Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৭
গুলশান-শোলাকিয়ার জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন মেজর জাহিদ
আলী আজম
গুলশান-শোলাকিয়ার জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন মেজর জাহিদ

গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাকারীদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেন পুলিশের গুলিতে নিহত নব্য জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক মেজর (অব.) জাহিদ ওরফে মুরাদ। তার কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ পেয়েই হামলা চালিয়েছিল নব্য জেএমবির সদস্যরা।

তামিমের মৃত্যুর পর মেজর জাহিদকে ধরতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। একপর্যায়ে ঢাকা ও ঢাকার উপকণ্ঠেই মেজর জাহিদের সম্ভাব্য অবস্থান মেলে। এর মধ্যে মিরপুরের রূপনগরের বাসার সন্ধান মেলে।

সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাহিদ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই বাসায় আত্মগোপন করে আছেন। সেখানে জাহিদের নিরাপত্তা দিতে নব্য জেএমবির ১০ জন নিয়মিত সতর্ক থাকত। তাদের প্রত্যেকের কাছেই চাপাতি ও আধুনিক অস্ত্র থাকত। তবে ধূর্ত জাহিদ একপর্যায়ে রূপনগরের বাসা ছেড়ে দেওয়ার মনস্থির করে স্ত্রী-সন্তানদের অন্যত্র সরিয়ে নেন। সে সময় তাকে পাহারা দেওয়া নব্য জেএমবির আরও ১০ সদস্যকেও তিনি কিছুদিনের জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে বলেন। গতকাল মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রমতে, জাহিদের ঘনিষ্ঠ ওই ১০ জনের সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এর মধ্যে চারজনের নাম পেয়েছে পুলিশ। তারা হলো— মানিক, ইকবাল, আকাশ ও সাগর। তামিমের মৃত্যুর পর এই ১০ জনকে সঙ্গে নিয়ে জাহিদ ঢাকার রূপনগরের বাসায় একাধিক বৈঠকও করেছেন। এ ছাড়া মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার ওরফে শিলাকেও খুঁজছে গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের ধারণা, মেজর জাহিদের স্ত্রী শিলাও মহিলা জঙ্গি দলের সদস্য। জাহিদের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে রয়েছেন শিলা। ইতিমধ্যে শিলাকে ধরতে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দারা। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ডিসি মহিবুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক ছিলেন। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েই নব্য জেএমবির সদস্যরা নাশকতায় সম্পৃক্ত হতো। তার সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক গুরুত্বপর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। সেনাবাহিনী থেকে চাকরি ছাড়ার পর নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক ছাড়াও জাহিদুল ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ‘লেকহেড গ্রামার’ চাকরি নিয়েছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, এটা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে তদন্ত চলছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, জাহিদ ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার পর ঢাকায় বেশির ভাগ সময় কাটাতে শুরু করেন। সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় ধর্মভীরু ছিলেন তিনি। এ কারণেই তার চলাফেরা ছিল উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে শুরু করেন তিনি। এরপর তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে কথিত জিহাদে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তামিম চৌধুরীর হাত ধরে একপর্যায়ে তিনি পুরোপুরি নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে যান। তামিম চৌধরী যখন কানাডা ছিলেন তখন তার সঙ্গে কানাডা গিয়ে দেখা করে দেশে ফিরে এসে কিছুদিন শ্যামলী এলাকার একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অবস্থান করেন। এরপর বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। আর এই চাকরি করার পেছনেও তার এক ধরনের কূট মতলব ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি প্রশিক্ষক হলেও চাকরিটা মেজর জাহিদের এক ধরনের ‘আইডেন্টিটি’ ছিল। জঙ্গিবাদের আড়ালে চাকরি ছিল তার একটি কৌশল মাত্র। জঙ্গি সদস্য হলেও চাকরিতে থাকার কারণে তাকে যেন কেউ সন্দেহ করতে না পারে এটা ভেবেই তিনি চাকরি করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্তে অগ্রগতি : জাহিদের মৃত্যুর ঘটনায় রবিবার রূপনগর থানার এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারে জাহিদের বাসা থেকে ৪৬ ধরনের আলামত সংগ্রহ করে তদন্ত চলছে। যেভাবে বাসা ভাড়া নেন জাহিদ : ভাড়াটিয়া হিসেবে বাড়ির মালিকের কাছে দেওয়া তথ্য ফরমে জাহিদুল তার স্ত্রীর নাম লিখেছিলেন সেলিনা আক্তার (৩০)। ওই তথ্য ফরমে তাদের দুই শিশুসন্তান রামিসা আলম (৭) ও লামিহা আলম (৩) বলে উল্লেখ করেন। জাহিদুলের পরিচয় হিসেবে লেখা হয়, সাইট অফিসার, বিশ্বাস বিল্ডার্স। বাবার নাম লেখা হয় মোখলেছুর রহমান। জাহিদুল তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করেন টাঙ্গাইল সদর, মোল্লাপাড়া। তবে নারায়ণগঞ্জে জাহিদুল ভাড়াটিয়ার ফরমে তার বাবার নাম শাহজাহান আলী বলে উল্লেখ করেন। ভাড়াটিয়া ফরমে সব ধরনের তথ্য ভুল দিলেও দুই জায়গায় ফরমে নিজের আসল ছবি ব্যবহার করেন জাহিদুল। পরে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে বের হয়, জাহিদুলের বড় মেয়ের নাম জুনায়রা বিনতে জাহিদ। কিছু দিন আগেও সে রাজধানীর উত্তরার চার নম্বর সেক্টরে আহলে হাদিস পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ত।

up-arrow