Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪৭
খবর নেই ৬৫০ কোটি টাকার
রিজার্ভ চুরির ১২০ কোটি টাকা ফেরত আসবে, সব অর্থ পাওয়ার আশা বাংলাদেশ ব্যাংকের
নিজস্ব প্রতিবেদক
খবর নেই ৬৫০ কোটি টাকার
ফিলিপাইনের জুয়াড়ি কিং অংয়ের কাছ থেকে চার মাস আগে উদ্ধার করা অর্থ

নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম (ফেড) থেকে চুরি হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি ডলার (১২০ কোটি টাকা) ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছে ফিলিপাইনের আদালত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফেড থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) সরিয়ে নেয় একটি হ্যাকার চক্র।

অথচ মাত্র দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েই তদন্ত কাজ আপাতত বন্ধ রেখেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খুব শিগগিরই দেশটির সিনেটে এ বিষয়ে আবারও শুনানি শুরু হবে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বাকি ৬৬ কোটি ডলারের (৬৫০ কোটি টাকা) হদিস মেলেনি আট মাসেও। তবে সে অর্থের আরও ২০ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পন্নকারী ফিলিপাইনের প্রতিষ্ঠান ফিলরিমের কাছে আছে বলে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ফিলরিম বলছে, তাদের হাতে সে ধরনের কোনো অর্থ নেই। সেটা তারা হংকং-এ পাঠিয়ে দিয়েছে।

এদিকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ী কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ফিলিপাইনের ব্যাংক আরসিবিসি বা ফেডের বিরুদ্ধে অর্থ উদ্ধারে কোনো মামলা করবে কিনা—সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে চুরি হওয়া অর্থের পুরোটাই কীভাবে ফেরত আনা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করতে আগামী ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের ফিলিপাইন সফর করার কথা রয়েছে।

হদিস নেই ৬৫০ কোটি টাকার : চুরি হওয়া রিজার্ভের মধ্যে দেড় কোটি ডলার ফেরত দিতে গতকাল ফিলিপাইনের আদালত নির্দেশ দিয়েছে ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। জানা যায়, এই অর্থের অধিকাংশই জুয়ার টেবিলে চলে গেছে। দীর্ঘদিন চেষ্টার পর মাত্র দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করেছে ফিলিপাইন। যা খুব শিগগিরই ফেরত পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ খবর জানিয়েছে গণমাধ্যমকে। উদ্ধার হওয়া এই অর্থ এখন বিএসপির ভল্টে রয়েছে। গত মে মাসে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির তদন্তের সময় এক ‘ক?্যাসিনো জাংকেট’ কিম অং এই দেড় কোটি ডলার ফেরত দেন। যদিও তার জুয়ার আখড়ায় বাংলাদেশের রিজার্ভের সাড়ে ৩ কোটি ডলার গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই অর্থ চীনা বংশোদ্ভুত ফিলিপাইনি ব্যবসায়ী কিম অং ফেরত দেবে বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া ফিলরিমের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৪৬ মিলিয়ন ডলার কোথায় আছে এর কোনো হদিস এখনো ফিলিপাইন বা ফেড কেউই জানে না। এই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা—সে বিষয়েও তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলছে না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুরি হওয়া অর্থের পুরোটাই ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ স্থানান্তরে জড়িত থাকার অপরাধে ফিলিপাইনের ব্যাংক আরসিবিসিকে গত জুনে ১০০ কোটি পেসো (স্থানীয় মুদ্রা) জরিমানা করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই অর্থ বাংলাদেশকে দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দেশটি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না।

৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বাকি অর্থ কোথায় গেছে, তার হদিস এখনো মেলেনি। ফিলিপাইন সরকার জুয়ার আখড়ার আরও আড়াই কোটি ডলার জব্দ করেছে। ওই অর্থের দাবি বাংলাদেশ করলেও তার সুরাহা হয়নি এখনো।

ফিলিপাইন যাচ্ছেন আইনমন্ত্রীসহ ছয়জন : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে এবং অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ফিলিপাইন যাচ্ছে। আগামী ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর এ সফরসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ সূচিতে সামান্য পরিবর্তনও আসতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কমিটির সদস্যরা হলেন— আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান ড. আবদুর রাজ্জাক, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. খোরশেদ আলম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব ইউনুসুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দফতরে এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছেন গত ৮ সেপ্টেম্বর। সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফেডারেল রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলারের পুরোটাই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য ফিলিপাইন সফরকালে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটি সে দেশের সিনেটের প্রেসিডেন্ট, ব্লু রেবন কমিটির চেয়ারম্যান, আইন ও পররাষ্ট্র বিভাগের সচিব, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, সে দেশে মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের প্রধান ও ফেডারেল রিজার্ভের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবেন। বৈঠকে এ ঘটনায় ফিলিপাইন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, মামলার অগ্রগতি ও চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরতের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া রিজার্ভ চুরির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কেও তাদের অবহিত করা হবে। সূত্র জানায়, চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে ফিলিপাইন ও সংশ্লিষ্টরা। তবে এক টাকাও এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। সেটা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেই ১৫ মিলিয়ন ডলার কবে নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জমা হবে এবং বাকি অর্থ ফেরত পেতে বাংলাদেশ আর কী পদক্ষেপ নিতে পারে সে ব্যাপারেও আলোচনা করবে উভয় পক্ষ। এক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ বা ফিলিপাইনের আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কিনা—সে বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে বলে জানা গেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আন্তর্জাতিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং সংস্থা এবং অ্যাগমন্ট গ্রুপের আইন ও চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের খোয়া যাওয়া অর্থের পুরোটাই আরসিবিসির কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে আদায় করে বাংলাদেশকে ফেরতও দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছিল ফিলিপাইন ও ফেডারেল রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করে, এই অর্থ দীর্ঘ সময় পর হলেও ফেরত পাবে বাংলাদেশ। কেননা আন্তর্জাতিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, দেশ বা প্রতিষ্ঠান ফেডারেল রিজার্ভকে ব্যবহার করে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান এক ডলার মানি লন্ডারিং করলে তার কাছ থেকে দ্বিগুণ হারে জরিমানা আদায় করা হবে। তবে সেটা তদন্ত এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

সব অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে : বাংলাদেশ ব্যাংক : ফিলিপাইনের আদালতের নির্দেশে রিজার্ভ চুরির একটি অংশ দ্রুত ফেরত পাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির আদালত উদ্ধারকৃত অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বাকি অর্থও আমরা ফেরত পাব। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানানো হয়। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের সহকারী মুখপাত্র মোকাম্মেল হোসেন, বিএফআইইউ জিএম দেবপ্রসাদ দেবনাথ ও ডিজিএম আনোয়ারুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে মোকাম্মেল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আদালত আমাদের সহযোগিতা করছে। চুরিকৃত ৮১ মিলিয়নের মধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের ব্যবসায়ী কিম অংয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই অর্থ ফিলিপাইনের আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফেরত পাবে। উদ্ধারকৃত অর্থ ফেরত দিতে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেশটির আদালত নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশের বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ফেরত পাবে। তিনি বলেন, চুরির বাকি অর্থও আমরা ফেরত পাব। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এ সময় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, ফিলিপাইন সরকারের কাছ থেকে টাকাটা অফিশিয়ালি যখন তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যাবে তখনই তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করবে। আর এ রায়ের মাধ্যমে এটা প্রতিষ্ঠিত হলো চুরি যাওয়া যে অর্থ ফিলিপাইনে গিয়েছে সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরবর্তী টাকাগুলো ফেরত আনার জন্য।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বৃহস্পতিবার : এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের করা তদন্ত প্রতিবেদন আগামী বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত সরকারি কমিটি ৩০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর দফতরে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এর আগে গত ২০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনায় দোষী বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের নভেম্বরে সুইফটের (সোসাইটি ফর ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) ভুয়া প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসা নিলা ভান্নান দুই কর্মকর্তার পাসওয়ার্ড নকল করে নেন। এই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সার্ভারের গোপন নোটবুকে থাকা ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমের সব কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। জমা দেওয়া ২৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনে সাত দফা সুপারিশ করেছে কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে, দোষী কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। শুক্র, শনিবার ছুটি বাতিল করা, অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগে নিয়োগের আগে কর্মকর্তাদের নীতি, নৈতিকতা এবং পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে নিয়োগ দেওয়া। পাশাপাশি ডিলিং রুমের কর্মকর্তাদের নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া। তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের পৃথকভাবে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর আগে ২০ এপ্রিল জমা দেওয়া অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনটি ছিল ২০ পৃষ্ঠার। এ ঘটনায় সুইফট কর্তৃপক্ষও তাদের দায় এড়াতে পারে না। তাদেরকেও দায় নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow