Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৫
পুলিশের তদন্তে পুলিশকে দায়মুক্তি
মাহবুব মমতাজী

পুলিশের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের অভিযোগ উঠলে গঠন করা হয় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। নয়তো কেন্দ্রভিত্তিক।

কমিটির সদস্যরা কিছুদিন পর অভিযুক্তকে ডেকে সাক্ষাৎকার নিয়েই দিয়ে দেন তদন্ত প্রতিবেদন। এরই মাধ্যমে ওঠা অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় অভিযুক্ত একাধিক পুলিশকে। সর্বশেষ চলতি ফেব্রুয়ারিতে আগুনে পুড়িয়ে চা-দোকানি বাবুল হত্যার ঘটনায়ও অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যের মধ্যে দুজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর বাকিদের ইনক্রিমেন্ট কেটে বহাল রাখা হয়েছে স্বপদে।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর নিরীহ লোকজন আটক করে নাশকতার মামলার আসামি করার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগে সাভার ও ধামরাই থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ধামরাই উপজেলার চান্দখালী গ্রামের মোখলেছুর রহমানসহ তিনজনকে থানায় ধরে এনে নাশকতার মামলায় আসামি করার হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করেন তারা। পরে  তাদের কাছ থেকে এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা নিয়ে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহা ও ধামরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম সরদারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু পরে তাদের স্বপদে বহাল রাখা হয়।

২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি বিকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাস শেষে মেসে ফেরার পথে তল্লাশি করা হয় বাংলা বিভাগের ছাত্র তাসকিনকে। এ সময় লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের গলি থেকে তাকে আটক করে সূত্রাপুর থানায় নিয়ে যান এসআই আমান। একপর্যায়ে তার গ্রামের বাড়িতে যোগাযোগ করে ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা আদায় করেন ওই এসআই। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তৎকালীন ওয়ারী বিভাগের ডিসি নুরুল আমীন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু পরে অভিযোগ থেকে পার পেয়ে যান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মিরপুরে চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এতে শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মণ্ডলসহ পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়। পরে ওসি  শাহীন ও কনস্টেবল জসিমউদ্দিনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর অন্য তিনজনকে বিভাগীয় মামলায় ইনক্রিমেন্ট কেটে নিয়ে ‘গুরুদণ্ড’ দেওয়া হয়। তবে পুলিশের এই পাঁচ সদস্যই বর্তমানে চাকরিতে বহাল আছেন। ওই ঘটনায় করা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামির মধ্যে একজন জামিনে আছেন এবং আরেকজনকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। নিহত বাবুলের পরিবারের অভিযোগ, ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহ আলী থানার পুলিশের চার সদস্যের উপস্থিতিতে তাদের সোর্স (তথ্যদাতা) দেলোয়ার হোসেন মিরপুর-১ নম্বরের গুদারাঘাটের কিংশুক সমবায় সমিতির কার্যালয়ের সংলগ্ন ফুটপাথের চা-দোকানি বাবুল মাতবরের কাছে চাঁদা দাবি করেন। এ সময় বাবুল চাঁদা না দেওয়ায় সোর্স দেলোয়ার তাকে লাথি মারেন। এতে বাবুল কেরোসিনের জ্বলন্ত চুলার ওপর পড়ে দগ্ধ হন।   পরদিন দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগ থেকে ওই বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আহমেদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া উপকমিশনার টুটুল চক্রবর্তীকে (শৃঙ্খলা) প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এর পরই শাহ আলী থানার তৎকালীন এসআই মমিনুর রহমান খান, নিয়াজউদ্দিন মোল্লা, এএসআই দেবেন্দ্র নাথ, কনস্টেবল জসিমউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আর ওসি শাহীন মণ্ডলকে প্রত্যাহার করা হয়। সূত্র জানায়, ওই মাসেই দুই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ডিএমপি কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, বাবুল অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় গড়াগড়ি করলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত এসআই মমিনুর, এএসআই দেবেন্দ্র ও কনস্টেবল জসিমউদ্দিন আগুন নেভাতে যাননি। তারা শরীরের আগুন নিভিয়ে হাসপাতালে নিলে হয়তো বাবুল বেঁচে যেতেন। তারা সহায়তা চেয়েও যোগাযোগ করেননি। ঘটনার সময় শাহ আলী থানায় কর্তব্যরত এসআই নিয়াজউদ্দিন মোল্লা ঘটনা জেনেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কিংবা সংকট সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেননি। আর থানার প্রধান হিসেবে ওসি শাহীন মণ্ডল পুলিশের ওই দলের খোঁজ রাখেননি কিংবা তদারক করেননি। ঘটনা জানার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তার ঘাটতি ছিল। দুই কমিটিই পুলিশের এই পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা ছিল উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ পুলিশ সদস্যকেই কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। নোটিসের সন্তোষজনক জবাব পেয়ে শাহীন মণ্ডল ও জসিমউদ্দিনকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর মমিনুর রহমানের আগামী পাঁচ বছরের, নিয়াজউদ্দিনের দুই বছরের এবং দেবেন্দ্র নাথের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) কেটে নিয়ে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (মিডিয়া) মো. ইউসুফ আলী বলেন, ‘তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সব ঘটনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে যে-কারও অভিযোগ থাকতে পারে। আর এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিসি বা সরাসরি ডিএমপিতে অভিযোগ দেওয়া যেতে পারে। যে কোনো অভিযোগে আমরা বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করি। বিষয়টি তদন্ত করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সাক্ষ্য নিয়ে অভিযোগের সত্যতা সাপেক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এটি অনেক লম্বা প্রসিডিউর। যদি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মামলাও করা হয়, তবে আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি চাকরিতে বহাল থাকেন।

up-arrow