Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৫
মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন খাদিজা, ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
বর্বর ছেলে সবার সামনেই কোপাল মেয়েটিকে
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সিলেট
বর্বর ছেলে সবার সামনেই কোপাল মেয়েটিকে
প্রকাশ্যে সবার সামনে কোপানো হয় খাদিজাকে —বাংলাদেশ প্রতিদিন

সিলেটে ছাত্রলীগ নেতার নৃশংসতার শিকার কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসের অবস্থা সংকটাপন্ন। গতকাল বিকালে অস্ত্রোপচার শেষে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ৭২ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নার্গিসের মাথায় অসংখ্য চাপাতির কোপের আঘাত রয়েছে। আঘাত রয়েছে দুই হাতেও। চিকিৎসকরা বলছেন,     নার্গিসের শারীরিক অবস্থা নিয়ে এখন বলার মতো কিছু নেই। ৭২ ঘণ্টা পার হলে তবেই বলা যাবে। এদিকে নার্গিসের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের বিচার দাবিতে সিলেট এখন উত্তাল। সরকারি মহিলা কলেজ, এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা দিনভর সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। তাদের দাবি, নার্গিসকে যে চাপাতি বদরুল নৃশংসভাবে হত্যাচেষ্টা করেছেন, তিনি যেন কোনোভাবে পার পেয়ে না যান। দিনের কর্মসূচি শেষে বদরুলের ফাঁসিসহ তিন দফা দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে : মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর, আসামি বদরুলের ফাঁসি নিশ্চিত করা এবং পরীক্ষার হল ও যাতায়াতের সময় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সিলেটে কলেজছাত্রীকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বদরুলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নিজেদের কেউ নন দাবি করে বলেছে, বদরুলের দায় নেবে না সংগঠন। ঘটনার পর পরই স্থানীয়রা বদরুলকে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। তাকেও ওসমানী হাসপাতালে পুলিশি প্রহরায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় বদরুল আলমকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার বিকালে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিতে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ডিগ্রি পাসের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানোর এই ভিডিও ফুটেজ মুহূর্তেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। এই হামলার দৃশ্য দেখে হতবাক দেশের মানুষ। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বদরুল একটি চাপাতি দিয়ে মাটিতে ফেলে নার্গিসকে এলোপাতাড়ি কেপাচ্ছেন। দূর থেকে এই কোপের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। এর পরই সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বদরুলের বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। উত্তাল হয় সিলেট।

৭২ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে নার্গিস : ছাত্রলীগ নেতার নৃশংসতায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়া নার্গিসের মাথায় অসংখ্য চাপাতির কোপের আঘাত রয়েছে। আঘাত রয়েছে দুই হাতেও। স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকরা গতকাল এ তথ্য জানিয়েছেন। হাসপাতালের মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের কনসালট্যান্ট ও অ্যাসোসিয়েট মেডিকেল ডিরেক্টর ড. মির্জা নাজিম উদ্দিন গতকাল জানান, ‘নার্গিসের মাথায় অসংখ্য চাপাতির কোপের চিহ্ন রয়েছে। তাকে এমনভাবে কোপানো হয়েছে যে, খুলি ভেদ করে ব্রেন ইনজুরি হয়েছে। কোপানোর সময় হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করায় তার দুই হাতের রগ কেটে গেছে। ’ নার্গিসের অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া চিকিৎসক দলের প্রধান নিউরো সার্জন ডা. এ এম রেজাউস সাত্তার বলেন, ‘নার্গিসের মাথায় অসংখ্য আঘাত ছিল। তার যে অপারেশন হয়েছে, তাতে ৭২ ঘণ্টা আগে তার সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। তিনি ঝুঁকিতে আছেন। এ ধরনের রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা শতকরা ৫ ভাগ। ’ এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে পরিবারের সম্মতি নিয়ে নার্গিসের অস্ত্রোপচার শুরু হয়। সে সময় ড. মির্জা নাজিম উদ্দিন জানান, ‘আজ (মঙ্গলবার) সকালে নার্গিসকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। মাথায় অসংখ্য আঘাত। যেগুলো কোপানোর চিহ্ন। ’ তিনি বলেন, ‘নার্গিসকে আঘাত করার সময় তিনি দুই হাত দিয়ে আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তার হাতেও গভীর আঘাত রয়েছে, হাতের রগ কেটে গেছে। ’ গতকাল রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নার্গিসকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে তার চাচা আবদুল কুদ্দুস ও মামা আবদুল বাসেত বলেন, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে নার্গিস দ্বিতীয়। তার বাবা মাসুদ মিয়া সৌদি আরব প্রবাসী এবং মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। বড় ভাই চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন, ছোট দুই ভাই দেশেই লেখাপড়া করেন। আবদুল বাসেত বলেন, খবরের কাগজে এই ছেলের সঙ্গে নার্গিসের প্রেমের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা একেবারেই ঠিক নয়। তিনি বলেন, নার্গিসের মা তার মেয়ের এ অবস্থার কথা এখনো জানেন না। তিনি জানেন মেয়ের মাথায় একটুখানি কোপ লেগেছে।

উত্তাল সিলেট : হামলার প্রতিবাদ ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের বিচার দাবিতে সিলেট এখন উত্তাল। হামলাকারী বদরুল আলমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানবন্ধন করেন। পরে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে কলেজের শিক্ষার্থী ফজিলাতুন নেছা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে আজ কালো ব্যাজ ধারণ ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান ও আগামীকাল প্রতিবাদ সমাবেশ।

এ ছাড়া তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনেরও ঘোষণা দেন। কর্মসূচি ঘোষণাকালে শিক্ষার্থীরা তাদের তিন দফা দাবিও ঘোষণা করেন।

মানববন্ধন ও সমাবেশে ছাত্রীরা বলেন, পরীক্ষা দিতে গিয়ে কোনো ছাত্রীর এমন নৃশংসতার শিকার হওয়া কারও কাম্য নয়। এ অবস্থায় অন্য শিক্ষার্থীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান তারা। তারা হামলাকারী বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীর ওপর এমন বর্বর ও পৈশাচিক হামলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এমন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। ’ একই দাবিতে গতকাল ঘটনাস্থল এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।

এদিকে, হামলার ঘটনায় আহত নার্গিসের চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেছেন। বদরুল বর্তমানে পুলিশ প্রহরায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শাহপরাণ থানার ওসি শাহজালাল মুন্সী জানান, ‘সোমবার বিকালে হামলার পর শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন উত্তমমধ্যম দিয়ে বদরুলকে পুলিশে সোপর্দ করেন। মারধরে বদরুল আহত হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সুস্থ হলেই আদালতে তোলা হবে। ’

বিচারের প্রতিশ্রুতি

গতকাল সচিবালয়ে এক সংলাপে সাংবাদিকরা আসামির ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট। তিনি কাউকে ছাড় দেন না। সরকারি দল হোক আর যে দলের হোক, যেই মতের লোক হোক, আমাদের যে পর্যায়ের লোক হোক। কাউকে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ছাড় দেন না, আপনারা লক্ষ্য করেছেন, দেখেছেন। আমি আপনাদের জোর গলায় বলতে পারি, যেই অপরাধ করেছেন, সেই অপরাধীকে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হতে হবে’, বলেন আসাদুজ্জামান খান কামাল।

ছাত্রলীগের অস্বীকার

নার্গিসের ওপর হামলাকারী বদরুল আলমের দায় নেবে না সংগঠন। এমনকি বদরুলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নিজেদের কেউ নন বলেও দাবি করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বৃহৎ ছাত্র সংগঠন হওয়ায় অসংখ্য নেতা-কর্মী এ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। কারও ব্যক্তিগত অপকর্মের দায়ভার ছাত্রলীগ কখনো নেবে না। ’

সাংগঠনিক নিয়মেই কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে বদরুলের সদস্যপদ বাতিল হয়েছে বলেও জানানো হয় বিবৃতিতে। এতে বলা হয়, ‘যেহেতু তিনি বর্তমানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং অন্য একটি পেশায় কর্মরত, তাই গণমাধ্যমের সাংবাদিক বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি— সন্ত্রাসী বদরুল আলমের ব্যক্তিগত অপকর্মের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে জড়াবেন না বা নাম ব্যবহার করবেন না। ’

আহত নার্গিস ও তার পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সার্বক্ষণিক পাশে থাকবে এবং সন্ত্রাসী বদরুল আলমের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow