Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪২
ঈদের পর রাজনীতি
কাউন্সিল নিয়ে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ
রফিকুল ইসলাম রনি
ঈদের পর রাজনীতি

উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন দল আওয়ামী লীগের আসন্ন ত্রিবার্ষিক জাতীয় কাউন্সিল জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজনের চলমান প্রস্তুতি কোরবানির ঈদের পর আরও জোরদার করা হবে। ঈদের পরপরই পুরোদমে শুরু হবে কাউন্সিল উৎসব। সারা দেশ থেকে ৩০ হাজারের মতো কাউন্সিলর, ডেলিগেট ও নেতা-কর্মী অংশ নেবেন। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য থাকবেন ২ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক। অংশ নেবেন হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথি। ইতিমধ্যে কয়েকটি উপকমিটির বৈঠকে কাউন্সিলের সাজসজ্জা, শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে অতিথি হিসেবে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে তা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আসছে। সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করা উপলক্ষে গঠিত ১১টি উপপরিষদ ইতিমধ্যে আলাদা বৈঠক করেছে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে নেতাদের ব্যস্ততা আরও বাড়বে। এবারের সম্মেলন গতানুগতিক নয়, জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে দলটির ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি সরকারের সাফল্যগাথা ইতিহাস, আন্দোলনকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের ভয়াল নাশকতা, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতি সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পোস্টার-ব্যানার-সিডি-ভিসিডির মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার চালাবে দলটি।

দলীয় সূত্রমতে, তিন দফা পিছিয়ে দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন দলটির। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দলের কার্যনির্বাহী বৈঠকে সম্মেলনের তারিখ ২৮ মার্চ নির্ধারণ করে কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। এরপর আরও দুবার পেছানো হয় সম্মেলনের তারিখ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২৮ মার্চ তারিখ পরিবর্তন করে ১০ ও ১১ জুলাই নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর ১১ এপ্রিল দলের সাধারণ সম্পাদক সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ও ১১টি উপপরিষদ ঘোষণা করেন। কিন্তু ১১ জুন দলের আরেকটি কার্যনির্বাহী বৈঠকে ঈদ, পূজা, আগস্ট ও আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে তৃতীয় দফায় সম্মেলনের তারিখ পিছিয়ে ২২ ও ২৩ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়।

সম্মেলন প্রস্তুতি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, কাউন্সিলের কমপক্ষে ১৫ দিন আগে থেকে রাজধানীতে সম্মেলনের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাবে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ ফ্লাইওভার প্রবেশদ্বারে আলোকসজ্জা করা হবে। দিন-রাত ধরে বড় বড় এলইডি স্ক্রিনে দেখানো হবে দলটির ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্জন ও উন্নয়নের চিত্র। এরই মধ্যে সেসব ডকুমেন্টারির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেছে। জাতীয় কাউন্সিলে আসা কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের দুই দিনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছাড়াও দুই দিন ধরেই রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশদ্বারে এবং সম্মেলনস্থলের চারদিকে একাধিক মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হবে। আমন্ত্রিতদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাত্ক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াও প্রয়োজন হলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সগুলো প্রস্তুত রাখা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য উপকমিটির আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।

মঞ্চ ও সাজসজ্জা উপকমিটির আহ্বায়ক এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করা হবে। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও দলের অর্জনও দেশবাসীকে জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘এবার আমরা বর্ণাঢ্য কাউন্সিল করতে যাচ্ছি। সেজন্য শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য সাভার হয়ে সারা দেশের যেসব ডেলিগেট ও কাউন্সিলর ঢাকায় ঢুকবেন তারা যেন সাভার থেকেই বুঝতে পারেন দলের কাউন্সিল হচ্ছে ঢাকায়। ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই আবহ আমরা ডেলিগেট, কাউন্সিলর ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘কাজ অনেক গুছিয়ে এনেছি, আমাদের মূল কাজ শুরু হবে কোরবানি ঈদের পর।’

অভ্যর্থনা উপকমিটি সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি অতিথিদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে ঈদের পর যোগাযোগ করা হবে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপি, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান, যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি এবং বিশ্বের কিছু প্রাচীন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। চীনের ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও ভারতের কংগ্রেস এবং ক্ষমতাসীন দল সম্মেলনে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে সার্কভুক্ত দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। চলতি মাসেই ইমেইল ও ফোনে দাওয়াত দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

অভ্যর্থনা উপকমিটির আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে বিশ্বের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। এর মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি, বিরোধী দল কংগ্রেস, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি, যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টি ও লেবার পার্টি এবং চীনের চায়না কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দলটির গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এবারের কাউন্সিলের স্লোগানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। গঠনতন্ত্র উপকমিটির আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘গঠনতন্ত্রের পরিবর্ধন, পরিবর্তন ও সংযোজন করা হবে কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের সুপারিশ দলের কার্যনির্বাহী সভায় আলোচনা হবে। সেখান থেকে সুপারিশ আকারে আগামী সম্মেলনে যাবে এবং এর চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র ডেলিগেটদেরই।’ উপকমিটির প্রাথমিক সুপারিশ সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে সাত বিভাগে সাতজন সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন। কিন্তু এখন নতুন বিভাগ ময়মনসিংহ হওয়ায় সেখানে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ করার জন্য সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানেও নতুন সাংগঠনিক সম্পাদক পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হবে। প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদের সুপারিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টির জন্য আমরা সুপারিশ করব। কারণ, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’ গঠনতন্ত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

শৃঙ্খলা উপকমিটির সদস্যসচিব ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে আমাদের কমিটির পক্ষ থেকে শৃঙ্খলা, শান্তি, নিরাপত্তাসহ সব বিষয় মাথায় রাখা হচ্ছে। সম্মেলন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য এ উপপরিষদ মোট ২ হাজার সদস্য নিয়ে গঠন করা হবে। তারা শুধু সম্মেলনস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, ঢাকা সিটিকে শৃঙ্খলার আওতায় আনার জন্য কাজ করবেন। ২ হাজার সদস্যকে ৮০টি গ্রুপে ভাগ করা হবে। একেকটি গ্রুপে ২৫ জন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।’ সাংস্কৃতিক উপকমিটি সূত্র জানায়, সম্মেলনের ‘থিম সং’ লেখার জন্য সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তার অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আরও কিছু বিকল্প রাখা হয়েছেও বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

আজ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক : আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও সম্মেলন প্রস্তুতি উপকমিটির যৌথ সভা আজ। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে। কোরবানি ঈদের পরপরই আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লম্বা সময় দেশের বাইরে থাকবেন। ১৪-২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এই তিন দেশ সফর করবেন তিনি। যে কারণে আজকের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা। বৈঠকে আসন্ন দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে অনেক সিদ্ধান্ত হবে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি জেলা কমিটিও অনুমোদন দেওয়া হবে বলেও জানা গেছে। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের ব্যাপারেও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে আজকের বৈঠকে। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow