Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪০
পানামা কেলেঙ্কারিতে ৪৩ বাংলাদেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য
রুকনুজ্জামান অঞ্জন

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচারের যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তাতে অন্তত ৪৩ জন বাংলাদেশির নাম পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৩৯ জন ব্যক্তি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে বেনামি প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রমাণ মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইইউ) যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রাথমিকভাবে এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম চিহ্নিত করেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করতে চাইছে না বিএফইইউ। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, বিদেশে অর্থ পাচারে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে তার মধ্যে ৩৭ জন করদাতা বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সম্প্রতি এসব তথ্য উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর। গত ১১ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)-এর দেশভিত্তিক তালিকা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশি ৫০ জনের বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাগুজে বা ভুয়া কোম্পানি আছে। চলতি বছরের এপ্রিলে মোস্যাক ফনসেকার প্রায় ১১ মিলিয়ন নথিপত্র ফাঁস হয়। আর এরপরই বের হয়ে আসে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাধরদের অর্থ কেলেঙ্কারির ভয়াবহ তথ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা পর্যন্ত কীভাবে কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদ গোপন করেন এবং কীভাবে অর্থ পাচার করেন; তা উন্মোচিত হয়েছে নথিগুলো ফাঁস হওয়ার পর। মোস্যাক ফনসেকা নামক আইনি প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার মাধ্যমে মক্কেলদের বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে তারা সম্পদ গোপন এবং কর ফাঁকি দিয়ে ওই অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ উপায়ে ব্যবহারের সুযোগ পান। এরই মধ্যে ফাঁস হওয়া নথিগুলোর তথ্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নথি ফাঁস হওয়ার পর পানামা পেপারস-এ থাকা বাংলাদেশিদের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে একযোগে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অর্থ পাচার প্রতিরোধে সরকারি সংস্থাগুলোর এসব কাজের অগ্রগতি জানতে স্থায়ী কমিটির গত মাসের বৈঠকে ওই সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফইইউ-এর মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ জানান, পানামা পেপারস যাচাই-বাছাইয়ের পর ৪৩ জনের (বাংলাদেশি) নাম পাওয়া গেছে। বিএফআইএইউ-এর অভ্যন্তরীণ ডাটাবেইজ অনুসন্ধানে এর মধ্যে ৩৯ জন ব্যক্তি এবং তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অভিযুক্তদের নাম জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা এ মুহূর্তে ঠিক হবে না। এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান ওই বৈঠকে জানান, বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে যেসব পাচারকারীর নাম এসেছে তার মধ্যে ৩৭ জন করদাতা। এদের একজন ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ এবং আরেকজন ১৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অর্থ পাচারের সঙ্গে তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরাও জড়িত বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ২৯৭ কনটেইনার পণ্য রপ্তানি করেছেন, কিন্তু তার বিপরীতে এক ডলারও বাংলাদেশে আসেনি। এসব তথ্য জানার পর অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বৈঠকে বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের পরিমাণ প্রতিবছরই পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। অনেকেই মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় সেকেন্ড হোম করেছে। অনুসন্ধানে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়, তবে এই তিনটি দেশ (মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডা) অন্ততপক্ষে ৩/৪ জন করে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। প্রসঙ্গত, আইসিআইজের তালিকায় যেসব ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন— কফিল এইচএস মুইদ, রুডি বেঞ্জামিন, ইউসুফ রাইহান রেজা, ইশরাক আহমেদ, নভেরা চৌধুরী, ফরহাদ গনি মোহাম্মদ, মেহবুব চৌধুরী, বিলকিস ফাতিমা জেসমিন, রজার বার্ব, মো. আবুল বাশার, জাইন ওমর, বেনজির আহমেদ, আফজালুর রহমান, মুল্লিক সুধীর, সরকার জীবন কুমার, নিজাম এম সেলিম, মোহাম্মদ, মোকসেদুল ইসলাম, মোতাজ্জারুল ইসলাম, এম সেলিমুজ্জামান, আফজালুর রহমান, সৈয়দ সিরাজুল হক, এফ এম জুবাইদুল হক, মোহাম্মদ আমিনুল হক, নাজিম একরামুল হক, ক্যাপ্টেন এম এ জাউল, কাজী রাইহান জাফর, মোহাম্মদ শাহেদ মাসুদ, সালমা হক, খাজা শাহদাত উল্লাহ, সৈয়দা, সামিনা মির্জা, দিলীপ কুমার মোদি, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, জাফরুল্লাহ কাজী এবং জাফরুল্লাহ নিলুফার, জুলফিকার হায়দার, উম্মে রুবানা, আজমত মঈন, মির্জা এম ইয়াহিয়া, মিস্টার নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জাফের উম্মেদ খান, নিলুফার জাফরুল্লাহ, এ এম জুবায়দুল হক এবং আসমা মঈন, এএফএম রহমতুল বারী, এএসএম মুহিউদ্দিন মোনেম, মাহতাবুদ্দিন চৌধুরী। এর মধ্যে রুডি বেঞ্জামিন ও রজার বার্ব নামে দুজন বিদেশির নামও বাংলাদেশের নামের তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় থাকা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্য বেয়ারার, পেসিনা স্টেফানে ও বাংলা ট্রাক লিমিটেড নামে তিনটি কোম্পানির নাম জানা গেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow