Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৫
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের হানা, নিহত ৩৮
ঋতুপর্ণা রায়, নয়াদিল্লি

নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের জঙ্গি ঘাঁটিতে আঘাত করল ভারতীয় সেনাবাহিনী। বুধবার রাতে সেনা এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশন (ডিজিএমও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল রণবীর সিং। তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ভারতের পদক্ষেপকে নিন্দা জানিয়ে বলেছেন ভারত বিনা প্ররোচনায় হামলা করেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের ‘সার্জিকাল স্ট্রাইকস’ এর বর্ণনাকে অস্বীকার করে এটাকে একটা বিভ্রম বলে আখ্যা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ কোনো যুদ্ধ নয়। এমনকি, ছায়া-যুদ্ধও নয়। ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নামের অভিযান চালানো হয় অতর্কিতে। কোনো প্রাক-ঘোষণা ছাড়াই। এটি করা হয়, দেশের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক দীর্ঘ দিনের কোনো সমস্যা মেটাতে। খুব অল্প সময়ে, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শত্রুর আস্তানায় বা সুড়ঙ্গ বা কোনো দুর্গম, দুর্ভেদ্য ঘাঁটির ওপরে চালানো হয় এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’। এই অভিযানে কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা হয় না। শত্রুকে পুরো খতম করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপদে ফিরে আসতে হয়।

ভারতের সেনাবাহিনীর দাবি, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাত ১২টা ৪০ মিনিট নাগাদ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) পেরিয়ে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরে ঢুকে জঙ্গিদের ডেরায় হামলা চালায় ভারতীয় সেনাবাহনী। পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের ভীমবার, হটস্প্রিং কেল ও লিপা সেক্টরে ভারতীয় সেনা কমপক্ষে সাতটি জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে। অভিযান শেষ হয় গতকাল ভোর ৪.৩০ মিনিটে। প্রায় চার ঘণ্টার ওই হামলার জেরে নিহত হয়েছে ৩৮ জঙ্গি। হামলায় ২ পাকিস্তানি সেনাও নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। তবে পাকিস্তান যাই বলুক না কেন, জঙ্গিদের ছাড় দেওয়া হবে না এবং ভারত আবার হামলা চালাবে বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন লে. জেনারেল রণবীর সিং। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ।

রণবীর সিং জানান ‘চলতি বছরে অন্তত ২০ বার নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। এমনকি উরির হামলার পরও সেই চেষ্টা থামেনি। বুধবারও নিয়ন্ত্রণ রেখায় জঙ্গিরা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরপরই গভীর রাতে নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে ২ কিলোমিটার ভিতরে গিয়ে ভারতীয় সেনারা জঙ্গি ঘাঁটিতে অভিযান চালায়। এই হামলায় কোনো ভারতীয় সেনা আহত হননি। তিনি আরও বলেন ‘জঙ্গিদের কোনোভাবেই ভারতে ঢুকে হামলা চালাতে  দেওয়া হবে না।

রণবীর সিংহ বলেন, এই আক্রমণে বহু জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। তাদের সাহায্যকারীদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ এবং সন্ত্রাস  মোকাবিলায় ভারতের এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চলবে।

এদিকে বুধবার রাতে সেনা অভিযানের পরই পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী পাঞ্জাবের ছয়টি জেলা থেকে গ্রামবাসীদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়েছে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদলকে ফোন করে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরে গ্রামবাসীদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ের প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করতে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত সব স্কুল-কলেজকেও পরবর্তী নির্দেশ জারি করা না পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

এদিকে সেনা অভিযানের পরই বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কে ফোন করে সেনা অভিযানের বিষয়টি জানান। জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল ভোরা এবং মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতিকেও বিষয়টি জানানো হয়। বিকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সেনা অভিযানের বিষয় নিয়ে কথা বলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর উরির সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় নিহত ১৮ জওয়ানের মৃত্যুর পর থেকেই উত্তাল হয় গোটা ভারত। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার দাবি উঠতে থাকে। সবমিলিয়ে বেশ চাপে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শেষপর্যন্ত পাক শাসিত কাশ্মীরে ঢুকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো জঙ্গি ঘাঁটি।

কূটনৈতিক তত্পরতা : ১৮ সেপ্টেম্বর উরি হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে একঘরে করার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালায় ভারত। এ প্রয়াসে অনেকটা সফলও হয়েছে। পাকিস্তান সন্ত্রাস বিরোধিতার প্রশ্নে সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রকাশ্য সমর্থনও আদায় করেছে। সরকারি সূত্রে জানানো হচ্ছে, বুধবার একটি অনুকূল বিশ্ব-পরিবেশ গড়ে তোলার পরই সেনা অভিযান করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পর যাতে কোনো ভুল বার্তা না যায় সেদিকটিও নিশ্চিত করতে চাইছে ভারত। গতকাল পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর ২২টি রাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের গত রাতের অভিযান এবং তার তাত্পর্য ব্যাখ্যা করেছেন। এই ২২টি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে পি-৫ গোষ্ঠীভুক্ত রাষ্ট্রগুলোও।

অভিযানের পর আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান ই রাইস ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে। আলাপে উরি ঘটনার নিন্দা করেছেন রাইস। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদীদের শাস্তি দেওয়ার প্রয়াসকে দ্বিগুণ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামার সেটাই প্রতিশ্রুতি।’ এই অঞ্চলে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস যে বিপদ তৈরি করেছে তাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে রাইস আশা প্রকাশ করেছেন যে জাতিসংঘ চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ব্যবস্থা নেবে। লস্কর ই তৈয়বা, জইশ-এর মতো সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। ভারতের প্রতি আমেরিকার বার্তা, আঞ্চলিক সুস্থিতি ও শান্তি এবং সন্ত্রাস বিরোধিতার প্রশ্নে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন সহযোগিতা আরও জোরালো করবে। ভারতের সুপরিকল্পিত দৌত্যের ফলে গোটা বিশ্ব থেকে (পাকিস্তান ছাড়া) বিরোধী কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু গোড়া থেকেই ইসলামাবাদের পাশে থাকা বেইজিং গতকাল জানিয়েছে, ভারত ও পাকিস্তান যাতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়ে অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখে তার চেষ্টা করছে তারা। পাশাপাশি মতবিরোধ কমাতে এবং গোটা অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিনা প্ররোচনায় হামলা— পাকিস্তান : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ভারতের পদক্ষেপকে নিন্দা জানিয়ে বলেছেন ভারত বিনা প্ররোচনায় হামলা করেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস’ এর বর্ণনাকে অস্বীকার করে এটাকে একটা বিভ্রম বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে গতকাল সকালে ভারতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে দুজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে অভিযুক্ত সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিতে যে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকসের কথা বলা হচ্ছে সেটা একটা বিভ্রম, একটা মিথ্যা প্রভাব সৃষ্টির জন্য এটা ভারতের ইচ্ছাকৃতভাবে করা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow