Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০০
জিডি তদন্ত হয় না, হলেও ফলশূন্য
পুলিশ বলল, তদন্ত হয় পাবলিককে জানানো হয় না
মাহবুব মমতাজী

থানায় দায়ের করা বেশির ভাগ সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সাধারণত তদন্ত হয় না। সাধারণ ডায়েরির তদন্ত করার কথা থাকলেও এ ব্যাপারে খুবই কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।

গুরুত্ব না পাওয়ায় কিংবা তদন্ত না হওয়ায় জিডির অনেক বিষয় এবং অনেক অপরাধের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। এ ছাড়া কখনো কোনো জিডির তদন্ত হলেও বরাবরই শূন্য থেকে যায় সেই তদন্তের ফলাফল। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। জিডি বিষয়ে থানাগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে, টাকা ছাড়া পুলিশ জিডি নেয় না। অবশ্য রাজধানীতে এ ধরনের অভিযোগ আগের চেয়ে অনেক কম। তবে ছিনতাই, ছোটখাটো চুরি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে টাকা আদায়ের মতো অপরাধ যা মামলা হওয়ার যোগ্য— এমন অনেক ঘটনাকে পুলিশ জিডি হিসেবে গ্রহণ করছে এমন অভিযোগই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আর তদন্ত না হওয়ায় এর কোনো সুরাহা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে বেশ কিছু ঘটনা তুলে ধরে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, জিডির বিভিন্ন ধরন আছে। এর কিছু কিছু ঘটনা তদন্তযোগ্য আবার কিছু কিছু বিষয় তদন্তযোগ্য নয়। সাধারণত জিডির যেগুলো তদন্ত হয় সেগুলো পাবলিককে জানানো হয় না। তবে মামলার ক্ষেত্রে সব তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বাদীকে জানানো হয়ে থাকে। ছিনতাই ও প্রতারণার যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলো আসলে মামলা করার যোগ্য। কিন্তু অনেক সময় ভুক্তভোগীরাই মামলা না করে জিডি করে থাকেন। আবার কিছু ঘটনা আছে যেগুলো মামলার আমলযোগ্য আবার অনেক ঘটনা আমলযোগ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে— প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ থানায় জিডি করতে গিয়ে ঘুষ দিয়ে থাকেন। যদিও বিনা খরচে জিডি করার নিয়ম রয়েছে। এদিকে বিভিন্ন কেস স্টাডি এবং অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখা গেছে, মোসলেম নামের এক ব্যক্তি চকবাজার থানায় যান জিডি করতে। গিয়ে দেখেন ডিউটি অফিসারের টেবিলের সামনে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন। তারাও জিডির জন্য এসেছেন। আগত সবাইকে ডিউটি অফিসার জানান, ওসি সাহেব বাইরে আছেন। ওসি স্যারের অনুমতি ছাড়া জিডি নেওয়া যাবে না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে ওসির নির্দেশনায় সমস্ত ঘটনার বিবরণ লিখে জিডি গ্রহণ করা হয়। আর এ সময় থানার মুন্সির জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে জিডি লেখা বাবদ ২০০-৫০০ টাকা করে নেয় পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু কিছু সাধারণ ডায়েরি অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। আর এ কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়। আর জিডির তদন্তগুলোর কোনো অগ্রগতি সাধারণত জিডিকারীকে জানানো হয় না। যদি কোনো মামলা হয় সেই মামলার তদন্ত অগ্রগতি জানানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের ৪৯টি থানায় প্রতি মাসে অন্তত এক হাজার সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশ জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন অজস্র জিডি হয়ে থাকে। এমনকি পুলিশ সদস্যরা নিজেরাও তাদের কর্মকাণ্ড অনেক সময় জিডি লিখে রাখেন। আর একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং ভুক্তভোগীরাও তাদের অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না করে তা জিডি করে রাখেন। এসব জিডির ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। ফলে পরবর্তীতে হরহামেশা ঘটে থাকে খুনখারাপি। রেলওয়ে পুলিশের ২০১২-১৩ সালের একটি হিসাবে দেখা গেছে, এক হাজার ৮১১ জন মানুষের লাশ পাওয়া যায় রেল লাইনের মধ্যে। যেগুলোর বেশির ভাগই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। সর্বশেষ চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২০ জনের লাশ পাওয়া গেছে রেল লাইনের মধ্যে বলে জানিয়েছেন রেল পুলিশের একটি সূত্র।

সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে দুষ্কৃতকারীরা বেশির ভাগ সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। বিভিন্ন স্থানে খুন করে লাশ ফেলে যায় রেল লাইনে। গত তিন বছরে ঢাকায় জিআরপির তালিকায় প্রায় ৭০০ জনের খুন হওয়া লাশ পাওয়া যায় রেল লাইনে। আর এসব খুনের ঘটনায় বেশির ভাগই পেশাদার খুনিরা জড়িত থাকে। গাজীপুর এলাকায় এমনি তিনটি ঘটনার চিত্র পাওয়া যায়— তদন্তকালীন সময়ে ২০১২ সালের ২৯ আগস্ট চন্দ্রা রেল লাইনের কাছে ২৫ বছর বয়সী এক যুবকের লাশ পাওয়া যায়। পরে স্থানীয়রা জানান, সেটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং খুন। সে ঘটনার পূর্বে জিডি করা ছিল। পরবর্তীতে তা হত্যা মামলা হিসেবে চালু হয়ে যায়। একই বছরের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের মৌচাক রেল লাইনের পাশে ২০ বছর বয়সী আরেক যুবকের লাশ পাওয়া যায়। সেটিরও পূর্বে জিডি করা ছিল, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। সে ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেয় পুলিশ। ২০১৩ সালে ৬ অক্টোবরে গাজীপুরে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। যেটি পুলিশ প্রথমে জিডি হিসেবে নেয় পরবর্তীতে তা মামলায় গড়ায়। এ বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ বলেন, গত জুনের দিকে জয়দেবপুরে একটি লাশ পাওয়া গেছিল। যার লাশ পাওয়া যায় সে আগেই জয়দেবপুর থানায় একটি জিডি করছিল। সেটার তদন্ত হইছিল কিনা জানি না। পরে রেল লাইনে লাশ পাওয়া যাওয়ায় নিহতের মা বাদী হয়ে রেলওয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করে। ১২ সেপ্টেম্বর বনানী রেল স্টেশনের পাশে একটি লাশ পাওয়া যায়। যেটা অন্য স্থানে মেরে সেখানে ফেলে রাখা হয়। সে ঘটনায় আমরা রেলওয়ে থানা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করব। যেটি প্রক্রিয়াধীন। সূত্র জানায়, গত বছর জিডি করার পরও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। গত বছরের ২ এপ্রিল রাজধানীর শ্যামলীতে দেওয়ান নুরুজ্জামান (৫০) নামে এক ব্যাংকার নিহত হন। এর আগে ১৯ মার্চ তিনি থানায় একটি জিডি করেন। সেখানে উল্লেখ ছিল তাকে হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু পুলিশ তাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ যদি জিডির পর যথাযথ ব্যবস্থা নিত তাহলে হয়তো নুরুজ্জামানের অপমৃত্যু হতো না। এদিকে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়ার দক্ষিণ ধনিয়াতে বিকাশ এজেন্টের ব্যবসা করতেন গোলাম সরওয়ার। গত ১৩ এপ্রিল তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এক লাখ ৩৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় এক ভুয়া পুলিশ। একই মাসের ২৬ তারিখে একই ধরনের ফাঁদে পড়ে এক লাখ ১৯ হাজার টাকা খুইয়েছেন লিটন হাওলাদার নামের আরেক বিকাশ এজেন্ট ব্যবসায়ী। তারা দুজনই কদমতলী থানায় একটি করে জিডি করেছেন। গত ১৩ আগস্ট প্রতারকদের আরেক ফাঁদে পড়েছেন মো. শরীফ হোসেন নামের আরেক বিকাশ এজেন্ট ব্যবসায়ী। কয়েক দিন পর তিনিও যাত্রাবাড়ী থানায় জিডি করেন। কিন্তু সেসব জিডি ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্যই রয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনায় জিডি নয় বরং মামলা করতে হবে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন থানায় যাওয়ার পর তাদেরকে মামলা নয় জিডি করতে বলা হয়। আর অধিকাংশ সময় এসব জিডির কোনো তদন্ত হয় না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow