Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫২
অবশেষে এমপিপুত্র রুমন গ্রেফতার
মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা
অবশেষে এমপিপুত্র রুমন গ্রেফতার
সাতক্ষীরায় এমপি রিফাত আমিনের ছেলে রুমনকে গতকাল গ্রেফতার করা হয় —বাংলাদেশ প্রতিদিন

সেই বেপরোয়া এমপিপুত্র রাশেদ সরোয়ার রুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে শহরের চৌরঙ্গী মোড়ের একটি ভাড়া বাড়ি থেকে বিশেষ গোয়েন্দা শাখার (বিডি) পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার চেষ্টা ও চাঁদাবাজির দুটি মামলায় সাতক্ষীরার বহুল আলোচিত সংরক্ষিত নারী আসন ৩১২-এর সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিনের পুত্র রুমনকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ হোসেন মোল্যা জানান, রুমন একটি মাইক্রোবাসযোগে সাতক্ষীরা থেকে যশোরের উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শহরের চৌরঙ্গী মোড়ের জনৈক মিজানুর রহমানের ভাড়া বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। এ সময় তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ নেতা জুলফিকার আলী উজ্জ্বলের দায়ের করা হত্যাচেষ্টা ও বিসেরপোতার পদ্দা হ্যাচারির মালিক ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বুলেটের দায়ের করা চাঁদাবাজির দুটি মামলায় রুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা পৌরসভা চত্বরে জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য জুলফিকার রহমান উজ্জ্বলকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে মারপিট করেন সন্ত্রাসী রুমন ও তার সহযোগীরা। অভিযোগ ছিল সাতক্ষীরা এলজিইডির টেন্ডার আয়ত্তে নিয়ে অর্জিত মোটা অঙ্কের কয়েক লাখ টাকার ভাগাভাগিতে অসন্তোষের জের ধরে এই মারপিটের ঘটনা ঘটে। হামলার সময় ঠেকাতে গিয়ে আহত হন উজ্জ্বলের সহযোগী মিলন, কালাম, ফারুক ও সালামসহ কয়েকজন। তাদের সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার পরদিন সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলা হলেও পুলিশ রুমন ও তার সহযোগীকে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হন। এর ঠিক ঘণ্টা খানেক সময় পেরিয়ে ওই রাতেই এমপি রিফাত আমিনের পুত্র রুমন মদ্যপান অবস্থায় তার মায়ের সংসদের স্টিকার যুক্ত বিলাশ বহুল পাজারো গাড়ি নিয়ে সাতক্ষীরার ভোমরায় সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হন। তাকে নিয়ে আবারও শুরু হয়ে যায় হৈচৈ। এতে তিনি অক্ষত থাকলেও গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। বিধ্বস্ত অবস্থায় গাড়িটি ফেলে তিনি আরেকটি গাড়ি নিয়ে চলে আসেন শহরতলির মাগুরায় এক সোনা চোরাকারবারির বাগানবাড়িতে। অপরিচিত এক নারীকে নিয়ে রাত কাটানোর পর ১২ সেপ্টেম্বর সকালে রুমনের অবস্থান সম্পর্কে জানাজানি হলে আগের দিনের যুবলীগ নেতাকে মারপিটকারী হিসেবে গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ফেলেন। এক পর্যায়ে জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল মান্নান, অ্যাড. তামিম আহমেদ সোহাগ এবং পৌর যুবলীগ আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন অনু তাকে উদ্ধার করতে যান। এ সময় গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন এমপিপুত্র রুমন ও তার প্রেমিকা। এদিকে এদিন রাত আটটায় রুমন নিজে ও তার মা নারী সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিন মিলন পালের মাগুরার তালাবদ্ধ বাগানবাড়িতে ঢোকার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গেট ভাঙচুর করেন। কিন্তু তারপরও বাড়িতে ঢুকতে না পেরে ফিরে আসতে হয় তাকে। পরদিন মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে সবাই যখন ঈদ জামাত নিয়ে ব্যস্ত তখন সংসদ সদস্য রিফাত আমিন ও তার ছেলে ফের নিজস্ব বাহিনী নিয়ে এসপি ও ওসির নাম ভাঙিয়ে অভিযান চালান মিলন পালের বাগানবাড়িতে। তারা তালা ভেঙে গেট খুলে বাড়িতে রাখা সংসদ সদস্যের নামে লাইসেন্সকৃত একটি পিস্তল ও গুলি বের করে আনেন। পিস্তলটি রবিবার রাতে ভোমরা দুর্ঘটনার পর বাগানবাড়িতে নিয়ে রেখেছিলেন রুমন। এর আগে রুমনের কথিত স্ত্রী বেলী মিলনের লক করা এলিয়ান প্রাইভেটের গ্লাস ভেঙে ভিতর থেকে প্রচুর টাকা নিয়ে যান। এ ছাড়া কয়েকদিনের ব্যবধানে মিলন পালের বাড়ির খামারে ১৩টি বিদেশি জাতের মূল্যবান গরু লুট করেন রুমন। এমনকি মিলনকে ছাড়াতে ২০ লাখ টাকাও নিয়েছেন রুমন।   মিলনের স্ত্রী শম্পা রানী পাল এসব অভিযোগ করেন গণমাধ্যমের কাছে। তিনি আরও বলেন, মিলন পাল ১৬ কেজি সোনা চোরাচালান মামলায় জেলে আটক রয়েছেন। এই সুযোগে তার সম্পদ লুটপাট করার পাঁয়তারা করছেন রুমন ও তার মা সংসদ সদস্য রিফাত আমিন। এদিকে মঙ্গলবার ঈদের দিন রুমন তার এক বন্ধুকে সাতক্ষীরা কারা ফটকে পাঠান। আটক মিলন পালের কাছ থেকে ২৫০ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরের জন্য। কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে তা ব্যাহত হয়। কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পেরে সাদা স্ট্যাম্পগুলো জব্দ করেন। এর আগে রুমন সাতক্ষীরার সোনা চোরাকারবারি মিলন পালের পক্ষে গত রমজান মাসে সাহেব আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করেন। এর কিছুদিন আগে তার মায়ের ব্যবহূত জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়িসহ শ্যামনগরের বর্ষা রিসোর্টের ১০৪ নম্বর রুমে একই সঙ্গে তিন তরুণীকে নিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় শ্যামনগর থানার এএসআই লিটনসহ সঙ্গীয় ফোর্স তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ ওই সময় রুম থেকে এমপির ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্র ও ২০ রাউন্ডগুলো উদ্ধার করে। জব্দ করা হয় জাতীয় সংসদের স্টিকার যুক্ত গাড়িটিও। এ সময় সোনার ছেলে রুমনকে ছাড়াতে এমপি মা রিফাত আমিন নিজেই চলে যান পুলিশের কাছে। সেখানে দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশকে ধমকিয়ে চাপ সৃষ্টির পর নামমাত্র মোটরযান আইনের একটি মামলা দিয়ে পুলিশ তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করে।   অথচ তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের বিষয়ে পুলিশ মামলা না নেওয়ায় হতবাক হন সাতক্ষীরাবাসী। এরপর বেশ কিছুদিন জেলখেটে সম্প্রতি মুক্তির পর ফের শুরু করেন নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে টেন্ডারবাজি। বিগত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মধ্যে সংবাদপত্র বন্ধের কয়েকদিন এমপিপুত্র রুমনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডগুলো অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। এদিকে গতকাল দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘বেপরোয়া এমপিপুত্র’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। এর এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দুপুর দেড়টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে গ্রেফতার করে এমপিপুত্র রুমনকে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow