Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:২৭
সবাই এখন আওয়ামী লীগ
প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী-সাংবাদিকসহ পেশাজীবী জাতীয় পার্টির সবাই, বিএনপির অভ্যন্তরীণ অনেক নেতা-কর্মী, দলে দলে যোগ দিতে চায় জামায়াতও
নিজস্ব প্রতিবেদক
সবাই এখন আওয়ামী লীগ

সবাই এখন আওয়ামী লীগ হতে চায়। এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে।

বর্তমান ও সাবেক আমলা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী কিংবা প্রকৌশলী— সবাই এখন নিজেদের গায়ে আওয়ামী লীগের ‘তকমা’ লাগাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। পিছিয়ে নেই সাংস্কৃতিক কর্মী কিংবা সাংবাদিকরাও। প্রশাসনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও নিজেদের এখন ‘বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগার’ হিসেবে জাহির করতে শুরু করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনসহ দলের দুঃসময়ে যারা আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তারাই এখন সুবিধা লুটতে আওয়ামী লীগে যোগদান করছেন। নিন্দুকেরা এদের নাম দিয়েছেন ‘হাইব্রিড’। ঘরে-বাইরে এখন হাইব্রিডের ছড়াছড়ি। সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গেই পথ চলছে। তাদের তিনজন মন্ত্রীও সরকারের সঙ্গে কাজ করছেন। এমনকি রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনেক নেতাও আড়ালে-আবডালে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রফা করে চলেছেন। শিল্প-কল কারখানায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন বিএনপির অনেক নেতা। তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীও আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। বসে নেই জামায়াতও। গত কয়েক বছরে অন্তত ৫ হাজার নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয়ভাবেও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য রয়েছে জামায়াতের। অধিকাংশ বাম দলও আওয়ামী লীগে একাকার। বাকি দলগুলোও সুবিধাবাদী অবস্থানে থেকে পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষেই রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা নজিরবিহীন। অতীতে কখনই এ প্রবণতা দেখা যায়নি। এটা আওয়ামী লীগের আদর্শিক রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। দল আবারও কখনো দুঃসময়ে পড়লে এর চরম মূল্য দিতে হবে আওয়ামী লীগকেই। এখন আওয়ামী লীগ সুবিধায় আছে। তাই তৃণমূল থেকে প্রশাসনের সর্বত্র আওয়ামী লীগ হওয়ার অতি উৎসাহীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দল বেকায়দায় পড়লে এসব আওয়ামী লীগারকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখনই সময়, নব্য আওয়ামী লীগারদের লাগাম টেনে ধরা। বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষিতসমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণি এখন আওয়ামী লীগের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন না। প্রকাশ্যেই তারা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন। এর আগে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনে যখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী গ্রেফতার হন, তখনো এসব পেশাজীবী শ্রেণিকে সভা-সমাবেশ কিংবা মানববন্ধন করতে দেখা যায়নি। কোনো কিছুরই অতিমাত্রা ভালো নয়। এখন তারা রাস্তাঘাট দখল করে নিজেদের আওয়ামী লীগ দাবি করে শোডাউন দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। ’ তিনি আরও জানান, ‘নীতি আদর্শের এই প্রবণতা শুধু আদর্শের অভাবই নয়, এটা সততারও অভাব। বাংলাদেশের রাজনীতি এতটা নষ্ট হতো না যদি এই জাতীয় অসাধুতা ও সুবিধাবাদ না থাকতো। এটা তারা করতে পারছে এ জন্য যে, আওয়ামী লীগও চায় দেশের মানুষ তাদের সমর্থন করুক আর না করুক— চাটুকারীতা করুক। ’ আমলাদের একটি বড় অংশ ছাত্রজীবনে এক দিনও ছাত্রলীগের রাজনীতি না করলেও তারা এখন বিগত দিনের মহান ত্যাগী ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন এমন জাহিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব, সচিব, উপসচিব, যুগ্মসচিবসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার টেবিলে বা সহজেই মানুষের দৃষ্টি যায় এমন সুবিধাজনক স্থানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রচিত বিভিন্ন বইপত্র এখন শোভা পাচ্ছে। এ ছাড়া এমপি-মন্ত্রীদের কাছে তাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাও ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে গিয়ে ত্যাগ স্বীকার করেছেন বা বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে এমন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরছেন। যে কোনো মূল্যে তারা নিজেদের আওয়ামী লীগপন্থি আমলা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। শুধু সচিবালয়ই নয়, বিভাগীয়, জেলা-উপজেলার দফতরেও একই চিত্র। টিআর-কাবিখা-কাবিটা— কোথায় কত দেওয়া হবে, কোন চেয়ারম্যানকে কত দেওয়া হবে; এসবের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছেন কিছু কর্মকর্তা। স্থানীয় এমপি বা মন্ত্রীর সঙ্গে ‘ভাব’ গড়ে তুলে সরকারি কর্মকর্তাই এখন বড় ‘লীগার’ ওই এলাকায়। পিছিয়ে নেই পুলিশও। বিশেষ করে রাজধানীতে দলবাজির বাড়াবাড়ি বেশি বলে জানা গেছে। রাজধানীর কয়েকটি থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মসূচি কোন এলাকায় পালন করবে তার উপদেশ দেন স্থানীয় পুলিশ কর্তারা। শুধু পুলিশ বিভাগেই নয়, আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থায়ও এ প্রবণতা। বিএনপির একটি বড় অংশ নির্বিঘ্নে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে নিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে আঁতাত করে চলেছেন। এমনকি তারা কেউ কেউ আওয়ামী লীগ পরিবারের সঙ্গে কুটুম্বিতা করে নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলছেন। এ চিত্র সারা দেশে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত। কোনো কোনো এলাকায় কেউ কেউ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, স্থানীয় এমপিদের হাত ধরে বিএনপি থেকে নৌকায় উঠে রাতারাতি আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাচ্ছেন। দলে যোগদান করেই তারা নিজ এলাকায় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হয়ে টেন্ডার, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। এমনকি ২০১৩ সালের আগে জামায়াত-বিএনপি অধ্যুষিত যেসব এলাকায় পুলিশ পাহারায় এমপি-মন্ত্রীদের যেতে দেখা গেছে বা কেউ নিজ এলাকাতেই যাননি, এখন সেসব এলাকা শুধুই আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত নেতারা এখন নিজ ঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়েছেন। খোলস পাল্টিয়ে হয়ে গেছেন আওয়ামী লীগ নেতা। জামায়াতের একটি অংশ নিজেদের মামলা-মোকদ্দমা থেকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলছেন। জামায়াতের শিক্ষা, হাসপাতাল, বীমা, ব্যবসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতাদের চেয়ারম্যান, এমডি বা পরিচালক পদে রেখে জামায়াত নেতারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে চলছেন। সারা দেশে জামায়াত-শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চললেও আঁতাতকারী ওই জামায়াত-শিবিরের নেতারা এখনো বীরদর্পে ঘুরে বেড়ান। বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের একটি অংশও এখন বিএনপির পক্ষে কথা বলার চেয়ে আওয়ামী লীগ বন্দনায় ব্যস্ত। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করছেন। এ নিয়ে কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও তাদের ‘বেইমান’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে কম যাননি, আওয়ামী লীগপন্থি বা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও। তারা চাটুকারিতায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। প্লট, ফ্ল্যাট, বিদেশ সফর, ব্যাংক-বীমার পরিচালক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অথচ এই সাংবাদিকদের ২০১৩ সালে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কোনো কথা বলতে বা এক কলম লিখতে দেখা যায়নি। এখন তারা দলের দুর্দিনে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন এমন বুলি কপচিয়ে মন্ত্রী-এমপিদের শুভদৃষ্টি আকর্ষণে ব্যস্ত। এদের সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কোনো না কোনো মন্ত্রীর অফিস, বাসাবাড়িতে দেখা যায়। এদের কেউ কেউ বাড়ি-গাড়ির মালিক তো হয়েছেনই, কেউ কেউ এখন পত্রিকা ও টেলিভিশনের অনুমোদন নিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। সেই দলের তিনজন সরকারের মন্ত্রিসভায়। বিরোধীদলীয় নেতা থেকে শুরু করে সরকারে থাকা মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির এমপিরা এখন আওয়ামী লীগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল নয়, বরং ছায়া আওয়ামী লীগ বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের বামপন্থিরাও এখন সরকারের অংশ। বাম দল থেকে দুজন মন্ত্রিসভায় আছেন। বাম দলের এমপি-মন্ত্রী এমনকি নেতারাও এখন বড় আওয়ামী লীগারের ভূমিকায়। সংসদ বা বিভিন্ন সভায় বক্তৃতার শুরুতেই সরকার বন্দনায় শুরু করে জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু দিয়ে শেষ করেন। বাম দলের নেতারাও এখন আওয়ামী লীগারদের চেয়ে বড় লীগার হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। জোটের বাইরে থাকা বাম দলগুলোর মধ্যে দু-একটি ছাড়া প্রায় অধিকাংশই এখন আওয়ামী লীগ হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা নীতিভ্রষ্ট হয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করা যায়, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজশিক্ষকরা এখন রাজনীতির সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছেন। তারা এখন সবাই আওয়ামী লীগার। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও যেসব শিক্ষক বিএনপি বা অন্য দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা মৌন সমর্থক ছিলেন তারাও এখন আওয়ামী লীগার। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অতি উৎসাহী বা নব্য আওয়ামী লীগারের আস্ফাালনে দীর্ঘদিনের ত্যাগী আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকরা এখন কোণঠাসা। একই অবস্থা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও। তাদেরও সর্বত্র এখন আওয়ামী লীগের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজে এখন আর অন্য পন্থি চিকিৎসক খুব বেশি চোখে পড়ে না। চিকিৎসকরা সবাই আওয়ামী ঘরানার সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর নেতা ও সমর্থক। সম্প্রতি স্বাচিপের নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত কমিটিতে ড্যাবের নেতা এমনকি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন চিকিৎসকও এখন স্বাচিপের নেতা হয়েছেন। নিজেদের আওয়ামী লীগার জাহির করে এখন ‘মজাদার’ পদায়ন, সুবিধাজনক অবস্থা বাগানোয় ব্যস্ত তারা। সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষকই নন, এখন আওয়ামী লীগের অতিমাত্রা দেখা যাচ্ছে আইন পেশায়ও। বিভিন্ন বার কাউন্সিলে এখন আওয়ামী লীগ নেতার ছড়াছড়ি। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদেরও কিছু অংশ এখন আওয়ামীপন্থি হয়ে উঠেছেন। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন সরকারের কাছ থেকে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow