Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪৫
আগুন নেভাতে হিমশিম
খায়রুল ইসলাম ও আফজাল হোসেন, টঙ্গী থেকে
আগুন নেভাতে হিমশিম

রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে টঙ্গীর ট্যাম্পাকো ফয়েলস কারখানার প্রাণঘাতী আগুন নেভাতে। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না আগুনের লেলিহান শিখা। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা লেগে গেছে আগুন নেভাতে। এর মধ্যেই কমপক্ষে ৩১ প্রাণ ঝরেছে। শঙ্কা আছে এ সংখ্যা আরও বাড়ার। ঘটনার দিন শনিবার ভোর পৌনে ৬টায় গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক ট্যাম্পাকো প্যাকেজিং কারখানায় অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। শনিবার সারা দিন আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ট্যাম্পাকো কারখানার চার তলা ভবনের পাশের আরেকটি পাঁচ তলা ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রাতভর লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ায় টঙ্গীতে আতঙ্ক বিরাজ করে। শনিবার ও গতকাল সকালে প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে ওই কারখানায় আগুন কিছুটা কমতে শুরু করে। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের চেষ্টায় ৩৫ ঘণ্টা পর গতকাল বিকাল ৫টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর শুরু হয় উদ্ধার কার্যক্রম।

এতে সেনাবাহিনীও অংশগ্রহণ করে। রাত ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে পৌঁছায়। অনেকেই সারা রাত নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে কারখানার পাশে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। কখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আসবে এই প্রতীক্ষায় ছটফট করেছেন। বিলাপ      করে কেউ বলছেন ‘আমার স্বামী কই’, আবার কেউ বলছেন ‘আমার ভাই কই’। কারখানার    চারপাশ ঘিরে অবস্থান নেওয়া নিখোঁজদের স্বজনরা একটু পরপর চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিন শিফটে ওই কারখানাটি চলে। ৮ ঘণ্টা শিফট হিসাবে প্রতি শিফটে ১২০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া জেনারেল শিফটে কাজ করেন আরও শতাধিক। ঘটনার দিন রাতে ‘সি’ শিফট কাজ করছিল, আর ‘এ’ শিফট ভিতরে প্রবেশ শুরু করে। কিছু কিছু শ্রমিক বের হতে শুরু করেন আবার কেউ কেউ ভিতরে ঢুকতে থাকেন। এমন সময় ঘটে মর্মন্তুদ এ ঘটনা। এরই মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। পুলিশ কারখানার চারপাশে অবস্থান নিয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের ছবি হাতে কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে আহাজারি করছেন। গতকাল আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিকাল সোয়া ৫টায় গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলমের উপস্থিতিতে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আরও চারটি লাশ উদ্ধার করেন কর্মীরা। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১-এ। অভিযানকালে মিডিয়াকর্মীদের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় কারখানা মালিক বিএনপি সমর্থিত সাবেক এমপি মো. মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের এমপি জাহিদ আহসান রাসেল, শিল্প সচিব মোশারফ হোসেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ, বিসিক চেয়ারম্যান হযরত আলী, গাজীপুর সিভিল সার্জন আলী হায়দার।

টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. পারভেজ হোসেন জানান, ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতালে ১৯টি মৃতদেহ আনা হয়। এর মধ্যে ১৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ভেংগুলা গ্রামের কৃষ্ণপ্রসাদের ছেলে সুভাষচন্দ্র প্রসাদ, ভোলার দৌলতখান উপজেলার জবুল হকের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, একই উপজেলার লেজপাড়া গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মাইন উদ্দিন (৩৫), ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কাকচুর গ্রামের আরশাদ আলীর ছেলে রফিক, একই জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা গ্রামের আজিম উদ্দিনের ছেলে আবদুর রাশেদ (২৫), চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার রুহিতারপাড় গ্রামের মৃত খালেক মাস্টারের ছেলে আবদুল হান্নান, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মানিককাজী গ্রামের নিজাম উদ্দিনের ছেলে ইদ্রিস আলী (৪০), ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বড়বাহা গ্রামের মৃত নবদীপ দাসের ছেলে গোপাল দাস (২৫), একই উপজেলার চরমানপুর গ্রামের নিতাই সরকারের ছেলে শংকর সরকার, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার পশ্চিম ফুলঝুরি গ্রামের মৃত ইনজাম উদ্দিন আজাদের ছেলে আল মামুন (৪০), সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার সুন্দিসাই গ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে এনামুল হক (৩৮), একই গ্রামের তানজিদ আলীর ছেলে সাইদুর রহমান (৫০), কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার আস্তাফলা গ্রামের করিম বক্সের ছেলে সোলায়মান (৩৫), টাঙ্গাইল সদরের মধুপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আনিছুর রহমান (৫০), একই এলাকার মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে ওয়ালি হোসেন (৩৫) ও মৃত মচর আলীর ছেলে হাসান সিদ্দিকী (৫০), চট্টগ্রামের সন্দীপ উপজেলার মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে মামুন ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার পমদশপ্যানপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে রেজিনা। অন্যজন অজ্ঞাত।

এখনো নিখোঁজ কমপক্ষে ১১ : ঘটনার পর নিখোঁজ শ্রমিকের খোঁজে স্বজনরা কারখানা গেট এমনকি হাসপাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ ছবি, কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র, আবার কেউ অফিস আইডি কার্ড নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘুরছেন। কথা হয় ওই কারখানার ম্যাকিং অপারেটর মুরাদের বাবা আবু তাহেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে অফিসে যায় মুরাদ। সকালে সে বাসায় ফেরেনি। পরে খবর পেলাম কারখানায় আগুন লেগেছে। এরপর কারখানায় আমরা ছুটে আসি। এসে মুরাদের কোনো খোঁজ পাইনি। এমনকি কোথাও তার লাশ পাইনি। আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি।’ এদিকে নিখোঁজ আনিসুর রহমানের বড় ভাই শাহজালাল বলেন, ‘ভাই! সকাল থেকেই ছোট ভাইকে বিভিন্ন স্থানে তন্নতন্ন করে খুঁজছি। কোথাও পাইনি। ভাই, আমার ভাইকে কোথায় পাই? আমার ভাইয়ের লাশ কোথায় আছে জানেন?’ অন্যদিকে প্রিন্টিং অপারেটর জহিরুল ইসলামের স্বজন আলাউদ্দিন বলেন, ‘ভাই! গতকাল সকালে ফজর নামাজ শেষে কারখানায় যায়। এরপর থেকে তার আর খোঁজ নেই।’ এ ছাড়া নিখোঁজ ইসমাইলের খোঁজে ছবি হাতে কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার দুই ভাই ও দুই শিশু সন্তান। ইসমাইলের বড় ভাই মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘ইসমাইল ১৪ বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করে। শনিবার আগুন লাগার পরপরই খোঁজাখুঁজি করি। তাকে আমরা পাইনি। কোনো খোঁজও পাচ্ছি না। বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক কোথাও তার সন্ধান পাইনি। যেহেতু সে বাইরে অন্য কোনো জায়গায় নেই, সে ক্ষেত্রে আমার ধারণা আমার ছোট ভাই কারখানার ভিতরেই আছে। আমার ভাতিজা এই কারখানায় চাকরি করে। সেও বলেছে সে এখানেই আছেন। আমার ভাতিজা পাঁচ মিনিট পড়ে ঢুকেছে, যখন সে ঢুকতে চেষ্টা করেছে তখনই ভবন ভেঙে পড়েছে। আমার ভাই শনিবার সকালে কারখানায় একটু আগে ঢুকে গিয়েছিল। আমাদের আকুল আবেদন— তার চারটি মেয়ে যেন ক্ষতিপূরণ পায় এবং সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তাদের বেঁচে থাকার যে তাগিদ তা যেন তারা দেখেন। সেই সঙ্গে যাদের কারণে ভাইকে হারিয়েছি তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করেন।’

গতকাল পর্যন্ত ১১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানা গেছে। ওই কারখানার পাশে জেলা প্রশাসন স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে দুপুরে এ তথ্য জানানো হয়। নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্যানুযায়ী নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন মমতাজ আলীর ছেলে ইসমাইল হোসেন (৪৩), দিলীপের ছেলে রাজে বাবু (২২), মোজা মোল্লার ছেলে চুন্নু মিয়া (২২), আবু তাহেরের ছেলে রিয়াদ হোসেন (২২), ছালেক মোল্লার ছেলে আজিম উদ্দিন (৩৫), আব্বাসের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৩৪), তোফাজ্জলের ছেলে মাসুম আহমেদ (২৮), খালেকের ছেলে কাজিমুদ্দিন (৩৬), আবুল হোসেনের ছেলে জহিরুল (৩৭), সুলতান গাজীর ছেলে আনিসুর রহমান, ইউনুসের ছেলে নাসির উদ্দিন।

সঠিক তদন্ত চান ড. কামাল : টঙ্গীর ট্যাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় সঠিক ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি গতকাল দুপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করে বলেন, ‘তদন্তে আমরাও ভূমিকা রাখব। এজন্য সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। এজন্য মিল মালিকের বক্তব্য নিতে হবে। বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের বক্তব্য নিতে হবে।’

up-arrow