Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১২
জঙ্গি অর্থায়ন খতিয়ে দেখতে প্রয়োজন তৃতীয়পক্ষীয় অডিট
রুহুল আমিন রাসেল
জঙ্গি অর্থায়ন খতিয়ে দেখতে প্রয়োজন তৃতীয়পক্ষীয় অডিট

দেশে অভ্যন্তরীণভাবে জঙ্গি-মৌলবাদীদের অর্থনৈতিক শক্ত ভিত্তি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বশেষ ৫ বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর তৃতীয়পক্ষীয় অডিট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। এর সঙ্গে ১৫টি সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, দেশের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত  নারী-পুরুষ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে সব অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে তরুণ প্রজন্মকে, একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের অসাম্প্রদায়িক মন-মনন-মানসিকতা বিনির্মাণে জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে বলে মনে করেন গত দুই দশক জঙ্গি-মৌলবাদী অর্থায়ন বন্ধে সোচ্চার এই অর্থনীতিবিদ। জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে সরকারের নেওয়া তদন্ত উদ্যোগ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. আবুল বারকাত গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে আরও বলেন, আমি সব সময় বলে আসছি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণভাবে জঙ্গি-মৌলবাদীদের অর্থনৈতিক শক্ত ভিত্তি খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিকে আমি গত ১৫ থেকে ২০ বছর মৌলবাদের অর্থনীতি বলি। তারা ব্যাংক-বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো ৯টি বড় খাতে বিনিয়োগ করেছে, সেগুলো তৃতীয়পক্ষীয় অডিট করা হোক। আমার হিসাবে ২০১৫ সালে তারা ২ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে এবং গত ৩৫ বছরে তাদের পুঞ্জীভূত নিট মুনাফা ২ লাখ কোটি টাকার উপরে। সেক্ষেত্রে আমি বলেছি, ওদের যতগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, অথবা সে সব প্রতিষ্ঠান যেগুলোকে বলা হয় মুনাফাভিত্তিক নয় এবং ওদের ২৩১টি এনজিও (ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন) আছে, এ সবগুলোর সর্বশেষ ৫ বছরের তৃতীয়পক্ষীয় অডিট করে বের করতে হবে টাকা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়। এটা করতে ৩ থেকে ৬ মাসের বেশি সময় লাগবে না। ওদের আর্থিক-অনার্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তৃতীয়পক্ষীয় অডিটের মূল বিষয় হবে, টাকা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়। আমার প্রথম কথা হলো, তাদের অস্ত্রের ও অর্থের উৎসমুখ বন্ধ করা। অস্ত্র ও অর্থ সম্পর্কে রাষ্ট্র ও সরকার যা জানে তা সব প্রকাশ করা। কারণ, ২০১৪ সাল পর্যন্ত একমাত্র ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারা ৩ বার শাস্তি পেয়েছে জঙ্গি লেনদেনের কারণে। আমার ধারণা, এটা হাজারবার হয়েছে। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটা জাতীয়করণ করা হোক। আর যে দুই লাখ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত নিট মুনাফা আছে, সেই টাকার একটা বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, দরিদ্র-বিত্তহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন তাদের মধ্যে এবং পরবর্তীকালে জঙ্গিত্বের হাতে যারা আহত ও নিহত হয়েছেন, তাদের জন্য একটা অংশ ব্যয় করা, আরেকটি অংশ বাংলাদেশের সামগ্রিক মানব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় করাই আমার সুপারিশ। গত ২৯ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি : এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদে যখন বহিঃস্থ কারণ অভ্যন্তরীণ কারণকে ছাপিয়ে যায়’ শীর্ষক প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত কলেন, মৌলবাদের রাজনৈতিক-অর্থনীতির বিকাশমান ভিত্তিতে আমাদের দেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী জঙ্গিত্ব আস্তে আস্তে যে রূপ ধারণ করেছে, তা থেকে আমি অন্তত নিশ্চিত যে ‘এ মুহূর্তে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে’ এমনটি ভাবলে বাস্তব সত্য অস্বীকার করা হবে। তাই মহাবিপর্যয় রোধে আশু (স্বল্প মেয়াদি) ও দীর্ঘ মেয়াদি সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক জঙ্গিত্ব এখনই নির্মূল সম্ভব নয়, কারণ— যেসব জটিল ভিত্তির ওপর সে দাঁড়িয়ে আছে তা কয়েক দিনে ভেঙে ফেলা যাবে না। তিনি ১৫টি সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১-এ যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ করেছেন, যারাই মৌলবাদী জঙ্গিদের গডফাদার, তাদের বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে সম্ভব হলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে শাস্তি কার্যকর করা হোক। জঙ্গিদের অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে সরকারের যা কিছু জানা আছে, তা অতি দ্রুত গণমাধ্যমে প্রকাশ-প্রচার করা। জঙ্গি অর্থায়নের উৎসমুখ বন্ধ করা। মৌলবাদের অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট (শিল্প, সংস্কৃতি, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশনসহ) প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের তৃতীয়পক্ষীয় অডিটের মাধ্যমে জামায়াত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে— জাতীয়করণ, বাজেয়াপ্তকরণ, আইনি হস্তান্তর, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, পর্ষদ পরিবর্তন ইত্যাদি। জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দিয়ে তিনি তার সুপারিশে বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী গোয়েন্দা নজরদারি সিস্টেম অনেক বেশি তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর এবং দ্রুত ফলপ্রদ ও কার্যকর করার জন্য সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সরকারের জঙ্গি দমন ও ধৃত জঙ্গিদের মধ্যে জঙ্গি-বিরোধী সচেতনতা-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ফলপ্রদতার সঙ্গে পরিচালন করা দরকার। জঙ্গিদের অস্ত্রের উৎসমুখ বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যেই যারা জঙ্গিত্ব-প্রমোটার তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকার থেকে তাদের বহিষ্কার করা। পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করা প্রয়োজন। ড. বারকাত বলেন, ধর্মীয় জঙ্গিদের প্রকৃত চেহারা-লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উন্মোচনে গণসচেতনতা বৃদ্ধি-সহায়ক সিরিয়াস প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড করা যাতে জনগণই জঙ্গি নির্মূল প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। গণসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণামূলক এই কর্মকাণ্ডে সব ধরনের পথ-পদ্ধতি-মাধ্যম ব্যবহার করা প্রয়োজন। তবে সঙ্গত কারণে জুমার নামাজ হয়, এমন মসজিদে জুমার খুতবার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মোট ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৪০টি জুমা-মসজিদে গড়ে প্রতি সপ্তাহে জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করেন ২ কোটি ৬৪ লাখ মুসল্লি, যারা আবার বাড়িতে ফিরে মোট ১০ কোটি ৪৪ লাখ ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তাই সমগ্র শিক্ষা-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য সেবা প্রদান কর্মসূচিকে দেশের সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করে সংস্কার সাধন ও তা কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow