Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১৯
দিনভর কাশ্মীর সীমান্তে গোলাগুলি উত্তেজনা
মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেন বান কি মুন
কলকাতা প্রতিনিধি

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভিমবার এলাকায় লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) বা নিয়ন্ত্রণরেখায় পাকিস্তানি ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে দিনভর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা গোলাগুলি চলে।

এরপর সারা দিনই গুলি চলে থেমে থেমে। পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে ডন জানিয়েছে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা তা বিবৃতিতে বলা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিনা উসকানিতে ভারতীয় বাহিনীর ছোড়া গুলির উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন পাকিস্তানি সেনারা। ভিমবার এলাকায় আজ (গতকাল) শনিবার ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এ গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ’ ২০০৩ সালে ভারত ও পাকিস্তান এক চুক্তির মাধ্যমে এলওসি বা লাইন অব কন্ট্রোল নির্ধারণ করে। সে সময় অস্ত্রবিরতি চুক্তিও সম্পাদিত হয়। তবে এরপর অনেকবার এ চুক্তির লঙ্ঘন হয়েছে। দুই দিন আগে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জঙ্গি আস্তানায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে এমন দাবি করে ভারত। তবে পাকিস্তান তাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় হানার কথা অস্বীকার করেছে।

এদিকে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে ভারতের সেনা অভিযানের বদলা নিতে রাজধানী দিল্লিসহ ছয় রাজ্যে জঙ্গি হামলা হতে পারে বলে সতর্কতা জারি করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের তরফে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, শিল্প এলাকা, জনবহুল স্থান, বিমানবন্দর, ঐতিহাসিক সৌধগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানোর ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে খবর, দিল্লির পাশাপাশি রাজস্থান, পাঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে এই জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, পাকিস্তানি সংস্থা আইএসআইর মদদে ভারতের এই ছয় রাজ্যে ভয়ঙ্কর হামলা চালাতে পারে জঙ্গিরা। হামলা হতে পারে জলপথেও।

ভারতীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, উরি হামলার আগেই পাকিস্তানি জঙ্গিরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে জম্মু-কাশ্মীরে আত্মগোপন করে রয়েছে। পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার বদলা হিসেবে ওই জঙ্গিদের ভারতের মাটিতে পাল্টা হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন সেই জঙ্গিদের খোঁজে ইতিমধ্যে জোর অভিযান শুরু করা হয়েছে।

সূত্রের খবর, ভারতীয় সেনা অভিযানের বদলা নিতে ভারতে ফিঁদায়ে বাহিনী দিয়ে হামলা চালাতে পারে পাকিস্তানি জঙ্গিরা। এ পরিপ্রেক্ষিতেই শুক্রবার দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং একটি বৈঠক করেন। বৈঠকে ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজীব মেহর্ষি ও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) এবং চর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের (র) কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকেই গোয়েন্দারা জানান, বদলা নিতে ভবিষ্যতে ভারতে বড়সড় হামলা চালাতে পারে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট জঙ্গিরা।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের সেনা অভিযানের বদলা নিতে চাইবে। তবে ৩০ অক্টোবর দীপাবলি পর্যন্ত ভারতজুড়ে এ সতর্কতা জারি থাকবে। অন্যদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) পেরিয়ে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর গতকাল প্রথম মুখ খুললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, যারা ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে তাদের উচিত জবাব দেওয়া হবে। পারিকর বলেন, ‘ভারতের নীরবতাকে কেউ যেন দুর্বলতা ভেবে না বসে। আমরা কোনো রাষ্ট্রকেই জোর করে দখল করতে চাই না। আমরা কারও ক্ষতি করতে চাই না। কিন্তু কেউ (পাকিস্তান) যদি আমাদের ক্ষতি করতে চায়, তবে তাদের উচিত জবাব দেওয়া হবে। ’

মধ্যস্থতার প্রস্তাব জাতিসংঘের : কাশ্মীর সীমান্তের উত্তেজনা প্রশমনে ভারত ও পাকিস্তানকে অবিলম্বে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এ বিষয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন। তার মুখপাত্র শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে সৃষ্ট সাম্প্রতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের সেনা ঘাঁটিতে হামলার পর লাইন অব কন্ট্রোলে অস্ত্রবিরতি ভঙ্গ হওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বান কি-মুন দুই পক্ষকেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। পাকিস্তান ও ভারত সরকারকে কাশ্মীর সমস্যাসহ অন্য বিরোধের বিষয়গুলো আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মহাসচিব বলেছেন, দুই পক্ষ চাইলে তার কার্যালয় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। বান কি-মুনের এ আহ্বানের পর ভারত বা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং গতকাল ভোরেও কাশ্মীর সীমান্তে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় চার ঘণ্টা গোলাগুলি হয়েছে বলে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

পাকিস্তান আইএসপিআরের বরাত দিয়ে দেশটির অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কাশ্মীর সীমান্তের ভিমবার সেক্টরে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। তবে কারও হতাহত হওয়ার কোনো তথ্য পাকিস্তানের পত্রিকায় আসেনি। গোলাগুলির বিষয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীরও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুই সপ্তাহ আগে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরি এলাকায় একটি সেনাঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হন। ভারত ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তান সমর্থিত জঙ্গিদের দায়ী করেছে, যদিও পাকিস্তান তাদের কোনো দায় থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। উরির ঘটনার পর বৈরীভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কয়েক কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে জঙ্গিদের আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে। জবাবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের অভিযানের দাবি ‘বিভ্রান্তিমূলক’। সীমান্তে যা ঘটেছে, তাকে ‘দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি’ এবং তাতে ১৪ ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে এবং একজন জীবিত ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হয় পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের খবরে। এরপর ভারতের পক্ষ থেকেও পাকিস্তানের ওই দাবিকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলা হয়। এ উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশেই সীমান্ত থেকে বেসামরিক লোকজন সরিয়ে নেওয়ার এবং সামরিক মহড়ার খবর পাওয়া গেছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে স্বাধীন হওয়া ভারত ও পাকিস্তান এ পর্যন্ত চারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া প্রতিবারই বিবাদের কেন্দ্রে ছিল কাশ্মীর সমস্যা। কাশ্মীরের এলওসিতে অস্ত্রবিরতি বজায় রাখতে ২০০৩ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি হলেও দুই পক্ষই তা লঙ্ঘন করেছে বহুবার।

পাকিস্তানে বন্ধ ভারতীয় সিনেমা : ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বিনোদন জগতে। কিছু দিন আগে ভারত থেকে পাকিস্তানি তারকাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলেছিল ভারত। এবার পাকিস্তানে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির হলমালিকরা। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ৩ অক্টোবর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে কোনো ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করা হবে না, এমন ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সিনেমার পরিবেশকরা ।

up-arrow