Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪৭
দাহ্য কেমিক্যালে নিয়ন্ত্রণ নেই, শুধুই অব্যবস্থাপনা
রুহুল আমিন রাসেল

গাজীপুরের টঙ্গীতে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর জন্য প্লাস্টিক প্যাকেজিং পণ্য তৈরির কারখানা ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডে বয়লার বিস্ফোরণ এবং ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু লোকের প্রাণহানি আবারও প্রমাণ করল দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ নেই ব্যবসায়ীদের। খোদ সরকারও বলছে, এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ওই কারখানাটিকে বলা হয়েছিল কেমিক্যালগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় রাখতে। সেটি না করে ট্যাম্পাকোর রাসায়নিক পদার্থ দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবহারে অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠেছে কারাখানার ভবন ধসে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, দাহ্য কেমিক্যালের গুদাম থেকে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকেও শিক্ষা নেননি ব্যবসায়ীরা।  বিসিক শিল্পনগরীতে সিলেট-৬ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী সৈয়দ মকবুল হোসেনের মালিকানাধীন ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ট্যাম্পাকো ফয়লস লিমিটেডে গতকাল সকাল ৬টায় কারখানাটির বয়লার বিস্ফোরণ থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে ভবন ধসে যাওয়ার তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামান। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেছেন, ওই প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় মালিকের নামে মামলা করা হবে।

তবে বয়লার বিস্ফোরণের বিষয়টি মানতে নারাজ শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের বয়লার পরিদর্শক মো. শরাফত আলী। তিনি গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বয়লার বিস্ফোরণ হয়েছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বয়লারে যে রুম থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, সেখান থেকে ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। কারণ দুর্ঘটনা ঘটেছে সকাল ৬টায়। আর বয়লার বন্ধ করা হয়েছে রাত ৪টায়। সনদপ্রাপ্ত যে দুজন ব্যক্তি বয়লার চালান, তারাও জীবিত। গত বছর রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরের দুটি দুর্ঘটনার সময়ও বলা হয়েছিল— বয়লার বিস্ফোরণের কথা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তে দেখা গেল— বয়লার বিস্ফোরণ হয়নি। ট্যাম্পাকোর বয়লার চলতি বছরের ১৯ জুন পুনঃ পরীক্ষা করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ওই বয়লারের মেয়াদ আগামী ২০১৭ সালের ১৮ জুন পর্যন্ত। ওই কারখানার বয়লার নম্বর হলো— ১২৫৮। তবে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিয়েছে কারখানার ভিতরে মজুদ থাকা বিপুল পরিমাণের দাহ্য কেমিক্যাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, যারা এ ধরনের কেমিক্যাল র?াখেন, তাদের বলে দেওয়া হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থায় রাখার জন্য। যাতে এমন দুর্ঘটনা না ঘটে। আগে থেকেই তাদের বলা হয়েছিল, কেমিক্যালগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় রাখার জন্য। তিনি বলেন, যেহেতু এত মানুষ মারা গেছে, তাই এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তের পরে বলা যাবে কোন কোন ধারায় মামলা হবে।

প্লাস্টিক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন-বিপিজিএমইএর সদস্য ট্যাম্পাকো ফয়লস লিমিটেড। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ট্যাম্পাকোর কারখানায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির মতো দেশি-বিদেশি বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজিং পণ্য তৈরি করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বিপিজিএমইএ সাবেক সভাপতি ফেরদৌস ওয়াহেদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি জানতে পেরেছি— ট্যাম্পাকোর কারখানায় বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মেশিনারিজ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আধুনিক কম্পলায়েন্স কারখানা হওয়ার কারণেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাজ করতে পারে। তারপরও এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কারখানার ভিতরে থাকা দাহ্য কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 

জানা গেছে, রাসায়নিক পর্দাথ দাহ্য কেমিক্যাল গুদাম ও সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে মাঝে-মধ্যেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ২০১০ সালের মে মাসে পুরান ঢাকার নিমতলীর আগামাসি লেনে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৪০টি উচ্চমাত্রার দাহ্য কেমিক্যাল তদারকি করবে বিস্ফোরক অধিদফতর। গতকাল ট্যাম্পাকোর কারখানায় এ দুর্ঘটনার আগে টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীতে দাহ্য কেমিক্যাল ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের তদারকি করা হয়েছে, তাও এখন দেখার বিষয়।

তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরক অধিদফতরের যে ২০ ধরনের দাহ্য কেমিক্যালকে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, জনবসতির জন্য ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক এমন তরল পদার্থগুলো হলো— অ্যাসিটোন, বিউটাইল অ্যাসিটেট/এন-বিউটাইল অ্যাসিটেট, আইসো-বিউটানল, ডিএল-২৫৭৫ (চামড়া বা অনুরূপ শিল্পে ব্যবহৃত), ইথাইল অ্যসিটেট, ইথানল, হেভি অ্যারোমেটিক, আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহল, মিথানল, বিউটানোন (মিথাইল ইথাইল কিটোন), ৪-মিথাইলপেনটেন-২ ওয়ান, এন-প্রোফাইল অ্যাসিটেট, প্রোপেন-১-অল, ফ্লেক্সো গ্রাভিওর, টলুইন, থিনার-বি, রিডিউসার/রিটার্ডার অর্গানিক কমপোজিট সলভেন্ট অন্ড থিনার, জাইলিন/ মিক্সড জাইলিন, ডাই অ্যাসিটোন অ্যালকোহল।

এর আগে ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডিতে নিহত হন শতাধিক মানুষ। রাসায়নিক পদার্থ দাহ্য কেমিক্যালে সংঘটিত ওই অগ্নিকাণ্ডের পর তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেছিলেন— মৃত্যুপুরী কেমিক্যাল গুদাম সরানোর প্রক্রিয়া চলছে। এরপর চলে গেছে পাঁচ বছরের অধিক সময়। তবুও পুরান ঢাকা থেকে সরেনি কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের গুদাম। ফলে আজও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের মরণফাঁদে বিপন্ন পুরান ঢাকার মানুষের জীবন। এখন তাদের প্রশ্ন— আর কত দিন দাহ্য কেমিক্যালের মৃত্যু উপত্যকায় বসবাস করতে হবে? আর দাহ্য কেমিক্যাল গুদাম থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনো বহন করছে নিমতলীর মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশ পেইন্ট ডাইং অ্যান্ড কেমিক্যাল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০ ধরনের দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবসা করেন পুরান ঢাকার প্রায় এক হাজার ব্যবসায়ী।

up-arrow