Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪৮
গুলশান হামলার অর্থ আসে হুন্ডিতে
জঙ্গি ইস্যুতে নতুন নাম রাজিব গান্ধী, জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়নি তাহিরমের
নিজস্ব প্রতিবেদক
গুলশান হামলার অর্থ আসে হুন্ডিতে
গুলশানের হলি আর্টিজান হোটেলে হামলা হয় গত ১ জুলাই

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, জঙ্গিদের অর্থায়নে টাকা আসে বিদেশ থেকে। এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে।

আর গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনায় অর্থ এবং অস্ত্র দুটোই দেশের বাইরে থেকে এসেছে। তিনি বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাসহ অস্ত্র কেনা, বাসা ভাড়া ছাড়াও অন্যান্য খরচ করতে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আসে। গতকাল মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে এটার যে লার্জার পিকচার আমরা তার পুরোটাই পেয়েছি। এর মধ্যে যারা হলি আর্টিজানে ঢুকেছিল কিংবা যারা বাইরে ছিল আমরা তাদের অনেককে চিহ্নিত করেছি। আমরা তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করেছি। এরাই পরবর্তী গ্রেফতার অভিযানে অনেকে নিহত হয়েছে। আমরা যদি গুলশান, শোলাকিয়া, কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জের ঘটনা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব চিহ্নিতদের মধ্যে কল্যাণপুরের    মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে এটার যে লার্জার পিকচার আমরা তার পুরোটাই পেয়েছি। এর মধ্যে যারা হলি আর্টিজানে ঢুকেছিল কিংবা যারা বাইরে ছিল আমরা তাদের অনেককে চিহ্নিত করেছি। আমরা তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করেছি। এরাই পরবর্তী গ্রেফতার অভিযানে অনেকে নিহত হয়েছে। আমরা যদি গুলশান, শোলাকিয়া, কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জের ঘটনা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব চিহ্নিতদের মধ্যে কল্যাণপুরের স্টর্ম-২৬ ও নারায়ণগঞ্জের স্টর্ম-২৭, মিরপুরের রূপনগর এবং সর্বশেষ আজিমপুরের অভিযানে কেউ নিহত হয়েছে, কেউ কেউ আবার জীবিত ধরা পড়েছে। কল্যাণপুরের যে অভিযান সেখানে আবু রায়হান তারেককে আমরা পেয়েছিলাম, সে গাইবান্ধায় গুলশান হামলায় জঙ্গিদের ট্রেনিংয়ের সমন্বয়ক ছিল। সেখানে কথিত মেজর মুরাদেরও খবর পেয়েছিলাম। সে প্রধান ট্রেইনার হিসেবে কাজ করত। গুলশানে যে সন্ত্রাসীরা নিহত হয়েছে তাদের কোরআনের শিক্ষা দেওয়া হতো বলে কল্যাণপুরের অভিযানে আটক রিগ্যান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। গুলশান, শোলাকিয়া, কল্যাণপুর এগুলো কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ট্রেইনার তারেক এবং মেজর মুরাদ দুজনই আমাদের অভিযানে মারা গেছে। সবকিছুর সমন্বয়ক ছিল তামিম চৌধুরী। সেও নারায়ণগঞ্জে মারা গেছে। আর তাদের অপারেশনাল হাউস যেটা বাসা ভাড়া নিয়েছিল আবদুল করিম নামে তানভীর কাদেরীও আজিমপুরের অভিযানে মারা গেছে। এসব নাম তদন্তে আগেই বেরিয়ে এসেছিল। তদন্তে আরও কিছু নতুন নাম এসেছে। ফিন্যান্স তারা যে পেয়েছিল তার বড় একটি অর্থ ব্যয় হয়েছিল হামলার আগে। যা অস্ত্র কালেকশন থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া নেওয়া পর্যন্ত। সে অর্থের উৎসও আমরা পেয়েছি। সেখানে নতুন কারও কারও নাম আসবে। আর অস্ত্র কোথা থেকে কীভাবে এবং কে এনেছিল সে তথ্যও আমরা পেয়েছি। গুলশান হামলায় নুরুল ইসলাম মারজানের একটি ভূমিকা ছিল। এরপর বাসার উজ জামান যে তাদের সংগঠনে চকলেট নামে পরিচিত তারও একটা বড় ভূমিকা ছিল। সেই সঙ্গে রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী বা গান্ধী তার প্রকৃত নাম আমরা এখনো পাইনি। তবে মূলত সে উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডার ছিল।

তিনি বলেন, হুন্ডির মাধ্যমে একবার একসঙ্গে ১৪ লাখ টাকা আসে জঙ্গিদের কাছে। অর্থ সরবরাহকারী এবং গ্রহণকারী দুটোই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তও অনেকটা এগিয়ে গেছে। কে সেসব টাকা গ্রহণ করেছিল তাকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে যেসব অস্ত্র এসেছে তা আসে ইন্ডিয়ার ভিতর দিয়ে। কিন্তু কোন দেশ থেকে এসেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। জঙ্গিরা সর্বোচ্চ ও সর্বশক্তি বিনিয়োগ করে গুলশান এবং শোলাকিয়ায় হামলা করে। আমাদের ধারণা, রাজীবসহ গুলশান হামলার অপারেশনাল কমান্ডার নুরুল ইসলাম মারজান ও আরেক জঙ্গি বাসার উজ জামান দেশের মধ্যেই আত্মগোপন করে রয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের যে অভিযান হয়েছে, এতে জঙ্গিদের ৬০ শতাংশ শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কে এই রাজীব গান্ধী : গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়াসহ সব জঙ্গি হামলার পরিকল্পক রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী ওরফে গান্ধী ওরফে শান্ত। এ দুই ঘটনায় সে তিনজন দক্ষ হামলাকারীকে সরবরাহ করে। এর মধ্যে দুজন গুলশানে এবং শোলাকিয়ায় একজন। গান্ধী ওরফে শান্ত এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫টি হামলার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। সে জঙ্গিদের উত্তরাঞ্চলীয় সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা জানায়, এখন নুরুল ইসলাম মারজান ও বাসার উজ জামান ওরফে চকলেটের পর মূল টার্গেটে গান্ধীও রয়েছেন। তবে বাসারের স্ত্রী ফেরদৌসি আফরিন আজিমপুরের অভিযানে আহত হওয়ার পর থেকে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সূত্র জানায়, রাজীব গান্ধীর গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। সে স্থানীয় একটি কলেজে পড়াশোনা করত। তেমন কোনো পেশায় জড়িত না থাকলেও প্রথম দিকে সে পুরনো জেএমবির সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করে। গাইবান্ধায় জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করত সে। তার বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। সে গত বছরই ঢাকায় অবস্থান শুরু করে। প্রতিটি হামলার কৌশল নীতি-নির্ধারণী মিটিংয়ে গান্ধী উপস্থিত থাকত। নিহত মেজর মুরাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেই সঙ্গে সে বিভিন্ন হামলায় লোক সরবরাহের দায়িত্ব পালন করত। রাজধানীর যেসব বাসা-বাড়িতে জঙ্গিরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করেছে বা করছে সেসব প্রায় ১৫টি বাসা চিহ্নিত করেছে কাউন্টার টেররিজমের কর্মকর্তারা। কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে রিগ্যানসহ আটক জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ এরই মধ্যে মিরপুরের দুটি বাসায় রেইড করে। আর আজিমপুরে নিহত জঙ্গি আবদুল করিম যার প্রকৃত নাম তানভীর কাদেরী এর আগে ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে কর্মরত ছিল। বর্তমানে তার কিশোর সন্তান তাহরীম কাদেরী রাসেলকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে প্রবেশন অফিসারের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে কাউন্টার টেররিজমের কর্মকর্তারা। জঙ্গি হামলা সংগঠিত করার জন্য তহবিল আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে টাকা পাঠানো হয়।

জঙ্গিদের আরেক দ্বিতীয় সারির নেতা বাসার উজ জামানের বাড়ি রাজশাহীতে। স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে থাকায় মেয়ে সাবিহা জামান তার নানার জিম্মায় রয়েছে। পুলিশ হেফাজতে এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন নিহত আবদুল করিম ওরফে তানভীর কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা এবং মারজানের স্ত্রী শায়লা আফরিন। নিহত জাহিদুল ইসলাম ওরফে মেজর মুরাদের মেয়ে জুনায়রা পিংকি তার দাদার জিম্মায় রয়েছে। জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর গায়ে কোনো প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম পাওয়া যায়নি। তবে একটি মাত্র অস্ত্রের গায়ে ‘বিহার’ লেখা পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানায়, মারজান, বাসার ও গান্ধীর আরও দুই সহযোগী রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ ভারতে পালিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। রিপন ও খালিদ গত এপ্রিলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল হত্যার পরপরই দেশত্যাগ করে। তবে খালিদ অধ্যাপক রেজাউলের ছাত্র ছিল। যে ক্লাস অধ্যাপক রেজউলকে হুমকিও পর্যন্ত দিয়েছিল। এখনো জঙ্গিদের মোট পাঁচ নেতার তত্পরতা রয়েছে। যাদের গ্রেফতারের জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

রিমান্ডে থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়নি তাহরীমের! : রাজধানীর আজিমপুরে পুলিশের অভিযানের সময় নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরীর ১৪ বছর বয়সী ছেলে তাহরীম কাদেরীকে তিন দিনের রিমান্ডে নিলেও পুলিশ গতকাল পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। রবিবার পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সহকারী কমিশনার (এসি) আহসানুল হক ঢাকা মহানগর কিশোর আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে চাইলে বিচারক রুহুল আমিন তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ীই তাহরীম কাদেরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কীভাবে তাহরীম কাদেরী এই পথে আসলো, জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তাকে কারা কারা উৎসাহিত করত এ নিয়েই মূলত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তার যমজ ভাইয়ের অবস্থান সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তাহরীমকে।  

তিনি আরও বলেন, তাহরীমকে গ্রেফতারের পরপরই টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে সেখান থেকেই তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আদালতের একজন প্রতিনিধি রাখা হবে।

আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে পুলিশ উল্লেখ করেছে, কিশোরটি জেএমবির সদস্য। ঘটনার দিন পুলিশ ওই জঙ্গি আস্তানার একটি কক্ষে ঢোকে। এ সময় সে দরজা আটকে দিয়েছিল। পুলিশ দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওই কিশোর পুলিশের ওপর ছুরি হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে পুলিশ তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার পরিবারের সবাই জেএমবি সদস্য। ওই বাসায় যাতায়াতকারী আরও কয়েকজন অজ্ঞাত পরিচয় নারী-পুরুষের বিষয়ে সে প্রাথমিক তথ্য দিয়েছে। জঙ্গি সংগঠনের আস্তানার সন্ধান, জঙ্গিদের নাম-ঠিকানা জানতে বিভিন্ন স্থানে তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন। আদালতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের ২০৯/৫ পিলখানা রোডের ছয়তলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। পরে ওই বাসা থেকে আহত অবস্থায় তিন নারীকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ সূত্র জানায়, তানভীর কাদেরীর যমজ দুই ছেলে। তারা ধানমন্ডির একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। অপর ছেলের হদিস এখনো পুলিশ পায়নি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow