএসআই বোখারি। ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। রাত সাড়ে ১১টায় অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনার বর্ণনা করেন। রাত পৌনে ১২টায় ঘটনা সম্পর্কে ব্রিফ করেন এসবির অতিরিক্ত আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। এ সময় তিনি নিশ্চিত করেন, নিহত জঙ্গির নাম মুরাদ। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। জঙ্গিদের প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করতেন বলে তিনি জানান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত পৌনে ৯টায় এ ঘটনার পর রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। রাত ১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জঙ্গি আস্তানায় তল্লাশি শেষ করে বাড়িটি ঘিরে রাখে পুলিশ। জঙ্গি মুরাদ যে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন তার মালিকের নাম আবুল হাশেম। ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার দেওয়ানবাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানে দুই সহযোগীসহ নিহত হন গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী। পাঁচ দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে নিউ জেএমবির শীর্ষ দুই নেতা নিহত হলেন। এই মুরাদ নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাড়িটি ভাড়া করেন। পুলিশ জানায়, রূপনগর আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাসায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। চারদিক ঘিরে ওই বাসার ভিতর অভিযান শুরু করে। পুলিশ গুলি করতে করতে ওই আস্তানার ভিতর ঢুকে পড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জাহাঙ্গীর হোসেন মুরাদ। তিনি নিউ জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। ট্রান্সন্যাশনাল টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক মেজর মুরাদ। এদিকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিকশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মেজর মুরাদ ছিলেন নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর সেকেন্ড ইন কমান্ড।

যেভাবে অভিযান : দুই মাস আগে মুরাদ ওই বাসাটি ভাড়া নেন। সেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। তিনি যখন ওই বাসায় ওঠেন, তখন তার দাড়ি ছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর দাড়ি ফেলে দেওয়া হয়, ফলে চলাফেরায় স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তারা পুলিশকে বিষয়টি জানান। ২৮ আগস্ট ওই বাসায় পুলিশ যায়। কিন্তু সকালেই মুরাদ পরিবার নিয়ে বেরিয়ে যান। পুলিশ বাসার দরজায় তালা লাগানো দেখে ফিরে যায়। যাওয়ার আগে বাড়িওয়ালাকে পুলিশ বলে যায়, কেউ এলেই যেন পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে মুরাদ বাসায় ফিরে আসেন। এ সংবাদ পৌঁছে যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ বিকাল থেকেই নজরদারিতে রাখে বাড়িটি। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় পুলিশ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেয়। এর আগেই পুলিশ বাসার আশপাশের লোকজনদের সরিয়ে দেয় নিরাপদ স্থানে। এরপর পুলিশ মুরাদের দরজায় কড়া নাড়ে। কিছু সময় পর ভিতর থেকে দরজা খুলে দেন মুরাদ। পুলিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুরাদের হামলার শিকার হন তারা। পুলিশ তাকে জাপটে ধরতে গেলে মুরাদ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকেন পুলিশকে। এ সময় ওসিসহ চারজন আহত হলে পুলিশ কিছুটা নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে ঘরের ভিতর এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে নিহত হন মুরাদ। পুলিশ জানিয়েছে, মুরাদ নিউ জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন। মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গিদের মধ্যে মুরাদ অন্যতম। অভিযান শেষে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেছুর রহমান রাত সাড়ে ১১টায় আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৩৩ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর ছয় তলাবিশিষ্ট ওই বাসার নিচতলায় এক জঙ্গি অবস্থান করছিল বলে অবস্থান শনাক্ত করে রূপনগর থানা পুলিশ। পরে তারা রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টা পর্যন্ত সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশ সেখানে ঢুকতে গেলে তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তার হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করেন। পুলিশও পাল্টা আক্রমণ করলে ঘটনাস্থলে তিনি নিহত হন। তার অস্ত্রের আঘাতে রূপনগর থানার ওসি, পরিদর্শক তদন্ত, একজন এসআই ও একজন এএসআই আহত হন। এর মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতের নাম জানতে চাইলে মোখলেছুর রহমান বলেন, তার নাম কখনো জাহাঙ্গীর, কখনো মুরাদ এবং কখনো তিনি ওমর নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ওই জঙ্গির হাতে পিস্তল ও ছুরি ছিল। তিনি সরকারি কোনো কর্মকর্তা ছিলেন কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে বাড়ির মালিক এই অভিযানে সহায়তা করেছেন। ১ জুলাই বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। পৌনে ১২টার দিকে অতিরিক্ত আইজি স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান জাভেদ পাটওয়ারি ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আহত ওসি সৈয়দ সহিদ আলম ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শাহিন ফকিরকে স্কয়ার হাসপাতালে দেখতে যান। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নিহত জঙ্গির পরিচয় সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এ ব্যাপারে পরে জানানো হবে। পুলিশ জঙ্গিকে ধরতে গেলে সে পিস্তল দিয়ে গুলি করে, চাপাতি দিয়ে কোপ দেয় এবং গ্রেনেডও নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশ সদস্যরা আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

up-arrow