Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৫
টার্গেট জিয়া মারজান শিলা
আজিমপুরে নিহত করিম স্ত্রীসহ নিখোঁজ ছিলেন
মির্জা মেহেদী তমাল
টার্গেট জিয়া মারজান শিলা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টার্গেটে এখন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া ও নুরুল ইসলাম মারজান। এ ছাড়া নারী জঙ্গিদের মধ্যে টার্গেটে রয়েছেন মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা। তালিকায় আরও বেশ কয়েকজন জঙ্গির নাম থাকলেও এ তিনজনকে ঘিরেই যত চিন্তা এখন গোয়েন্দাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এদের গ্রেফতার করতে না পারলে জঙ্গি নেটওয়ার্ক তছনছ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে স্ত্রী-সন্তানসহ বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তানভীর কাদেরী ওরফে আবদুল করিম। পরে আজিমপুর অভিযানে নিহত হন কাদেরী। তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা আহত অবস্থায় এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই সঙ্গে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন নব্যধারা জেএমবির শীর্ষ নেতা নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি (২৫) এবং আরেক জঙ্গি নেতা জামান ওরফে বাসারুজ্জামানের স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৩)। পুলিশ প্রহরায় সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্র জানায়, জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরীর নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লেও জঙ্গি মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়া ও মারজানের নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ অভিযানে তামিম আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার পর তার আরও দুই শীর্ষ সহযোগী জঙ্গি মেজর (অব.) জাহিদ মিরপুরে ও করিম আজিমপুরের অভিযানে নিহত হন। এ ছাড়া কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জ অভিযানে তামিমের নীতিনির্ধারক আরও কয়েক সহযোগী নিহত হন। এতে তামিমের ‘চ্যাপ্টার’ শেষ বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা জঙ্গি মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ও মারজান এখনো ধরা পড়েননি। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা এখনো চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর তার স্থানে এখন মারজান রয়েছেন। তিনি জঙ্গি নেটওয়ার্ক সচল রাখছেন। সূত্র জানায়, আজিমপুর অভিযানে তার স্ত্রী প্রিয়তি গ্রেফতার হওয়ায় মারজানও ধরা পড়বেন বলে আশা গোয়েন্দাদের। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘তামিম ও তার দুই শীর্ষ সহযোগী পুলিশের অভিযানে নিহত হওয়ায় পুরোপুরি না হলেও জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পেরেছি। তবে জঙ্গি মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়া, মারজানসহ তামিমের অন্য সহযোগীদের ধরতে পারলে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।’

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গুলশান হামলার পর চারটি অভিযানেই তামিমের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ১৩ সহযোগী নিহত হন। তামিমের আরেক শীর্ষ সহযোগী নুরুল ইসলাম মারজানসহ আরও এক ডজনের বেশি সহযোগীকে ধরতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে আবু সুলেমানসহ তামিমের কয়েকজন সহযোগী ভারতে অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মুছার কাছ থেকে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তামিমের অনেক সহযোগীর নাম জানতে পেরেছেন। এ ছাড়াও শরিফুল ইসলাম খালিদ, মামুনুর রশিদ রিপন, ওয়াসিম আজওয়াদ আবদুল্লাহ ওরফে আসিফ আজওয়াদ, আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙ্গালী, রাজীব, মানিক, ইব্রাহিম হাসান খান ও তার ভাই জুনায়েদ খান, রাহুলসহ তামিমের আরও কিছু সহযোগী দেশেই অবস্থান করছেন বলে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে সূত্র জানায়। সূত্র জানায়, আজিমপুর অভিযানে তামিম গ্রুপের তিন শীর্ষ জঙ্গির স্ত্রী ও সন্তানদের ধরা সম্ভব হয়েছে। যাদের মধ্যে মারজানের স্ত্রী প্রিয়তিও রয়েছেন। করিমকে জীবিত ধরা না গেলেও তার স্ত্রী শারমিন ও ১৪ বছর বয়সী ছেলে তাহরিম কাদেরী ওরফে রাসেলকে আটক করেছে পুলিশ। একই অভিযানে তামিমের আরেক সহযোগী জঙ্গি বাশারুল্লাহ ওরফে চকলেট ওরফে রাহুলকে ধরা না গেলেও তার স্ত্রী শায়লা আফরিনকে শিশু কন্যাসহ আটক করা হয়েছে। তবে ওই বাসা থেকে সন্তানসহ পালিয়ে যেতে সমর্থ হন মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা। তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। জঙ্গি দমনে গঠিত পুলিশের বিশেষায়িত টিম কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা মনে করেন, তামিম ও তার শীর্ষ কয়েকজন সহযোগী নিহত হওয়ার কারণে জঙ্গিদের নাশকতা ও হামলা থেকে দেশ হয়েছে ঝুঁকিমুক্ত এবং মানুষ হয়েছে নিরাপদ। কিন্তু তামিম চৌধুরী ও মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়ার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি না ভাঙা পর্যন্ত তারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। তামিমের নেটওয়ার্ক তছনছ করা সম্ভব হলেও জঙ্গি জিয়ার নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। জিয়াকে ধরা সম্ভব হলে তার নেটওয়ার্কও দ্রুত ভেঙে ফেলা সম্ভব হতো।

সপরিবারে নিখোঁজ ছিলেন করিম : মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে সপরিবারে নিখোঁজ ছিলেন আজিমপুরে নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরী। গত এপ্রিলে তিনি উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তাদের খোঁজ মেলেনি। তবে নিখোঁজের তিন মাস পরে আগস্টে বিজিবির ২ নম্বর গেটসংলগ্ন আজিমপুরের ২০৯/৫ নম্বরের ছয় তলা বাড়িটির দোতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন আবদুল করিম ওরফে জামসেদ ওরফে সামশেদ হোসেন ওরফে তানভীর কাদেরী। বাড়িটি ভাড়া নেওয়ার সময় তিনি নিজেকে জামসেদ পরিচয় দেন। ওই নামে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রও জমা দেন। ঈদের দুই দিন আগে আজিমপুরের আস্তানায় পুলিশি অভিযানের সময় কাদেরী আত্মহত্যা করেন। পুলিশ জানায়, তার লাশ দেখে কাদেরী বলে শনাক্ত করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। তবে শনাক্ত করলেও লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তারা। নিহত এই জঙ্গির গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার পশ্চিম বাটিকামারি। অথচ গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে বলে আজিমপুরের ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন জঙ্গি কাদেরী। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এডিসি ছানোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের ধারণা কাদেরীর দুই সন্তানের মধ্যে একজন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তদন্তকারীদের গোলক-ধাঁধায় ফেলার চেষ্টা করছে। উত্তরা মাইলস্টোন স্কুলের ছাত্র ১৪ বছরের আফিফ কাদেরী আদর ও তার ভাই ১৫ বছরের আবিরও জঙ্গি তত্পরতায় জড়িয়ে থাকতে পারে।’

কঠোর নিরাপত্তায় চিকিৎসা : আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতার তিন নারী জঙ্গিই তিন শীর্ষ জঙ্গির স্ত্রী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের বিস্তারিত পরিচয় উদ্ধার করেছেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেফতার তিন নারী জঙ্গি একে অন্যের পূর্বপরিচিত। একজন বাদে বাকিরা উচ্চশিক্ষিত। তিনজনই স্বামীর হাত ধরে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। এ ছাড়া মিরপুর রূপনগরে নিহত জঙ্গি জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী পলাতক জেবুন্নাহার শিলাকে খুঁজছেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা। আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার তিন নারী জঙ্গিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় ওই জঙ্গিরা অঘটন ঘটাতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই আশঙ্কা থেকেই তাদের কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখনো পরিবারের কেউ ওই তিন নারীর খোঁজ নিতে আসেননি বলেও জানিয়েছেন তারা। শনিবার সন্ধ্যার পর আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযান চালাতে গেলে ভিতরে থাকা নারী জঙ্গিরা পুলিশকে ছুরিকাঘাত ও মরিচের গুঁড়া মেরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের আটক করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই রাত সোয়া ৮টার দিকে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে চিকিৎসা দেওয়া হয় জরুরি বিভাগে। অপারেশন শেষে সেদিনই কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। তবে জেবুন্নাহার নামের নারী জঙ্গির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে চিকিৎসকদের অবজারভেশনে রাখা হয় জরুরি বিভাগের অস্ত্রোপচার কক্ষে। কেবিনে ওই জঙ্গিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ওই তিন নারী জঙ্গি নব্যধারা জেএমবির আত্মঘাতী সদস্য। শনিবার পুলিশের অভিযানের সময় তারা নিজেরা আত্মাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও যেন কোনো ধরনের অঘটন ঘটাতে না পারেন, সেজন্য পুলিশের নারী সদস্যরা সব সময় তাদের সঙ্গে রয়েছেন।’

up-arrow