Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:২৯
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই
জন্ম : ২৭-১২-১৯৩৫, মৃত্যু : ২৭-০৯-২০১৬

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই। বরেণ্য এই সাহিত্যিক গতকাল বিকালে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। লন্ডনে চিকিৎসা শেষে ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরার পর এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সৈয়দ হক হিসেবে সুপরিচিত কবি সৈয়দ শামসুল হক। সোমবার দুপুরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে

কবিকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হয়। গতকাল ভোর থেকে কৃত্রিম উপায়ে তাকে শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। বিকালে চিকিৎসকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সাহিতে?্যর সব শাখায় সদর্প বিচরণকারী সৈয়দ হকের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। সৈয়দ হকের মৃত্যুর খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত?্যাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। গত রাতে হাসপাতাল থেকে কবির মরদেহ গুলশানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সৈয়দ হকের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ সকাল ১০টায় কবির মরদেহ প্রথমে নেওয়া হবে বাংলা একাডেমিতে। সেখানে শ্রদ্ধা জানানোর পর বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজার পর কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কুড়িগ্রামে তার নিজ গ্রামের মাটিতে সমাহিত করার জন্য নেওয়া হবে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রাতে সৈয়দ শামসুল হকের স্ত্রী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে তাকে সান্ত্বনা দেন এবং নন্দিত এই সাহিত্যিকের মৃত্যুতে তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। রাতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সৈয়দ হকের বাসায় যান। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যেরও নাগরিক হওয়ায় ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে চিকিৎসার জন্য গত ১৫ এপ্রিল লন্ডন গেলে সৈয়দ হকের ক?্যান্সার ধরা পড়ে। প্রথমে লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে এবং পরে চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা নেন। টানা প্রায় তিন মাসের চিকিৎসা শেষে মন খারাপ করা খবর নিয়েই ১ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে আসেন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন মাত্র ছয় মাস বাঁচবেন কবি। দেশে ফেরার পর থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে তাকে দেখে এসে তার চিকিৎসার পুরো ব?্যয়ভার নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যেই সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। দুপুরে তাকে দেখে এসে কবি মুহাম্মদ সামাদ সাংবাদিকদের বলেন, সংকটাপন্ন হলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না। সৈয়দ হকের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে দেশের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও তার ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষী ইউনাইটেড হাসপাতালে ভিড় করেন। এ সময় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, লিয়াকত আলী লাকী, আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ বিশিষ্টজনেরা হাসপাতালে ছুটে যান।

কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, চলচ্চিত্রসহ সাহিত্যের সব শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য ‘সব্যসাচী লেখক’ পরিচিতি পাওয়া সৈয়দ হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে। একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া এই সাহিত্যিকের হাত দিয়ে ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নীল দংশন’, ‘মৃগয়া’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘আয়না বিবির পালা’সহ বহু পাঠকপ্রিয় বই এসেছে। তার লেখা নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরুল দীনের সারাজীবন’ বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে সৈয়দ শামসুল হক বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সী লেখক।

সৈয়দ শামসুল হক সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুন দম্পতির আট সন্তানের প্রথম সন্তান। পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। সৈয়দ হক ব্যক্তিজীবনে প্রথিতযশা লেখিকা ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্বামী। সৈয়দ শামসুল হকের পিতার ইচ্ছা ছিল তাকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। পিতার এ রকম দাবি এড়াতে তিনি ১৯৫১ সালে বোম্বে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর তার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয়।

সরকারি কলেজ চত্বরে সমাহিত হবেন কবি : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, সৈয়দ শামসুল হকের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে তার নিজ জন্মস্থান কুড়িগ্রামের সরকারি কলেজ চত্বরে সমাহিত করা হবে। তাকে সমাহিত করার স্থানটিতে কবর খনন করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে তার স্মরণে এক শোকসভার আয়োজন করেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow