Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০১
ধরাছোঁয়ার বাইরে গ্যাস চোররা
শিল্প থেকে বাসাবাড়িতে অবৈধ সংযোগ
সাঈদুর রহমান রিমন
ধরাছোঁয়ার বাইরে গ্যাস চোররা

সংঘবদ্ধ লুটেরা চক্র প্রতিদিন গড়ে দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি করছে, এভাবে তারা ১০৯ কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে। মাইলের পর মাইল পাইপলাইন বসিয়েই এ চুরি হচ্ছে।

এ ছাড়া বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতকে আবাসিক দেখিয়ে বিল তৈরি. মিটার টেম্পারিং, মূল ভলিউমে গ্রাহকের নাম লিপিবদ্ধ না করা, সংযোগ বিচ্ছিন্ন দেখানোসহ নানা কারসাজিতে লোপাট হচ্ছে বছরে আরও ২২০ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলা, সংশ্লিষ্ট গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী ইউনিয়নের দাপুটে নেতা ও মাঠপর্যায়ের ঠিকাদারদের সমন্বয়ে চোরদের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রায় সবাই গ্যাস চুরির টাকায় তালেবর বনে গেছেন। বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, সহায়সম্পদের কোনো কমতি নেই তাদের। গ্যাস সংকট সামাল দেওয়ার জন্য বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ২০১০ সালের ১৩ জুলাই আবাসিক নতুন সংযোগ দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এরই সুযোগে সারা দেশেই চোরাই সংযোগ দিয়ে ওইসব সংযোগ ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা বিল আদায় করছেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি এ নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুরেই গত দুই বছরে এমন অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে আড়াই সহস্রাধিক। অভিন্ন স্টাইলে নরসিংদী শহরসহ শিবপুর; দাউদকান্দি; নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ; ঢাকার সাভার, আশুলিয়া; টঙ্গী, শ্রীপুর এলাকায় মাইলের পর মাইল অবৈধ পাইপলাইন বসিয়ে হাজার হাজার গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের অন্তত ৩০ হাজার চোরাই সংযোগ ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বিল বাবদ প্রতি মাসে সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে ৫০ কোটি টাকা। গ্যাস চুরি ও লুটপাটের ঘটনা সবচয়ে বেশি ঘটছে মূলত বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী, নরসিংদী, সাভার-আশুলিয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ব্যাপক গ্যাস চুরির খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামে নতুন সংযোগ এবং পুরনো গ্রাহকদের চাহিদামতো গ্যাসের জোগান দিতে না পারলেও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫-৬টি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নানা কৌশলে চোরাই গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ওয়ান-ইলেভেন আমলে দুদকের কাছে দুর্নীতির দায় স্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে আসা কোটিপতি কর্মকর্তারাও রয়েছেন ওই সিন্ডিকেটে। প্রতি বছর গ্যাস সেক্টরে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের কাহিনী। পেট্রোবাংলা থেকে শুরু করে জ্বালানি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সবাই নীরবে সয়ে চলেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্যাস সেক্টরে অব্যাহত চুরি আর লুটপাট বন্ধে ব্যর্থ হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বার বার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে তা পুষিয়ে নিচ্ছে। দফায় দফায় ইচ্ছামাফিক গ্যাসের দাম বাড়ানোর মাধ্যমেই নিজেদের ব্যর্থতা চাপা দেওয়া হয়। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, দাম বাড়ানোর আগে দরকার সিস্টেম লস ও গ্যাস চুরি বন্ধ করা। চুরি বন্ধ করতে পারলেই গ্যাসের মূল্য ‘সহনীয়’ রাখা সম্ভব। কিন্তু চুরি আর লুটপাট বন্ধে সংশ্লিষ্টরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপের নজির দেখাতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, মাঠঘাট চষে বেড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। গোটা কয়েক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন আর অভিযুক্তদের যৎসামান্য জরিমানা দণ্ডের মধ্যেই যাবতীয় তত্পরতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

চুরি থামছেই না : গ্যাস খাতে বিদ্যমান লুটপাট বন্ধে কঠোর উদ্যোগ না থাকলেও মাঝেমধ্যে গ্যাস চুরি দমন অভিযানে নামে তিতাস গ্যাস কোম্পানি। কিন্তু এসব অভিযান থেকে চোরাই সংযোগ গ্রহণকারীরা বরাবরই রেহাই পেয়ে যান। রাজধানীর বাড্ডায় তিতাস গ্যাস বিতরণ কার্যালয়ের অদূরেই ভাটারার সাঈদনগর আবাসিক এলাকা। সেখানে চার শতাধিক ভবনে প্রায় ৩ হাজার পরিবারের বাস। তিতাসের কাগজপত্রে সেখানে কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়ার রেকর্ড নেই, কিন্তু বাস্তবে ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ। রীতিমতো ৪ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে ওই এলাকায় গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে গত দুই বছরে দেড় শতাধিক বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গড়ে উঠেছে। এসব ভবনের অন্তত ১০ হাজার ফ্ল্যাটেও গ্যাস সংযোগ মিলেছে অলৌকিকভাবে। সরকারি রেকর্ডপত্রে এসব ফ্ল্যাটে গ্রাহক না থাকলেও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিপরীতে প্রতি মাসেই তিতাস কর্মচারীরা গ্যাস বিলের নামে নগদ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস চুরি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর ভিজিল্যান্স টিম থাকলেও সেগুলোর ওপর ভরসা রাখতে পারছে না মন্ত্রণালয়। তাই মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব টিম গ্যাস চুরি বন্ধের জন্য বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কারখানায় হানা দিচ্ছে। তাদের অভিযানে প্রতিনিয়তই ধরা পড়ছে গ্যাস চুরির ঘটনা। সিলগালা করা হচ্ছে মিল-কারখানা, সিএনজি স্টেশন; আদায় হচ্ছে জরিমানা। তাতেও থামে না গ্যাস চুরির পাগলা ঘোড়া। সম্প্রতি তিতাস কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩৬ কিলোমিটার অবৈধভাবে স্থাপিত গ্যাসলাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার, গ্যাস কারচুপি রোধকল্পে কোম্পানির বিশেষ পরিদর্শন, সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রমের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে তিনটি সিএনজি স্টেশনসহ ১৯টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং বিভিন্ন ব্যাসের প্রায় ৩৬ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইনসহ ২৭ হাজার ৩০০টি অবৈধ চুলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বাধীন ভিজিল্যান্স টিমের অভিযান শেষ হতেই ভিন্নতর পন্থায় আবারও চোরাই গ্যাস সংযোগ নিচ্ছেন অনেকেই।

ভেলকিবাজি : পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায় গ্যাস বিক্রির হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকার বেদনাদায়ক কাহিনী। তথ্যানুযায়ী, গ্যাস বিক্রি বাবদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৬৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতে বকেয়ার পরিমাণ ১ হাজার ৬১৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আর বেসরকারি খাতে বকেয়া পড়েছে ২ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বকেয়া আদায়ে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের নামে চলছে আরেক ভেলকিবাজি। তিতাস গ্যাস কোম্পানির রেকর্ডপত্র অনুযায়ী এ মুহূর্তে রাজধানী ও আশপাশ এলাকাতেই প্রায় ৮ হাজার বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা রয়েছে। কিন্তু কোথাও গ্যাস সংযোগবিহীন কোনো বাড়িঘর, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি এই প্রতিবেদক। দাফতরিক খাতাপত্রে আর বিশেষ বিশেষ অভিযানের লগবুকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ‘বিচ্ছিন্নকরণ’-এর তালিকা তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তবে লুটেরা গ্রাহকদের বিকল্প ব্যবস্থায় গ্যাস সংযোগ বহাল রাখা হয়। এসব স্থাপনা থেকে মাসে মাসে বিলের টাকা তুলে নেন মিটার রিডাররা। ‘সংযোগ বিচ্ছিন্ন’ তালিকায় থাকায় শুধু সরকার কোনোরকম অর্থ পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকে।

ঘাটতি সত্ত্বেও অপচয়, মজুদও কমছে : বর্তমানে দৈনিক গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন হলেও গ্যাসের চাহিদা ৩২০ কোটি ঘনফুটের বেশি। ঘাটতি অন্তত ৫০ কোটি ঘনফুট। এ অবস্থায়ও দৈনিক প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস অপচয় হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি গ্যাসের অপচয় হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। এর বাইরে রয়েছে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস চুরি। দেশের ২৬টি গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর জরিপ চালিয়ে চলতি বছরের শুরুতে পেট্রোবাংলা একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে বলা হয়েছে, গ্যাসের ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ২০১৯ সালে এ ঘাটতি হবে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৭ সালের জুনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এরপর উৎপাদন কমতে থাকবে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে বেশি করে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow