Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৯
দুর্ঘটনা রোধে তত্পর নন দায়িত্বপ্রাপ্তরা
জিন্নাতুন নূর
দুর্ঘটনা রোধে তত্পর নন দায়িত্বপ্রাপ্তরা
ইলিয়াস কাঞ্চন

বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে আগের তুলনায় দুর্ঘটনা কমেছে কিন্তু ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাড়ি চালকরাও ঈদের ছুটির আগে এবং পরে বেশি ট্রিপের আশায় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান। তারা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়েই গাড়ি চালানোর কারণে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া এবার মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা কম ছিল। ধারণা করছি দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের নিজ দায়িত্ব পালন না করে ঈদ উৎসব পালনে ব্যস্ত ছিলেন। সে কারণে এবারও ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এসব কথা বলেন।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে বিপুল পরিমাণ মানুষ তাদের পরিবারের কাছে গ্রামের বাড়িতে যান। আর অতিরিক্ত মানুষের চাপে মহাসড়কগুলোতে যান চলাচলও বেশি হয়। যা মহাসড়কে দুর্ঘটনার বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ। অন্যদিকে যানবাহনের মালিক ও সংশ্লিষ্টরা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় নিয়ম ভঙ্গ করে ঈদের সময় মহাসড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি নামান। অথচ এই দুর্ঘটনা রোধে সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থাপনা আমাদের নেই। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে পর্যাপ্ত বাস সার্ভিসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ট্রেন সার্ভিসেরও ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ট্রেন যাত্রীদের সেবা সে অর্থে বৃদ্ধি করা হয়নি। এমনকি আগের চেয়ে ট্রেনের লাইনও কমে এসেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ঈদের ছুটিতে মানুষ যেমন তার শেকড়ের টানে গ্রামের বাড়িতে যান সেভাবেই মানুষ সৌদি আরবে হজ পালন করার উদ্দেশে যান। কিন্তু সৌদিতে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ সামলানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকে, যা বাংলাদেশে নেই। অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো শুধু ঈদের ছুটির জন্য বাংলাদেশে ঘরফেরত মানুষের জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করাও সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না। সৌদিতে রাস্তার পাশে কোনো অবকাঠামো নেই। অথচ আমাদের মহাসড়কগুলোর দুই পাশেই মানুষের ঘর-বাড়ি, দোকানপাটসহ অর্থনৈতিক নানারকম স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নসিমন, করিমন ও ইজিবাইকের মতো যানবাহন। যা মহাসড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আমি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা ৩০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুশ্চিন্তা করছি, সে সময় সংশ্লিষ্টরা এত বিপুল পরিমাণ মানুষের চাপ কীভাবে সামলাবেন। এ জন্য অন্তত ১০ বছর আগ থেকেই পরিকল্পনা নিতে হবে।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঈদের দুর্ঘটনার জন্য ইজিবাইকসহ তিন চাকার যানগুলোকে দায়ী করেছেন। কিন্তু মানুষের চলাচলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করে এসব যান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, এ জন্য মহাসড়ক তৈরির সময় সড়কের পাশে একটু নিচে আলাদা জায়গায় ছোট যান চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এর ফলে ছোট যানবাহনের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটা কমে যাবে।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এবার ঈদের ছুটিতে যে সড়ক দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে আমি নিয়মিত তা পর্যবেক্ষণ করেছি। মূলত বৃহস্পতিবার ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মহাসড়কগুলোতে ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। আর সেদিনই সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। লক্ষ্য করেছি এবার মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা কম ছিল। বিশেষ করে ঈদে মিরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় এক বৃদ্ধ দম্পতির প্রাণ হারানোর বিষয়টি ছিল দুঃখজনক। একদল যুবক নেশা করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটায়। যারা নেশা করে এই জঘন্য কাজটি করেছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তা না হলে এমন দুর্ঘটনা চলতেই থাকবে। একই সঙ্গে ঈদের সময় গাড়িচালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে তবেই পরবর্তী ট্রিপে গাড়ি চালানো উচিত। তা না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। মহাসড়কগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম ভেঙে গাড়ি চালানোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটছে। এ জন্য চালকদের দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গতিহীন অবস্থায় গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছে। মানুষের জীবন এখন এতই মূল্যহীন হয়ে গিয়েছে যে, পেছন থেকে আসা যানবাহনগুলোর মালিকরা এখন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।

এই চলচ্চিত্র অভিনেতা আরও বলেন, আমরা জানতাম যে, ঈদের তিন দিন আগে ও তিন দিন পরে মহাসড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকে। কিন্তু এবার এই সময়ে ট্রাকের সঙ্গে অন্য বাহনের সংঘর্ষে দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ এই বিষয়টির নজরদারি হয়নি বলেই ট্রাকের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এই ঈদেও বেশ কিছু সড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ ছিল। ফেরিঘাটগুলোরও সংস্কার করা হয়নি। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সংশ্লিষ্টদের এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। আর এ বিষয়ে যাদের নজরদারি করার কথা ছিল তাদের দায়িত্ব অবহেলার জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

up-arrow