Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৩
ন হাঁদিলে পোয়া দুধ ন ফাই
৫৭ বছরে আজাদী
রিয়াজ হায়দার, চট্টগ্রাম
ন হাঁদিলে পোয়া দুধ ন ফাই
এম এ মালেক

পত্রিকা বিক্রির মাধ্যমে ভিক্ষুকদের রোজগারের নতুন পথ তৈরি করে চট্টগ্রামে সংবাদপত্রে হকার শ্রেণি গড়ে তোলেন দেশের প্রাচীনতম দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক। তার হাত ধরেই স্বাধীনতার প্রথম দৈনিকের স্বীকৃতি পাওয়া এ কাগজটির বর্তমান সম্পাদক এমএ মালেক নিজেও গোড়ার দিকে স্বজন শুভার্থীদের কাছে সাইকেলে চড়ে পত্রিকা ফেরি করতেন। টানা ৪০ বছর ভোর রাত ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত নিজে দাঁড়িয়ে পত্রিকা বিপণনের কাজ তদারকি করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে ছবি তোলা, প্রতিবেদন তৈরি থেকে সংবাদপত্রের সব পর্যায়েই অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সম্পাদক তিনি। ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের ছবি তুলতে গিয়ে ছয় ঘণ্টা কারাবাস করেছেন। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্ত বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ প্রধান শিরোনামে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক আজাদীই স্বাধীনতার প্রথম দৈনিক হিসেবে গণমাধ্যমে শুধু চট্টগ্রামের নয়, জাতীয় গৌরবের অংশীদার হয়ে রয়েছে। দেশের প্রাচীন এ দৈনিকটির সম্পাদক মনে করেন, স্বাধীনতার পর থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ঠিকমতো হয়নি। প্রত্যাশিত উন্নয়নের জন্য ঠিকমতো পরিকল্পনা প্রণয়ন করে পর্যাপ্ত বরাদ্দ চাইতে হবে। প্রয়োজনে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কথনে— ‘ন হাঁদিলে পোয়া দুধ ন ফাই’ (না কাঁদলে ছেলেও দুধ পায় না)- প্রবাদটি মনে করিয়ে দিয়ে এমএ মালেক বলেন— সিটি করপোরেশনকে তার ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্য দিয়েই কাজ করতে হবে। নির্দিষ্ট কাজের বাইরে পাঁচ তারকা হোটেল করতে চাইলে হবে না। চট্টগ্রামের উন্নয়নে বরাদ্দ অপ্রতুল বলেও জানান তিনি। নিজের পত্রিকাটির প্রায় ছয় দশক অতিক্রমে ঘটনা বহুলতা, প্রতিষ্ঠালগ্নের দায়বদ্ধতা ও আগামীর স্বপ্নের কথাও জানান তিনি। চট্টগ্রামে অগুনতি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত এ সম্পাদক। পূর্বাঞ্চলীয় সংবাদপত্র পরিষদ এবং চট্টগ্রাম প্রেস মালিক সমিতির সভাপতি, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের এই ভাইস প্রেসিডেন্ট চিটাগাং ক্লাবের তিনবারের সভাপতি  ও লায়নস ক্লাবের গভর্নর ছিলেন। একাধিকবার চিটাগাং চেম্বারের পরিচালকও ছিলেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৬১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় দুই দফা নিজের পত্রিকাটির দুর্যোগ সময়ের কথা উল্লেখ করে এমএ মালেক বলেন, প্রতিটা দুর্যোগে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দেওয়ায় আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে। মূলত পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে সচেতনতা ও শিক্ষার আলো দেওয়ার জন্য নিজের মরহুম বাবা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক আজাদী প্রকাশনা ও লাইব্রেরি করেন বলে জানান এ সম্পাদক। নিজের বাবার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ছিলেন ধর্মভীরু। নিজের প্রতিষ্ঠিত কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেসের কাছেই আন্দরকিল্লাহ শাহী জামে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যেতেন। মসজিদের সামনে বসে থাকা নিত্যকার ভিক্ষুককে নিজে পত্রিকা বের করে হকারের দায়িত্ব দেন। বিনিময়ে ভিক্ষুকরা উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হন। জামানত ছাড়াই পত্রিকা বিক্রির জন্য দেওয়ায় প্রথম দিকে দৈনিক কিছু পত্রিকার টাকা ফেরত না দিয়েই পালিয়ে যান অনেকে। এভাবেই চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয় পত্রিকার হকার শ্রেণির। সংবাদপত্রকে প্রতিদিনই নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে হয়। পত্রিকা ও সম্পাদকের নাম এবং ঠিকানা ছাড়া প্রতিদিনই পাঠকের কাছে নতুন খোরাক দিতে হয়। আজাদী নিত্যকার এ চ্যালেঞ্জ উত্তীর্ণ হতে পেরেছে বলেই এর প্রকাশনা ৫৭ বছর ছুঁয়েছে। ‘ব্যবসা নয়, সেবার মনোবৃত্তি নিয়েই আজাদীর জন্ম এবং চট্টগ্রামের গত প্রায় ৬ দশকের সব ইস্যুতে পত্রিকাটি সজাগ ভূমিকা রেখেছে,’ জানান তিনি। দীর্ঘকালীন প্রকাশনার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধকালে বরেণ্য রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ পত্রিকাটির সম্পাদনায় থাকায় পাকিস্তানিদের রোষানলের শিকার হন বলে জানান এই সম্পাদক। সংবাদপত্রের ৫৭ বছরেরর পথযাত্রায় পর্যায়ক্রমে ‘হ্যান্ড কম্পোজ, লাইনো টাইপ, মনো টাইপ, ফটোটাইপ সেটার হয়ে কম্পিউটার সেটআপ— এসবের জীয়ন সাক্ষী আজাদীর সম্পাদক জানান, তার পত্রিকা চট্টগ্রামবাসীর কাছাকাছিই থাকতে চায়। ঢাকার কাগজগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, পরিপূরক হতে চায়। তিনি বলেন, বাঙালিদের দুটি অভ্যাস ভালো। আড্ডা দেওয়া ও পত্রিকা পড়া। ধার করে হলেও বাঙালি পত্রিকা পড়ে। এখন ৮/১০ টাকার নিচে যেখানে চাও পাওয়া যায় না, সেখানে ৫/৬ টাকার আঞ্চলিক কাগজে পাঠকের তৃষ্ণা মেটে। শীর্ষ আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশনায় সরকারের কোনো প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সরশিপ নেই বলেও জানান তিনি। আরও বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের প্রভাব কমেনি, বরং বেড়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে বলেন, বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। প্রয়োজনে হল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞ এনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় কাজ করলে ৫/১০ বছরে এটি নিরসন সম্ভব। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো খুব অবহেলিত। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অনেক দূরে। তিনি বলেন, জঙ্গি সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশে খুব বেশি মাথাচাড়া দিতে পারবে না। কারণ দেশের মানুষ সম্প্রীতি ও শান্তিকামী। সব ধর্মের মানুষের অবস্থানের শহর চট্টগ্রামে ১৯৪৭ সালের পর থেকে এ যাবৎ সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয়নি। তবে অভিভাবকদের সচেতনতাই এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগে সহায়ক হতে পারে।

up-arrow