Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১৭
এবার ভারতবিরোধী বিএনপি
পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন । চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির চিন্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গতিবিধি বাড়াতে দলীয় প্রধানের নির্দেশ
মাহমুদ আজহার
এবার ভারতবিরোধী বিএনপি

বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর উদ্বোধন করতে গিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে দেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে চরম হতাশ হন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে বিএনপিতে ভারত লবির নেতারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানান, নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে অনেক কিছুই বিএনপি আশার আলো দেখছে না।

এর আগে একাধিকবার মোদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো অর্থবহ বার্তা না পাওয়ার বিষয়টিও তারা অবহিত করেন। এ নিয়ে হতাশ হন দলের নীতিনির্ধারকরা। এর পর থেকেই ভারতবিরোধী নীতি আবার স্পষ্ট হয় বিএনপিতে। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে দলীয় নেতারা সভা-সমাবেশে আগের মতোই ভারতবিরোধী বক্তব্য দিতে শুরু করেন। দলটি এখনো সেই অবস্থানেই আছে বলে দলীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

দলীয় কূটনৈতিক সূত্রমতে, দলের বিদেশনীতিতে বেশকিছু পরিবর্তন আসছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক গড়তে নতুন করে তত্পরতা শুরু হয়েছে। এশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীনের সঙ্গেও বৈরী অবস্থা কাটিয়ে সম্পর্ককে আরও জোরদারের প্রচেষ্টাও চলছে। কৌশলগতভাবে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিও চায় বিএনপি। এ নিয়েও একটি অংশ কাজ করছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করা  হচ্ছে। বিএনপির কূটনৈতিক-সংশ্লিষ্ট এক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘ভারত সরকার এখন বিএনপিবিরোধী নীতিতে অবস্থান নিয়েছে। এখন অনেকটাই প্রকাশ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, ভারতকে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দরকষাকষি করতে হবে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনে ভারতের সমালোচনা করতে হবে। ’

সূত্রমতে, দীর্ঘদিন বিএনপি ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে ছিল। আবার হঠাৎ ভারতবিরোধিতা শুরু করে দলটি। সম্প্রতি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেখানেও ভারতবিরোধিতার বিষয়টি উঠে আসে। পর্যায়ক্রমে দলের সিনিয়র নেতারাও প্রকাশ্যেই ভারতবিরোধী কথাবার্তা বলা শুরু করেন। বর্তমানে বিএনপিতে ভারতবিরোধিতার নীতি স্পষ্ট। এখন বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যেই ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। রামপাল ইস্যুতে একটি বিশাল শোডাউনের চিন্তাভাবনা করছে বিএনপি। খুলনা অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছেন দলের শীর্ষ নেতারা। জানা যায়, বিএনপিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, ড. এম ওসমান ফারুক, লন্ডন বিএনপি নেতা হুমায়ন কবীরসহ দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ। এ ছাড়াও পশ্চিমাসহ অন্যান্য দেশে কূটনীতি নিয়ে কাজ করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াজ রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। মধ্যসারির নেতাদের মধ্যে ড. আসাদুজ্জামান রিপন, শামা ওবায়েদ, জেবা খান, মুশফিকুল ফজল আনসারীও এ ক্ষেত্রে কাজ করছেন। বিএনপি সমর্থিত সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমানও যুক্ত ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন কারাগারে থেকে এখন জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নিশ্চুপ রয়েছেন। ভারতনীতি প্রসঙ্গে গত সন্ধ্যায় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র। বাংলাদেশও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সাধারণত পাশের ছোট রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা একটু বেশিই পায়। আমরাও সেটা ভারতের কাছে প্রত্যাশা করি। অন্ততপক্ষে দুই দেশের সম্পর্কটা সম্মানের হওয়া উচিত। বিশেষ করে দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কটা বাড়ানো জরুরি। সে ক্ষেত্রে যদি একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা কাঙ্ক্ষিত নয়। তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বিএনপির ভারতনীতি হচ্ছে, আমরা অবশ্যই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে তা কোনোভাবেই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে নয়। ’

অবশ্য এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘রামপাল, সীমান্তে হত্যা, নদীর পানি না দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত যে নেতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে তার প্রতিবাদ করা প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও মানুষের কর্তব্য। যাদের মধ্যে ন্যূনতম দেশাত্মবোধ আছে, তাদের এটা কর্তব্য। বিএনপি যদি মাঝে এর প্রতিবাদ না করে থাকে, তারা মহা অন্যায় করেছে। এটা কোনো রাজনৈতিক নীতি হতে পারে না। ক্ষমতায় আসব কবে, পারব কিনা— এসব হিসাব-নিকাশের সঙ্গে দেশের স্বার্থকে যারা এক করে ফেলেন তারা কখনই দেশপ্রেমিক হতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা পালন করছে, তা কোনোভাবেই অন্য কোনো দলে আমরা দেখতে চাই না। বিএনপি যে এখন প্রতিবাদ করছে, এটা নিয়মিত করা উচিত। ক্ষমতায় যদি নাও যেতে পারে, তবুও দেশের স্বার্থে যে কোনো দেশেরই কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা উচিত। ’

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতার মাধ্যমে তারা ভারতকে একটি বার্তা দিতে চান। একটি দলকে সমর্থন দিতে গিয়ে বিএনপিকে অবজ্ঞা আর অবহেলা করলে অবস্থান পাল্টাতে থাকবেন তারা। এর পরও ভারত তাদের অবস্থান না পাল্টালে প্রয়োজনে ‘খুব’ কঠোর হবে বিএনপি। তবে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, তাদের বিভিন্ন ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করার সিদ্ধান্ত বিএনপির। এদিকে বিএনপিতে ভারতবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হলেও প্রতিবেশী এ দেশটির মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে তত্পর বিএনপি। দলটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। আগামী নভেম্বরে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে বলেও বিএনপি নেতারা আশা প্রকাশ করছেন। অবশ্য এর আগে তারা ভারতের নির্বাচনের অপেক্ষায়ও ছিলেন। কিন্তু মোদি সরকার গঠন করলেও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করেন বিএনপি নেতারা। এ কারণেই দলটি ভারতকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। বিএনপির যুক্তরাষ্ট্র লবির নেতারা বলছেন, ২০১২ সালের ৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবনে দীর্ঘক্ষণ এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়া নিজের হাতে হিলারি ক্লিনটনকে খাওয়ান। হিলারিও বেগম জিয়াকে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে আখ্যা দেন। ওই সময় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি হিলারিকে অবহিত করা হয়। সফর শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার আহ্বানও জানিয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটন।

বিএনপি নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সে ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। তা ছাড়া বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের যেহেতু নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপছন্দ, সে ক্ষেত্রে বিএনপি বাড়তি সুবিধাও পেতে পারে। এ নিয়ে বিএনপির যুক্তরাষ্ট্র লবি ব্যাপক তত্পরতা চালাচ্ছে। জানা যায়, চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শুরু হয়। এর পর থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এখনো বিএনপির সঙ্গে পার্টি টু পার্টির সম্পর্ক রয়েছে, তা আরও জোরদারের চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে চীনঘনিষ্ঠ বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক বরাবরই ভালো। মাঝে একবার একটু সমস্যা হয়েছিল। তা কেটে গেছে। এখন সম্পর্ককে আমরা নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছি। চীন সরকার টু সরকার, জনগণ টু জনগণ এবং পার্টি টু পার্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে। আমি মনে করি, বিএনপির সঙ্গে চীনের এখন ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। ’ বিএনপির একটি সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপির কূটনৈতিকসংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব চলছে। টানাপড়েন এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপি নেতারা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow