Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৭
স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে জঙ্গিরা
সাখাওয়াত কাওসার

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সরকারের আহ্বানে সাড়া মিলেছে। এলিট ফোর্স র‌্যাবের নানামুখী প্রচেষ্টায় এরই মধ্যে সাড়া দিয়েছে উগ্রপন্থায় ধাবিত দুই শীর্ষ জঙ্গি।

তারা ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারী জঙ্গিদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সূত্র জানায়, আজ বগুড়া জেলা সদরে অভিভাবকরা তাদের র‌্যাব কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করবেন। বিশেষ ওই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও উপস্থিত থাকছেন। শুধু তাই নয়, বিপথগামী আরও কিছু যুবক শিগগিরই এভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থায় বিপথগামী যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য সংশোধনাগার না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। দ্রুততর সময়ের মধ্যে বিশেষায়িত জঙ্গি সংশোধনাগারের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, নাশকতার পথ পরিহার করে জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব। এ সুযোগ যারা গ্রহণ করবে তাদের দেখভাল করবে র‌্যাব। আর যারা এ সুযোগ গ্রহণ করবে না তাদের জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করবে। র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ বগুড়া জেলা সদরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পুলিশের আইজি এ কে এম শহিদুল হক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ ছাড়াও র‌্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের উপস্থিতিতে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করবে। যেসব জঙ্গি সদস্য এতদিন আত্মগোপনে থেকে কথিত ইসলামের নামে দেশময় নাশকতা চালিয়ে হত্যা, অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে তাদের পুনর্বাসনে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে যেসব জঙ্গি স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে তাদের ও তাদের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কারণ দেশে এখন কত জঙ্গি সদস্য রয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার জঙ্গি সদস্যদের তথ্যমতে, এখনো দেশে কয়েক হাজার জঙ্গি সদস্য রয়েছে। তাদের কাছে রয়েছে ভারী অস্ত্র। এসব জঙ্গির হামলায় গত কয়েক বছরে কয়েকশ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ জুলাই সশস্ত্র জঙ্গিরা গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেশি ও বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে। রাতভর জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশি, ৩ বাংলাদেশি ও পুলিশের ২ কর্মকর্তা নিহত হন। পরে কমান্ডো অভিযানে জঙ্গিরা নিহত হয়। এর পর থেকে ৬টি লাশ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল—সিএমএইচে ছিল। ঘটনার মাসখানেক পর এদের অভিভাবকদের দেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আবেদন না করায় তা আঞ্জুমানে মুফিদুলের মাধ্যমে দাফন করা হয়। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার পর পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবির নতুন ধারার (নব্য জেএমবি) সক্রিয় জঙ্গিদের তত্পরতা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে এ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কসহ অন্তত ২১ সদস্য নিহত হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে অর্ধশতাধিক। তবে এখনো পলাতক ২২ নেতা-সংগঠক। এর মধ্যে অন্তত এক ডজন জঙ্গি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনায় জড়িত। তাদের মধ্যে কেউ তাত্ত্বিক নেতা, কেউ সংগঠক। সমন্বয়ের কাজ করছে কেউ কেউ। কেউ দিচ্ছে ধর্মীয় দীক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ। কেউ কেউ অস্ত্র ও বোমা সরবরাহ করছে। আছে আইটি বিশেষজ্ঞও। দলে তারা ছদ্মনামে পরিচিত। তবে সহকর্মীরা এসব নেতাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গুলশান, শোলাকিয়ার ঘটনা তদন্ত, সন্দেহভাজন নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহ, পুরনো জেএমবি সদস্যদের কর্মকাণ্ড ও গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নব্য জেএমবির এসব দুর্ধর্ষ পলাতক জঙ্গির ব্যাপারে জানা গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন ভারতে পালিয়ে গেছে। কয়েকজন আছে মধ্যপ্রাচ্যে। তবে যারা দেশে আছে, তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম—সিটিটিসি ইউনিট। পলাতক জঙ্গিদের মধ্যে আছে পুরনো জেএমবির শুরা সদস্য মাহফুজ সোহেল ওরফে হাতকাটা সোহেল ওরফে নাসিরউদ্দিন ওরফে ভাগিনা সোহেল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল ইসলাম মারজান, ডাকাতির সংগঠক ওয়াসিম আজওয়াদ আবদুল্লাহ ওরফে আসিফ আজওয়াদ, খেলাফত নেতা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ বাঙালি, তাত্ত্বিক নেতা আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর, উত্তরাঞ্চলের কমান্ডার রাজীব গান্ধী ওরফে রাজীব ওরফে শুভাষ ওরফে জাহাঙ্গীর, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ, অর্থ ও আইটি সমন্বয়ক বাশারুল্লাহ ওরফে রাহুল ওরফে চকলেট ওরফে শান্ত, কমান্ডার মানিক, সংগঠক ইকবাল, মামুন, জুনায়েদ হাসান খান, ইবরাহিম হাসান খান, প্রশিক্ষক আবদুস সাকিব ওরফে মাস্টার সাকিব, মিজান, অপারেশন বাস্তবায়নকারী বাদল মিয়া ওরফে ওস্তাদ বাদল, দিনাজপুরের আবদুল খালেক ওরফে মামা খালেক, জামায়াত নেতা সাজ্জাদ হোসেন, সাগর, আকাশ ও আজাদুল ওরফে কবিরাজ। সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নব্য জেএমবির শক্তি অনেক ক্ষয় হয়ে গেছে। গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার পেছনে যারা ছিল, তাদের অনেকের নাম পাওয়া গেছে। তদন্তের পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযানও চলছে। ’ গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি গেড়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের জঙ্গিরা। সদস্যদের দেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রশিক্ষণ। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলে ১২টি প্রশিক্ষণ ঘাঁটির সন্ধান মিলেছে। জামিনে থাকা জঙ্গিদের মধ্যে কেউ কেউ ভারত, পাকিস্তান, সিরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে আছে।

জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সংশোধনাগার নেই : অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এমন যুবকরা আত্মসমর্পণ করছেন এটা অত্যন্ত ভালো সংবাদ। তবে যারা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেননি কিংবা কারাগারে রয়েছেন তাদের ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষায়িত সংশোধনাগার সময়ের দাবি। কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়টিতে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। নইলে তাদের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। কারা অধিদফতরের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী (অব.) বলেন, কারা কর্তৃপক্ষেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। মগজ ধোলাইকৃত যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কারা কর্তৃপক্ষেরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তবে প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানীদের এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, সর্বোপরি দরকার কারা অধিদফতরে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা। নইলে কেউ মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে চাকরি পেলে তার প্রথম টার্গেটই হয়ে দাঁড়ায় কত দ্রুততর সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকৃত টাকা উঠিয়ে নেওয়া যায়। আর ওই সময়ে অপরাধীদের তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তথ্যমতে, আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় নিহত আবদুল করিম ওরফে তানভীর কাদেরীর ১৪ বছরের কিশোর ছেলেকেও আহত অবস্থায় আটক করা হয়। পরে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে এনে আলেম ও মনোবিজ্ঞানী দিয়ে কাউন্সেলিং করানো হয়। এরপর ওই কিশোর জঙ্গিবাদে জড়ানোর ভুল বুঝতে পারে। বর্তমানে এই কিশোর টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। সেখানেও তার কাউন্সেলিং চলছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow