Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪১
উন্নয়ন-কর্মসংস্থান গ্রামে ফিরছেন দখিনের মানুষ
রুহুল আমিন রাসেল, দুমকি ও বাকেরগঞ্জ থেকে ফিরে
উন্নয়ন-কর্মসংস্থান গ্রামে ফিরছেন দখিনের মানুষ

তিন বছর আগে ঢাকায় প্রাইভেট কার চালাত মাসুদ হাওলাদার। এখন ইজিবাইক চালান তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে।

তার  মতো আরও অনেকের আয়-রোজগার ভালোই। এক দশক আগে মানুষ যা কল্পনাও করেনি, তাদের জন্য পিচঢালা রাস্তা হবে, তারা এখন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে শহরে যান গাড়িতে। রাতে তাদের বাড়িতে দেখা যায় আলোর ঝলকানি। আর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধালমৌ ইউনিয়নের দাদুরহাট গ্রামের প্রায় ঘরের বাসিন্দারা ঘুরে বেড়ান স্যাটেলাইট দুনিয়ার চ্যানেলে চ্যানেলে। দাদুরহাট গ্রামের বাসিন্দা রাশিদা বেগম গত সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদ্যুতের সংযোগ তাদের বাড়িতে আগেই ছিল। আর বাড়ির সামনে থাকা পাকা সড়কে খুব সহজে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু বিনোদনের কিছু ছিল না আগে। বছর খানেক আগে স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে ডিস সংযোগের ব্যবস্থা করেছেন। এখন তাদের কর্মব্যস্ত দিনের অবসর সময়টুকু যায় শহুরেদের মতোই।

জলিশা গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ হাওলাদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগে ঢাকায় প্রাইভেট কার চালিয়ে মাসে আয় হতো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। কিন্তু গ্রামে যখন ইজিবাইক চালানো শুরু করেছি, তখন দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে মাসে গড়ে ১৫ হাজার টাকা আয় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন শহরে আগের মতো টাকা নেই। গ্রামে বদলা দিলেও ৫০০ টাকা পাওয়া যায়। নিজ বাড়িতে থেকে এ আয় দিয়ে ভালোই চলে। দুমকি ও বাকেরগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে আরও জানা যায়, আগে যারা ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থানে কর্মসংস্থানের জন্য যেতেন, তারাও এখন গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। কেউ শুরু করেছেন স্বল্প পুঁজির ব্যবসা। কেউ করছেন চাকরি। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ, ব্যবসা-বাণিজ্য এখন রমরমা। আর পদ্মা সেতু প্রকল্পের পালে যত বেশি হাওয়া লাগতে শুরু করেছে, ততই শিল্প-কারখানা স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দখিনের মানুষ। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঢাকামুখী হওয়া কমাবে। তার মতে, পদ্মা সেতু ও পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকায় জমি সস্তা। লোকবলেরও অভাব নেই। কিন্তু আছে জ্বালানি সমস্যা। তবে পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হতে হতে জ্বালানি সমস্যাও থাকবে না। সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যত দ্রুত এগুচ্ছে, ততই বাড়ছে সেখানকার মানুষের কর্মসংস্থান। ফলে পুরো দেশের উন্নয়নে সুষম অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরিতে সরকার যে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে, তারই ফসল হলো—শহর নয়, গ্রামে গ্রামে মানুষের কর্মসংস্থান। আমি মনে করি, মানুষ সেই সুফল পেতে শুরু করেছে। জানা গেছে, দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ৩৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার কয়েক কোটি মানুষের স্বপ্নের এই সেতু চালু হওয়ার আগে জাহাজ নোঙ্গর করেছে পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরে। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যখন গাড়ি যাবে দখিনের জনপদে, তখন সেতুর নিচ দিয়ে রেলও যাবে। তাতেই দখিনের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে—এই আশা বুকে নিয়ে বৃহৎ বৃহৎ শিল্প গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অবহেলিত এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন নিয়ে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, বর্তমানে পায়রা বন্দর এলাকায় বন্দর, জেটি, কন্টেইনার টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি চলমান ‘পায়রা কাস্টমস হাউস’র জমি দ্রুত অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পটুয়াখালী ও ভোলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে যাচ্ছে সরকার। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার আলোকে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী ঘিরে মাস্টার প্ল্যানও তৈরি করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে এখানে জমির অভাব নেই। সম্ভাবনা আছে পোশাক-শিল্পনগরী গড়ে তোলার। মাঝের চরের মতো অজোপাড়া গাঁয়ে সরকার গড়ে তুলতে চাইছে তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল সম্ভার বা আইটি পার্ক। আরও আছে স্কুল, কলেজ, স্টেডিয়াম, শিশুপার্ক। সব মিলিয়ে সাগরকন্যা পটুয়াখালী এখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লম্ফন দিতে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত আগামী তিনবছরের জন্য মধ্য মেয়াদি সামস্টিক অর্থনৈতিক নীতি-বিবৃতি শীর্ষক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার বরাবরের মতো ব্যক্তি খাতকেই গুরুত্ব দিয়েছে। চলতি ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ এই অর্থবছরে কর্মসংস্থানের জন্য ছয়দফা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো নিম্নরূপ : আত্ম-কর্মসংস্থান ও ব্যক্তি উদ্যোগের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে উৎসাহিত করে বেকারত্ব দূর করা। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কর্মসংস্থানের জন্য ব্যক্তি খাতই বেশি ভূমিকা রাখছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ খাতের কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তবে সরকারি খাতে চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে। কেননা এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে আরেকটা ধাক্কা প্রয়োজন। তবে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর জরিপ অনুযায়ী, বিগত ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে প্রতি বছরে ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছে। অথচ এ সময়ে দেশের কর্মবাজারে প্রবেশ করেছে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ। সেই হিসাবে দেশে দুই বছরে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ। এর আগে ২০০২-০৩ থেকে ২০১২-১৩ পর্যন্ত প্রতি অর্থবছর চাকরি বা কাজ পেয়েছিল ১৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।

up-arrow